শর্তহীন সংলাপের জোরালো তাগিদ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু চিঠি দিলেও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক সাড়া মেলেনি। এর মধ্যে আজ তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। ফলে নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকটের সমাধান না করে সরকার নির্বাচনের পথে হাঁটলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে চাপ আরও বাড়তে পারে। কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পাশাপাশি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জোরালো তাগিদ দিয়ে গত সোমবার শর্তহীন সংলাপের আহ্বান জানিয়ে দেশের প্রধান তিন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিকে চিঠি দিয়েছেন ডোনাল্ড লু। এ নিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। সোমবার রাতেই বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রহুল কবির রিজভী লুর চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করেন। তবে গতকাল রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্যমতে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করেনি।
যদিও আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায়ের একাধিক নেতা গতকাল মঙ্গলবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের এই শর্তহীন সংলাপের আহ্বানের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন গতকাল সাংবাদিকদের এ-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের বিষয়ে আপত্তি নেই সরকারের। তবে কার সঙ্গে সংলাপ হবে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বন্ধু কোনো দেশ পরামর্শ দিলে তা মূল্যায়ন করবে সরকার। আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকও সংলাপের বিষয়ে এক অনুষ্ঠানে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক চাপ এবং নির্বাচন নিয়ে বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোর অবরোধ-হরতাল কর্মসূচির মধ্যে নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণার বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এই পরিস্থিতিতে তফসিল হলে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়বে বলে তারা মনে করছেন। কারণ শক্তিশালী রাজনৈতিক পক্ষগুলো এখনো সংলাপ নিয়ে একমত হতে পারেনি। বরং তফসিল হলে নির্বাচন কমিশন অভিমুখে পদযাত্রাসহ কঠোর কর্মসূচির কথা বলা হচ্ছে। তারা মনে করেন, তফসিল হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের পশ্চিমা জোটের মিত্র দেশগুলো আরও চাপ তৈরি করবে। এ ক্ষেত্রে তারা সংসদের বিরোধী দল ও সরকার-ঘনিষ্ঠ জাতীয় পার্টির সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখবে। এখন জাতীয় পার্টির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিমধ্যে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে দলটিতে দ্বিধা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তফসিল হলেও সহজেই ছেড়ে দেবে না যুক্তরাষ্ট্র। তারা তাদের ইস্যুতে শেষ পর্যন্ত তৎপর থাকবে। তফসিলের পর যদি নির্বাচন কমিশন শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারে তাহলে প্রয়োজনে পুনঃতফসিল হবে।
এ বিষয়ে জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠানের (জানিপপ) চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংলাপ তফসিলের আগেই হওয়া উচিত। ২০০৬ সালেও নির্বাচনের তফসিল হয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে সেই তফসিল বাতিল করা হয়েছিল। সেই নির্বাচন দুই বছর পর হয়েছে। কাজেই এ রকম অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানকে পাশ কাটিয়ে নির্বাচন হয়েছে এমন অনেক দেশ রয়েছে। পরে এসব দেশ নিষেধাজ্ঞা বা স্যাংশনের মধ্যে পড়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। তারাও হয়তো চাপে পড়তে পারেন। কারণ নিষেধাজ্ঞা দিলে তাদের পরিবারের ওপর এর প্রভাব পড়বে। সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব পড়বে।
যদিও ডোনাল্ড লুর চিঠি তফসিল ঘোষণার ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সচিব জাহাংগীর আলম। তিনি বলেছেন, চিঠিটি সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে কি না, সেটা কমিশন অবহিত নয়। কারণ, চিঠি কমিশনের কাছে আসেনি।
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখনো সংলাপের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতার আশা দেখা যাচ্ছে না। তবে সরকার চাইলে সংলাপের আয়োজন করতে পারে। সরকার আসলে সংলাপ চায় কি না, সেটি দেখতে হবে।’ তিনি মনে করেন, এটা স্পষ্ট, তফসিলের দুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র চিঠি দেওয়ার অর্থ হলো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে তাদের চাপ অব্যাহত রাখা। যুক্তরাষ্ট্র কিছুদিন ধরে বলে আসছে, বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায় দেশটি। এজন্য তারা চারপাশের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে।
তৌহিদ হোসেন বলেন, গত ১০ নভেম্বর দিল্লিতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের (২+২) বৈঠকে বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গটি এসেছে। বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রা ব্রিফিংয়ে যা বলেছেন, তাতে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ভারত পছন্দ করছে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করে সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছে।
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালি উর রহমান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচন নিয়ে তাদের তৎপরতা অব্যাহত রাখবে, এটা বোঝা যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রও শক্তিশালী হয়েছে। সরকার যদি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারে তাহলে আর কোনো পক্ষেরই কথা থাকবে না। এটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। অনেক বড় দেশ সেটা যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছেও।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, তফসিলের পরও যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা জোট তৎপরতা চালাবে। এ ক্ষেত্রে যেসব রাজনৈতিক দল বিশেষ করে সরকারের ঘনিষ্ঠ বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ ইসলামি কিছু দলকে ভিসানীতি প্রয়োগের বিষয়ে অবহিত করবে। নির্বাচনের পরও যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। এর মধ্যে পোশাকশিল্পসহ বাংলাদেশের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন রয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর পক্ষ থেকেও নেতিবাচক চাপ তৈরি হতে পারে।