মুহম্মদ নূরুল হুদার অখণ্ড সমগ্রতা

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৩, ১১:৫৪ পিএম

তত্ত্ববিশ্ব নয়; সৃষ্টিশীল বিশ্ব গড়ে তুলতে আমার মন, আত্মা, হৃদয়, শিরা, সংবেদন, আবেগ, ভাব, বেদনা, দহন, দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আমার আমাকে চিনতে আমি যার কাছে সবচেয়ে বেশি ঋণী তিনি জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। তার কবিতা সৃষ্টিবিশ্বের অন্তর্লীন আধেয়, তত্ত্ববিশ্বেও তার পাণ্ডিত্য দর্শনের লোক আধার।

ভাষা আবিষ্কারের শুরু থেকে শতাব্দী-কালব্যাপী যেসব নবী, দার্শনিক, নাট্যকার, দরবেশ দীর্ঘ জাগরণে আদিষ্ট হয়েছে, সাধনা করেছে, মানুষের মুক্তির জন্য জীবন দিয়েছে, শেষ নবী মুহম্মদ (স.) হেরাগুহার ধ্যান, তারও হাজার বছর পর মার্কসের অনমনীয় শ্রেণিচেতনা ও বিপ্লবকে তিনি মেটাফরের মাধ্যমে আত্তীকরণ করে আমাদের উপহার দিয়েছেন মগ্ন বিধুর কবিতা আদিষ্ট হয়েছি আমি দীর্ঘ জাগরণে। এই মনোধ্যান ও আত্মার আধ্যাত্মিকতা, সুফির মিষ্টিক বা রহস্যময়তা, তৃপ্তি, অতৃপ্তি, দহন, এক জীবনে হাজার জীবনের আস্বাদন।

