আমাদের দেশে সৃজনশীল পেশাদার লেখালেখির জায়গা নানান প্রকার। তবে কেন জানি কোনোটাই সেভাবে ঠিক দাঁড়াতে পারল না। ব্যক্তিগতভাবে আমি কয়েক প্রকার পেশাদারি লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত আছি আজ প্রায় দুই দশক। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসে বন্ধুরা যখন চাকরি-বাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে, আমি তখন বেরিয়ে গেলাম লেখালেখির জন্য। লিখতে গিয়ে দেখলাম আমাকে নিয়ে টানাটানি। ভাবলাম, বেশ তো! এই করে সচ্ছল এক জীবন গড়ে নেব। বিশ বছর পার করার পর এখন মনে হচ্ছে, পেশা হিসেবে লেখালেখিকে বেছে নেওয়াটা শুধু ভুল ছিল না, রীতিমতো পাপ ছিল। যেনতেন পাপ না, বড়মাপের পাপ, ক্ষমার অযোগ্য পাপ। কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারি না।
শুরুটা করেছিলাম টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ দিয়ে। ছোট ছোট স্ক্রিপ্ট। এক পর্বের স্ক্রিপ্ট এক হাজার টাকা। নগদ স্ক্রিপ্ট। নগদ টাকা। একসঙ্গে চার পর্বের স্ক্রিপ্ট। লিখতে সময় লাগত এক ঘণ্টা। কয়েকটা প্রোগ্রামের স্ক্রিপ্ট থেকে ভালো টাকা পেতে থাকলাম। ভালোই লাগছিল। এর মধ্যে যোগাযোগ করলেন অন্যান্য প্রডিউসারও। পালে তখন নতুন হাওয়া। দৌড়ে গিয়ে ঝটপট লিখে দিতাম। বেশিদিন সেই রঙ থাকেনি। শুনলাম, একসঙ্গে বিল দেবে। ভাবলাম, ভালোই হবে। একত্রে এতগুলো টাকা পেলে একটা বড় প্রয়োজন মেটানো যাবে। একদিন দুদিন করে এক-দুই মাস পেরিয়ে গেলেও প্রডিউসার ফোন রিসিভ করেন না। একদিন সরাসরি তার অফিসে গেলাম। জানালেন, প্রোগ্রামে স্ক্রিপ্টের বাজেট নেই। আমি কি প্রোগ্রামে এসিস্ট করব কিনা। দীর্ঘ দম নিয়ে বেরিয়ে চলে এলাম। কেউ আমার কয়েক মাসের টাকা মেরে দিল, জীবনে প্রথম অভিজ্ঞতা।
টেলিভিশনের স্ক্রিপ্ট যখন লিখছিলাম, তখন এক জাতীয় দৈনিকের ফিচার এডিটর বললেন বিষয়ভিত্তিক লেখা দিতে। প্রদায়ক বলা যায় না, তবে আচরণ যা পেয়েছি, তাতে নিজেকে প্রদায়কই ভাবি। কী আচরণ? প্রতি সপ্তাহে সব মিলিয়ে চার-পাঁচ হাজার শব্দ লিখে দিতে লাগলাম। ছয় মাস পর তিনি জানালেন ওই পত্রিকায় তিনি আর থাকছেন না, টাকাটা আমি যেন তাদের অ্যাকাউন্টস বিভাগ থেকে সংগ্রহ করে নিই। দুই-চারবার গিয়ে ক্লান্ত হয়ে আশা ছেড়ে দিলাম। দ্বিতীয়বার বড় রকমের ধরা খেলাম। আরেক জনপ্রিয় ফিচার এডিটর জনপ্রিয় একটা পাতার বিষয়ভিত্তিক কয়েকটা সংখ্যার মূল রচনা লিখিয়ে নিয়ে একটি টাকাও আর দিলেন না। বিল চাইলে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে পাঙ্গা নেওয়ার ক্ষতিকর দিক নিয়ে আমাকে বোঝাতে লাগলেন। তাকে সাংবাদিক ভেবে আমি আর বিল চাইবার সাহস করলাম না।
দেশসেরা একজন শিল্পপতি এবং রাজনীতিবিদের বায়োগ্রাফি লেখার কাজ পেয়ে গেলাম। বর্ণাঢ্য জীবন। তার পূর্বপুরুষের ইতিহাস থেকে শুরু করে বর্তমান অবস্থান পর্যন্ত পুরো জার্নি লিখতে হবে নিখুঁত কায়দায়। অডিও রেকর্ড করে এনে দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে দেড় বছর ধরে লিখলাম। বিল পেলাম এক লাখ টাকা। যেহেতু আমার কাজের ফাঁকে ফাঁকে লিখতাম, তাই একত্রে এক লাখ টাকা পেয়ে আমি ভালোই আনন্দিত। তবে, আনন্দ ফিকে হয়ে বিষাদে গড়াল যখন জানলাম, এই কাজের বিল তিনি দিয়েছেন বিশ লাখ টাকা। যিনি কাজটা দিয়েছিলেন তিনি পুরোটাই মেরে দিয়েছেন। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল আমার। এখনো অস্থিরতা কাজ করে ওই অভিজ্ঞতা মনে হলেই।
গান লেখালেখিতে আমরা তো বেশ ব্যস্ত বিশ বছর ধরেই। এই জায়গায় এখন পরিবর্তন হলেও শুরুর দিকের অভিজ্ঞতা বেশ জঘন্যই বলব। শুরুর দিকে বাংলা গানের এক কিংবদন্তির সঙ্গে কাজ করলাম। পুরো একটা অ্যালবামে গান লিখলাম। সব গান আমার লেখা। বারোটা গান। ভালো একটা ফোন কিনব ভেবেছিলাম। ভালো ফোন বলতে ১০-১২ হাজার টাকার একটা ফোন। কারণ, তখন যে ফোন ইউজ করতাম, সেটা কিনেছিলাম দুই হাজার টাকায়। তো, অ্যালবাম প্রকাশের পর কিংবদন্তি আমাকে টাকা দিলেন আড়াই হাজার। অভিজ্ঞতা কেমন বলব? ইচ্ছা করছে না। কেননা, সব গানই জনপ্রিয় হয়েছে। এখনো কোথাও বেজে ওঠে। শুনতেই মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়।
ইদানীং শুরু হয়েছে, অনলাইন পোর্টালে লেখালেখি। কয়েক বছর আগে ফেসবুকে বড়সড় লেখা লিখলেই কোনো কোনো সম্পাদক অনুমতি না নিয়ে নিজেরা আপলোড করে হিমালয় জয় করত। মানে, আপলোড করে সেই লিঙ্ক ইনবক্সে দিতে বলত ‘শেয়ার প্লিজ’। সেটা এখন অনেকটা কমে গেলেও একটা জায়গায় অস্বস্তিকর অবস্থা রয়ে গেছে। বেশ গ্রহণযোগ্য এবং জনপ্রিয় পোর্টালের সম্পাদক লেখা চেয়ে বসেন। দুই-একবার বড়সড় লেখা জমা দিলেও সেসবের বিলের কথা উচ্চারণ করতেও তিনি লজ্জা পান। স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘদিনের একটা সুন্দর সম্পর্কে আলগোছে চিড় ধরে যায়।
আরেকটা জায়গা আছে লেখালেখির। সেটা মিডিয়া পাড়ায়। যে কোনো কিছুর স্ক্রিপ্ট লিখিয়ে নেবে। বিল দেওয়া যাবে না আপাতত। কারণ, এটা প্রপোজালের অংশ। পাস হলে বিল হবে, পাস না হলে টা টা। এখানে একটা কমন সংলাপ, ‘ভাই, লেইখা দেন, একটা ট্রায়াল মারি। হয়ে গেলে দুই ভাই মিলেই একটা ভালো আউটপুট পাব।’ এই ট্রায়াল বছরের পর বছর চলতে থাকে। পরিচালক গাড়ি কেনে, অভিনেতা ফ্ল্যাট কেনে, লেখক এক কাপ চা খায় বাকিতে।
বিশ বছরের ক্যারিয়ারের প্রকাশযোগ্য হতাশার গল্প বিচ্ছিন্নভাবে তুলে ধরলাম। যা কিছু বলতে পারলাম না, তা বেদনার মহাকাব্য। থাকুক সেসব। তবে এটা সত্য যে, এ দেশে পেশাদারি লেখালেখির জায়গা নেই। যেগুলো আছে, তা অনিয়মিত। সেসব নিয়মিত জীবনের অংশ ভেবে নেওয়া হাস্যকর।
অথচ একটা কথা বলতেই হয়। বলতে ইচ্ছা করছে। এ দেশ তো সেই দেশ, যেখানে প্রায় সবাই কবিতা ভালোবাসে। গল্প ভালোবাসে। গানের কথার দিকে তাকিয়ে স্বপ্নবাজ হয়। দুঃখ পায়। দুঃখ ভুলে যায়। সবকিছুতে এই জাতি শেষ পর্যন্ত শব্দের কাছে নিজেদের সমর্পণ করে। এক সময় পাড়া-মহল্লায় পাঠাগার ছিল। ক্লাব ঘর ছিল। পাঠ্যাভ্যাস ছিল উৎসবের মতো। এখনো আছে। ফেসবুকে বইপোকাদের আড্ডা আছে। বই নিয়ে ফেসবুকে কত শত গ্রুপ আছে। পেজ আছে। আজকাল সবাই ফেসবুকে একটা ছবি দিতে গেলেও একটা কবিতার লাইন জুড়ে দেয় ক্যাপশনে। সাহিত্য ফ্রিক একটা জাতির মধ্যে যারা লেখালেখিতে জড়িত, তাদের যদি ঠিকঠাক সম্মানীটা বুঝিয়ে দেওয়া হতো, তবে চিত্র বদলে যেত। দেশে অপরাধ কমে যেত। প্রজন্ম ব্যস্ত থাকত সুকুমার বৃত্তি চর্চায়। মানুষের মূল্যবোধে প্রভাব পড়ত দারুণ। যারা লিখতে আসছে, তাদের অভিনন্দন জানানো হোক। কর্মশালার ব্যবস্থা করা হোক। সংসদে বিল পাস হোক লেখালেখির উপযুক্ত সম্মানীর বিষয়ে। আমরা এসব স্বপ্ন দেখে ঘোরে থাকতে চাই না। উদ্যোগী হলে এসব স্বপ্ন বাস্তবে নিয়ে যাওয়া কঠিন কিছু না।
