সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মূল্যছাড়ের প্রচারণা চালিয়ে একটি অস্তিত্বহীন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। অ্যামাসবিডি নামে অস্তিত্বহীন এই প্রতিষ্ঠানটির কোনো অফিস কিংবা লাইসেন্সও ছিল না। তারা ঘণ্টা চুক্তিতে ডেস্ক ভাড়া নিয়ে ভার্চুয়াল মাধ্যমে এই প্রতারণার ফাঁদে ফেলে ঠকিয়েছে প্রায় ৩০০ গ্রাহককে।
জানা গেছে, ২০২০ সালে অ্যামাসবিডি ডটকম নামে একটি ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজ খুলে নিজেদের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রচার করে। তারা মোটরসাইকেল, ফ্রিজ ও মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন পণ্য স্বল্পমূল্যে বিক্রির প্রলোভনে ফেলে গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নেয়। ব্যাংক হিসাব এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে টাকা গ্রহণ করেও গ্রাহকদের পণ্য বুঝিয়ে দেয়নি। অবশ্য, বিশ্বাস অর্জনের জন্য প্রথমদিকে কিছু গ্রাহকের পণ্য যথাসময়ে দিয়েছিল।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে নামসর্বস্ব এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে। আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বুধবার রাজধানীর ধানম-ি থানায় অর্থ পাচার আইনে এই মামলাটি করা হয়।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন ধানমন্ডি থানার ওসি মো. পারভেজ ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, অবৈধ এই ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট বাদী হয়ে মামলা করেছে। অর্থ পাচার আইনে করা এই মামলাটির তদন্ত তারাই করছেন।
তবে এ বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার সিআইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
সিআইডির করা ওই মামলায় যে চারজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, তার হলেন কায়সার হাবিব, মো. আশেকুল ইসলাম, মো. আবদুর রউফ বারেক ও মো. তানজিম হাসান মিথুন। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, অ্যামাসবিডি একটি অস্তিত্বহীন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির ট্রেড লাইসেন্স বা নিবন্ধন-সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তারা ধানম-ির মাইডাস সেন্টারে ঘণ্টা চুক্তিতে ডেস্ক ভাড়া নিয়ে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। বিভিন্ন পণ্যে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড়ের ঘোষণায় প্রায় ৩০০ গ্রাহকের টাকা নিয়ে পণ্য দেয়নি। পণ্য দেওয়ার নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া ৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা নিয়ে নিজেদের নামে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে ও ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেছে।
সিআইডির অনুসন্ধানে জানা যায়, কায়সার হাবিব, আশেকুল ইসলাম তানজিল এবং আবদুর রউফ বারেক পূর্বপরিচিত। তারা তিনজন মিলে অ্যামাসবিডি নামের অস্তিত্বহীন এই ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে কায়সার হাবিব ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান, আশেকুল ইসলাম তানজিল সিইও এবং মো. আবদুর রউফ বারেক প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ছিলেন। এ ছাড়া অন্য অভিযুক্ত তানজিম হাসানকে এই প্রতিষ্ঠানটির হেড অব সেলস এক্সিকিউটিভ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
জানা গেছে, অভিযুক্ত কায়সার হাবিব আগে আইটি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ ছাড়া তিনি ওয়ার্ল্ড ট্রাক, ওয়ার্ল্ড টেকনোলজি লিমিটেডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন। আশেকুল ইসলাম তানজিল ওয়ার্ল্ড ট্রেক কনসালট্যান্সি লিমিটেড নামের কোম্পানির স্বত্বাধিকারী।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, আসামির গ্রহণকৃত অর্ডারের বিপরীতে পণ্যের মূল্য বাবদ অগ্রিম অর্থ গ্রহণ করতেন তাদের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বা নগদে। গ্রাহকদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য গ্রহণকৃত অর্ডারের বিপরীতে তাদের চেয়ারম্যান ও সিইও স্বাক্ষরিত ইনভয়েস প্রদান করতেন। কায়সার হাবিবের মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে তার নামে থাকা হিসাবে এবং তার প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ট্রেকের নামে একই ব্যাংকের গুলশান শাখার হিসাবে অ্যামাসবিডির গ্রাহকের টাকা গ্রহণ করেছে।
এ ছাড়া অভিযুক্ত আশেকুল ইসলাম তানজিলের নামে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ট্রেক কনসালট্যান্সির মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের গুলশান শাখার হিসাবে অ্যামাসবিডির গ্রাহকদের টাকা গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে অ্যামাসবিডির পরিচালক আবদুর রউফের নামে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের গুলশান শাখা ও দি সিটি ব্যাংকের বনানী শাখার হিসাবে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্ডারকৃত পণ্যের টাকা গ্রহণ করেছেন।
সিআইডি জানিয়েছে, ওয়ার্ল্ড ট্রেক নামের প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে লাইসেন্স নিয়েছে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে, যার লাইসেন্স নম্বর ১১৫৫৩২। সেখানে প্রতিষ্ঠানটি আইটি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা ঠিকানায় গিয়ে এ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। একইভাবে ওয়ার্ল্ড ট্রেক কনসালট্যান্সি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে লাইসেন্স নিয়েছে, যার রেজিস্ট্রেশন নম্বর ০৪৮৩৪৬। তবে তাদের দেওয়া ঠিকানা রাজধানীর কলাবাগানের লেক সাকাস এলাকায় গিয়ে এ ধরনের কোনো অফিসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
পুলিশের এই তদন্ত সংস্থাটির প্রাথমিক তদন্তে আরও উঠে এসেছে অস্তিত্বহীন এই প্রতিষ্ঠানটির হেড অব সেলস এক্সিকিউটিভ তানজিম হাসান মিথুনের অনিয়মের প্রমাণ।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, তানজিম বিভিন্ন গ্রাহকের কাছ থেকে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রির কথা বলে টাকা নিয়েছেন। অ্যামাসবিডির গ্রাহকদের কাছ থেকে এভাবে হাতিয়ে নেওয়া টাকার ওপর ৩ শতাংশ কমিশন নিয়েছেন তিনি।
