ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তির সবচেয়ে জরুরি ও প্রয়োজনীয় উপাদান ‘ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট’ সহজ কথায় স্যালাইন। রোগীর কখন কী পরিমাণ ফ্লুইড প্রয়োজন, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে জানা যাবে। সম্প্রতি ‘ডেঙ্গু ড্রপস’ নামে একটি অ্যাপ করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একদল গবেষক। দলটির নেতৃত্ব দিয়েছেন বুয়েটের বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ড. তৌফিক হাসান। অ্যাপটি নিয়ে কথা বলেছেন অরণ্য সৌরভ
দেশ রূপান্তর : ‘ডেঙ্গু ড্রপস’ অ্যাপ তৈরির গল্পটা বলুন
তৌফিক হাসান : করোনা মহামারীর সময় বুয়েটের বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে আমরা ‘অক্সিজেট’ স্বল্পমূল্যের ভেন্টিলেটর উদ্ভাবন করি, যা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে ২০২২ সালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় আমরা চিন্তাভাবনা শুরু করি। আমার স্ত্রী একজন ডাক্তার ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। তার সঙ্গে কথোপকথনে বুঝতে পারি, হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের শরীরে পরিমিত মাত্রায় স্যালাইন বা আইভি ফ্লুইড দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কম বা বেশির ফলে রোগীর পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে, বিশেষ করে ‘শক সিনড্রোম’, এমনকি মৃত্যুও। রোগীর প্রয়োজনীয় ফ্লুইডের পরিমাণ তার উচ্চতা, ওজন ইত্যাদি অনুযায়ী বাংলাদেশের ন্যাশনাল গাইডলাইন অনুযায়ী ক্যালকুলেশন করতে হয়, যা সেই পরিস্থিতিতে ডাক্তারদের জন্য কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ডাক্তারদের সুবিধার্থে ও দ্রুত সঠিক সেবা যেন দেওয়া যায়, সে ভাবনা থেকেই অ্যাপ তৈরির সিদ্ধান্ত নিই। ‘ডেঙ্গু ড্রপস’ অ্যাপটি প্রথমে বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং তৃতীয় বর্ষের প্রজেক্ট হিসেবে শুরু হয়। এতে প্রভাষক নাফিসার গাইডে প্রথমে দুজন ছাত্র (মাহিয়ান ও আনাস) ব্লাড ট্রান্সফিউশনের যন্ত্র নিয়ে কাজ করছিল। ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের এই প্রজেক্ট পরিবর্তনের কথা জানাই। বাংলাদেশ ডেঙ্গু ন্যাশনাল গাইডলাইনের প্রধান সম্পাদক অধ্যাপক কাজী তারিকুল ইসলামের সঙ্গে ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট নিয়ে আলোচনা করি। এরপর আমাদের টিমে ডা. নওসাবাহ, ডা. রিশাদ, ডা. খাইরুল, ডা. শরিফ, অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিনসহ আর অনেকে যুক্ত হয়। অ্যাপটির উন্নত করার অনেক দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। আরও কয়েকদফা আলোচনার পর বিভিন্ন রোগীর জন্য ফ্লুইডের ক্যালকুলেশন চূড়ান্ত করি এবং বিভিন্ন ইনপুটের ক্ষেত্রে এটি পরীক্ষা করি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ সভায় ডেঙ্গু ন্যাশনাল গাইডলাইন অনুযায়ী কাজ করে এই মর্মে প্রত্যয়ন করা হয় এবং ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়। গত ৫ সেপ্টেম্বর অ্যাপটি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ডাক্তার ও নার্সদের সম্মুখে উদ্বোধন করা হয়।
দেশ রূপান্তর : অ্যাপটির সক্ষমতা
তৌফিক হাসান : ‘ডেঙ্গু ড্রপস’ অ্যাপটি মূলত ডাক্তারদের জন্য তৈরি করা এবং এটি শুধুমাত্র গ্রুপ বি (নন-শক) রোগীদের জন্য প্রযোজ্য। অ্যাপটি একজন ডেঙ্গু রোগীর বিভিন্ন তথ্য যেমন : বয়স, উচ্চতা, লিঙ্গ, ওজন, রক্তচাপ, ক্যাপিলারি রিফিল টাইম এবং ক্যানুলা-ধরন বিবেচনা করে প্রতি মিনিটে প্রয়োজনীয় ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইড (IV Fluid) ড্রপের পরিমাণ বাংলাদেশ ন্যাশনাল ডেঙ্গু গাইডলাইন অনুযায়ী নির্ভুলভাবে গণনা করতে সক্ষম।
অ্যাপটি ‘শক সিনড্রোম’ রোগীদের জন্য প্রযোজ্য নয়। দেশে সাধারণ ওয়ার্ডে বেশিরভাগ ডেঙ্গু রোগী মূলত গ্রুপ বি (নন-শক) ক্যাটাগরির, এদের ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত পরিমিত মাত্রায় ফ্লুইড দিতে হয় এবং কয়েক ঘণ্টা পরপর পর্যবেক্ষণ করতে হয়। ‘শক সিনড্রোম’-এর রোগীদের আইসিইউতে চিকিৎসা দিতে হয়। ডেঙ্গুর সময় চিকিৎসকদের অত্যধিক সংখ্যক গ্রুপ বি (নন-শক) রোগীর চিকিৎসা দিতে হয় বিধায় আমরা এ ধরনের রোগীদের জন্য অ্যাপটি তৈরি করি। অ্যাপটি যথাযথ ব্যবহার হলে, আইসিইউর ওপর চাপ কমবে বলে আমরা মনে করি।
দেশ রূপান্তর : অ্যাপটির মাধ্যমে কী কী সেবা পাওয়া যাবে?
তৌফিক হাসান : ‘ডেঙ্গু ড্রপস’ অ্যাপ্লিকেশনটি সব বয়সের রোগীর জন্য আবশ্যক আইভি ফ্লুইড ট্রান্সমিশনের হার ও পরিমাণ নির্ণয় করতে সক্ষম। এই অ্যাপের মাধ্যমে ডেঙ্গু রোগীর শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় মেইনটেন্যান্স এবং স্যালাইনের মাধ্যমে গ্রহণ করার নির্দেশনা প্রদান করে। এটি চিকিৎসাকর্মীদের জন্য এক সময়োপযোগী সহায়িকা রূপে আবির্ভূত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অ্যাপটিকে অনুমোদন দিয়েছে। শক রোগীদের জন্যও অ্যাপটি ডেভেলপ করার কাজ চলছে। এটি বিনামূল্যে ওয়েবসাইটে গিয়ে ব্যবহার করা যাবে : mhealth.buet.ac.bd/DengueDrops/