আমি সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে মুহম্মদ নূরুল হুদাকে আবিষ্কার করেছি। উদঘাটন করেছি মুহম্মদ নূরুল হুদার অখণ্ডের সমগ্র সত্তাকে। এ আবিষ্কার অনেক বড় বিষয়। কবিতার মর্মের ভেতর ঢুকতে না পারলে কেউ সহজে এ আবিষ্কার করতে পারবে না। আমি কবিতার ঘোরে বেঁচে আছি। এখন ঘোর কেটেছে। সচেতন হয়েছি জগৎ, সমাজ ও শ্রেণি চেতনায় এই উল্লম্ফনের জন্য আমি অনেকের কাছে ঋণী। এ কথা বলতে হবে যে, সৃষ্টিকে মনন ও সংবেদনে বেহিসেবী হতে মুহম্মদ নূরুল হুদার সৃষ্টিবিশ্ব আমাকে উসকে দিয়েছে। আমি মনির ইউসুফ, যদি কবি মনির ইউসুফ হতে পারি তা পেরেছি মুহম্মদ নূরুল হুদার সান্নিধ্যে থেকে। এ কথা বলতে আমার কোনো দ্বিধা নেই। আমি গর্ব অনুভব করি, এক জীবনে তার সান্নিধ্যে বহু-জীবনের বহু-বৈচিত্র্যময় জীবনের স্বাদ পেয়েছি। বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতা দরিয়ানগরের সৃষ্টিজাত এই মর্ত্য মানব দরিয়ানগর তথা কক্সবাজারকে মার্গীয় উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ভারতীয় তথা বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতার নৃতত্ত্ব, ইতিহাস, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য পুরাণ, পবিত্র কোরআন, বেদ, বাইবেল, উপনিষদ, ত্রিপিটক, প্রাচীন বৈদিক সমাজ, বৈদিক উত্তর সমাজ, বাঙালি জাতিসত্তা, আধুনিকতা, মৌল-আধুনিকতা, দাদাইজম থেকে স্যুররিয়ালিজম হয়ে মুহূর্তের বিচ্ছুরণ, যুদ্ধ, লড়াইসহ কবিতায় তিনি একটি সমগ্রতার চিত্র এঁকে যাচ্ছেন। এটি লক্ষযোগ্য বিষয়। জগৎকে সমগ্রতার মাধ্যমে ধারণ করতে পারা কোনো ছোটখাটো বিষয় নয়। তিনি অচেতনে নয়, চেতনে বিনির্মাণ করছেন সেই নতুন সৃষ্টিবিশ্ব। এদিক দিয়ে বাংলা ভাষার কবিতায় মুহম্মদ নূরুল হুদার ধারে-কাছে তার সমকালীন কেউ নেই। এ নিয়ে তর্ক হতে পারে, হোক। যৌক্তিক ও গঠনমূলক তর্ক করতে আমি সবসময় প্রস্তুত। চায়ের কাপে ঝড় তুলতে পারি, শাহবাগ, কাঁটাবন, ছবির হাটে, ফুটপাতের মুদি দোকানে দাঁড়িয়ে কালোজিরা, লেবুর রস, আদা  মেশানো চা পান করতে করতে আমরা কত কী উড়িয়ে দিই, কিন্তু বাস্তবতা কী? বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কবিতার অন্তর্গত বোধের সমগ্র বেদনার জগৎ হচ্ছে মুহম্মদ নূরুল হুদার অখণ্ড সমগ্রতার জগৎ। কার্ল মার্কস যাকে বলেছেন সম্পূর্ণ মানুষ হওয়ার সাধনা। হাইডেগার যাকে বলেছেন Dasein বা Being। অস্তিত্ববাদী দার্শনিক কিয়েরকেগার্ড তো বহু আগে বলেছেন, ‘মানুষ যন্ত্রের নাটবল্টুতে পরিণত হয়ে গেছে, সে হৃদয় সংবেদ বা সৃষ্টিশীলতাকে অনুভব করবে কীভাবে’ কিন্তু আধুনিককালের দোহাই পাড়া নিষ্ঠুর যন্ত্রমানবগুলো লক্ষ করে না, তার পরিধিত কাপড়, শার্ট-প্যান্ট, জুতা, টাই, মোজা, চশমা, বেল্ট, আন্ডারঅয়ার, শ্যাম্পু, মুখে লাগানো ক্রিম সব কোনো না কোনো শ্রমিক তৈরি করেছেন, শিল্পী নকশা করেছেন, ডিজাইন দিয়েছেন, দীর্ঘদিন এটি নিয়ে ভেবেছেন। সকালে যে নাশতা বা ভাত খেয়ে তিনি সেজেগুজে বাবু হয়ে বের হয়েছেন সেই খাবারও অনেকগুলো শ্রমিক করে দিয়েছে বলে তিনি তৃপ্তিসহকারে খেতে পেরেছেন। কবি ও শিল্পীর সৃজনশীল শ্রম, দার্শনিকের ধ্যানের গভীর মনোশ্রম ও শ্রমিকের কায়িক শ্রমের বিনিময়ে এই বাবু সাজা ব্যক্তিটির সেটি যদি একবারও উপলব্ধিতে আসত, তাহলে বাবুটি বুঝতে পারত শিল্প কত গুরুত্বপূর্ণ, শ্রমিকের কত দাম, দর্শনের মহত্ত্ব কত সুন্দর। আধুনিক পৃথিবী যতই শিল্পের সতিন হয়ে উঠুক, কবিতার সতিন হয়ে উঠুক; সংবেদন ছাড়া মানবজন্ম-জন্মের দায় নিতে পারে না। সুতরাং আমাদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। তাহলে আধুনিকতার দৌড় কতদূর, টাইলস-গ্লাস, সিরামিক উত্তরাধুনিকতা, কাম, সমকাম, সেডিইজম, মডেল, নায়িকা, গায়িকা, ইউটিউব বেশ্যা, রিলসের নতুন অশ্লীলতা ইত্যাদিরও কিন্তু প্রদর্শন শেষ হয়ে গেছে। পাশ্চাত্য পুঁজিবাদ মানুষের যাবতীয় বিষয়কে পুঁজির মানদণ্ডে স্থির করে পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে ফেলেছে, শরীরেরও আর কোনো কসরত বাকি নেই। তবুও মানুষ অতৃপ্ত কেন? এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। এই বোধ নিয়েই হুদার কবিতার জগৎ। অখণ্ড সমগ্রতার জগৎ। তিনিও পরিপূর্ণ বা সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার সাধনা করেন।

‘যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে একজন শিল্পী অগ্রসর হন সে অভিজ্ঞতা একই সঙ্গে বস্তুগত, ভাবগত, স্মৃতিগত এবং রহস্যগত। এ-সমস্ত অভিজ্ঞতার সামগ্রিকতা থেকে উদ্ধৃত একটি উপলব্ধিকেই আমরা শিল্পকর্মে রূপ লাভ করতে দেখি। এরিক নিউটন একে বলেছেন ‘দুর্লভ আকাক্সক্ষার প্রকাশ’, যেখানে শিল্পী বিশ্বস্রষ্টার অধিকারকে আয়ত্ত করেছেন। যথার্থ শিল্পীর সৃষ্টি তাই স্মৃতিচারণ নয়, বস্তুর প্রতিনিধিত্ব নয়, কিন্তু একটি প্রত্যয়ের স্বাক্ষর। হুদার কবিতা এই লৌকিক প্রত্যয় নিয়ে তার সমগ্র সাধনাকে ছুঁয়েছে। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। জন্ম জনপদের জনগোষ্ঠীর জীবনকে তিনি এঁকেছেন লৌকিক সৌন্দর্যে। এক কথায় জগৎকে তিনি চিত্রশিল্পী ও কবির সংবেদনে রূপদান করেছেন।

মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতা পড়লে ওপরে উল্লিখিত এসব বিশ্লেষণের সত্যাসত্য খুঁজে পাওয়া যায়। মনে হয় এ যেন সমুদ্র দাঁড়িয়ে যে কোনো বিকেলে পবিত্র হৃদয়ে সমুদ্রের ভেতর হারিয়ে যাওয়া আর মুহূর্তের তৃপ্তিকর আনন্দ, বেদনা, অসুখী মনকে সান্ত¡নার প্রলেপ দেওয়া। এমন এক হার্দিক উপলব্ধিতে পৌঁছানো দিগন্তের খোসা ভেঙে একঝাঁক গাঙচিল উড়ে যেতে যেতে নীল সাদা মেঘ ছুঁয়ে মেঘের ভেতর দিয়ে অনন্তের আকাশের বুকে ডুবে যাওয়া। মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতা নিত্যদিনের যন্ত্রণাক্লিষ্ট মনকে প্রলেপ দেয়, দগ্ধ আত্মার চিকিৎসায় মনের হাসপাতালে শুশ্রুষা দিতে পারে; হৃদয়কে অলৌকিক সান্তনায় মিশিয়ে অসীম অনন্তে প্রার্থনায় ডুবে স্নিগ্ধ ও পবিত্র হয়ে উঠতে সহযোগিতা করে। বিকেলের সমুদ্রে দাঁড়ালে তপোমন হাহাকার করে, একটি বিষন্ন বিকেল ডুবে যায় রাতের অন্ধকারে, কী এক শিল্পের মর্মরে তার ছায়া এসে পড়ে আত্মার আলোয়। এমন তেজি, নরম বিষন্ন ও মহিমান্বিত পঙ্্ক্তির ঘোরে আমরা বিহ্বল হয়ে পড়ি। মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতা আমাদের চেতনায় শিল্পের সৌন্দর্য, আলোড়ন, সংবেদনে ডুবিয়ে রাখে। ‘সংস্কৃতির প্রতি একজনের দৃষ্টিভঙ্গি যাই থাকুক না কেন, শুধু সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে মানুষ ও ঘটনা পর্বের সমগ্রতা সম্ভব হয়ে ওঠে।’ মুহম্মদ নূরুল হুদার সমগ্রসূচিত মন তার রূপতত্ত্বের বেদনাকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছে। হুদা মূলত কবি, তিনি ভুলতও কবি, ঘোরগ্রস্ত, ভাবুক, ভাষার বিপ্লবী, কবি হুদা আর ‘যাই হোক না কেন, কোনো মোল্লা-পুরোহিততন্ত্রের প্রচারক না, শীতলহৃদয় বিশ্লেষক’ বা নিছক সাহিত্যের মোহন্ত নন।

কবি তবুও স্বপ্ন দেখে স্বপ্ন ও কল্পনা ছাড়া শুধু কবি নয়, বোধ-উপলব্ধিজাত কোনো মানুষই বাঁচতে পারে না। তাই কবিতা মানুষকে আদিষ্ট করে জাগরণে আর আবিষ্ট করে আবেশে-বাস্তবতার সৌন্দর্যে। হুদার কবিতা এই দুই সংশ্লেষে সংবেদিত। এটা সত্যি যে, শ্রেণি বিভক্ত সমাজে মানুষকে মুখোমুখি হতে হয় নিষ্ঠুর বাস্তবতার। ফলে প্রতিক্ষণই এই বাস্তবতার সঙ্গে তাকে সংগ্রাম করতে হয়। “বারবার তাকে সসীম ‘আমি’ ও একই সময়ে সমগ্রের অংশ এ দুয়ের মধ্যকার বিরোধের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। এখান থেকে মরমিবাদীরা অন্য এমন অবস্থার দিকে ধাবিত হয়েছে যেখানে মানুষ ‘নিজের পড়শি’, এবং এমন এক সমগ্রে যাকে গূঢ়ার্থে ঈশ্বর বলা হয়। আমরা মরমি নই এবং সেই স্ববিরোধী অবস্থানের আকাক্সক্ষা করি না, যেখানে সে বাস্তবতার সম্পূর্ণ অস্বীকার করার মাধ্যমে নিজের অস্তিত্ব মুছে ফেলে; যেখানে সে বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করার মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বকে ধ্বংস করার বাস্তবতার মধ্যে নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার আশা করে এবং এভাবে এক জীবন নিংড়ানো অসীমের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রত্যাশা করে।’ মুহম্মদ নূরুল হুদার লক্ষ্য চৈতন্যহীনতা নয়, বরং চৈতন্যের সর্বোচ্চ রূপকে তিনি অরূপে বেঁধেছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত