যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত নারী নিপীড়ক ও নারী পাচারকারী জেফরি এপস্টেইন-সংশ্লিষ্ট একটি মামলার নথিতে এবার নাম এসেছে দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের নামসহ নারী নিপীড়নের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
এপস্টেইনের প্রেমিকা জিসলেন ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালে মামলাটি করেছিলেন ভার্জিনিয়া জুফরে। সম্প্রতি নিউ ইয়র্কের একটি আদালত ওই মামলার নথি প্রকাশের অনুমতি দেন। নতুন প্রকাশিত নথিতে হিলারি ক্লিনটনকে ‘সুনির্দিষ্ট ১৩ জন প্রত্যক্ষদর্শীর’ একজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন ভার্জিনিয়া জুফরে। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ তোলা হয়নি। এর আগে প্রকাশিত নথিতে তার স্বামী সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের নাম এসেছিল। অভিযোগ তিনি এপস্টেইনের ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে করে সফরে গিয়েছিলেন। ক্যারিবীয় অঞ্চলে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপও ভ্রমণ করেছিলেন। এপস্টেইন-সংশ্লিষ্ট কুখ্যাত এই যৌন কেলেঙ্কারির মামলায় তিন ধাপে প্রকাশিত নথিতে আরও নাম রয়েছে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যুক্তরাজ্যের প্রিন্স অ্যান্ড্রু, প্রয়াত পপ তারকা মাইকেল জ্যাকসন, জাদুশিল্পী ডেভিড কপারফিল্ড, প্রয়াত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংসহ খ্যাতনামা ব্যক্তিদের নাম। এপস্টেইনের এই তালিকা আরেকবার আমাদের মনে করিয়ে দিল এলিটদের নেতৃত্বাধীন সমাজব্যবস্থায় ক্ষমতাসীনদের কত ভয়ংকর কর্মকা- বিচারের বাইরেই রয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে হায়াট হোটেলের নির্বাহী সভাপতি টমাস প্রিৎজ্কার আর তারকা আইনজীবী অ্যালান ডারসোউইৎজের মিল কোথায়? এই পৃথিবীর ধনসম্পদের একটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ অংশের মালিক, সাদা চামড়ার আমেরিকান পুরুষ হওয়া ছাড়াও, এই চারজন হলেন শিশুদের যৌন নির্যাতনকারী পুঁজিপতি এবং নারী পাচারকারী জেফরি এপস্টেইনের তালিকায় প্রথম যাদের নাম ফাঁস হয়েছে তাদের একজন। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কারাগারে আত্মহত্যা করেন এপস্টেইন। তারপরেই সিলগালা করা আদালতের নথিগুলো প্রকাশ করা হয়।
এই নথিতে দেড়শতাধিক নাম রয়েছে। যদিও শুধু নথিতে নাম থাকা কোনো অপরাধের মধ্যে পড়ছে না। আর সংবাদমাধ্যমগুলো নতুন গল্পের সম্ভাবনায় কোমর বেঁধে নেমে পড়লেও, এখানে আসলে চমকে যাওয়ার মতো কোনো নতুন ঘটনা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি পুরুষতান্ত্রিক পুঁজিবাদী সমাজে, যেখানে নারীদের বিশেষভাবে বস্তু হিসেবে দেখা হয়, পণ্যায়ন করা হয়, সেখানে ক্ষমতাসীনরা এইরকম নিষ্ঠুর ব্যবস্থাকে সমর্থন করবে এ আর আশ্চর্য কী! ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদাহরণই ধরা যাক। ধর্ষণ, যৌন নিপীড়নসহ হেন অভিযোগ নেই যা তার বিরুদ্ধে নেই। এছাড়া নিয়মিতভাবেই অশালীন মন্তব্য করে থাকেন তিনি, এমনকি নিজের মেয়ে সম্পর্কেও তিনি বলেছেন, ইভাঙ্কা আমার মেয়ে না হলে সম্ভবত আমি তার সঙ্গে ডেট করতাম! ফলে তিনি যে এপস্টেইনের নষ্টামির সঙ্গে জড়িত থাকবেন, এতে আর অবাক হওয়ার কী আছে। অন্যদিকে, নথিগুলোতে বিল ক্লিনটনের নাম এসেছে অন্তত ৭৩ বার, এর মধ্যে এপস্টেইনের যৌন লালসার শিকার জোহানা সোয়বার্গের সাক্ষ্যেও তার নাম এসেছে। যেখানে ক্লিনটনের নারী আসক্তির কথা উল্লেখ করতে গিয়ে এপস্টেইন বলেন, তিনি কম বয়সীদের পছন্দ করেন। এতেও আমাদের অজানা কোনো তথ্য নেই। কারণ, মনিকা লিউনস্কির ঘটনা আমাদের ভুলে না যাওয়ারই কথা। আর নতুন করে যে ওই নথিতে তার স্ত্রী ও ফার্স্ট লেডি এবং সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের নাম আসাতেও আমাদের অবাক হওয়ার জায়গা কম। কারণ, মনিকা লিউনস্কির ঘটনায় তিনি ফার্স্ট লেডি থাকাকালে ক্লিনটনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
তবে বৈশ্বিক পরাশক্তি কোনো দেশের প্রধানের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নৈতিকতা কখনোই কোনো মাপকাঠি নয়। হায়াত হোটেল সাম্রাজ্যের মালিক, বিলিয়নিয়ার টমাস প্রিৎজ্কারের নাম এসেছে এপস্টেইনের ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া রবার্টস জিউফ্রেকে জোরপূর্বক সেবাদানে বাধ্য করা ব্যক্তিদের অন্যতম হিসেবে। এবং তারপর রয়েছে ফৌজদারি আইনজীবী এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক অ্যালান ডারসোইৎজ, যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সময় কাটাতে এপস্টেইন একজন অপ্রাপ্ত বয়সী নারীকে বহুবার এনে দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ আছে নথিতে।
জানুয়ারির ৪ তারিখে আলজাজিরায় প্রকাশ হয়, ফ্লোরিডার আদালতে এপস্টেইন এবং তার সহযোগীদের দায়মুক্তি দিতে চুক্তি করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন ডারসোইৎজ। এপস্টেইন তালিকায় যত জনের নাম এসেছে, এই মুহূর্তে তার মধ্যে সবচেয়ে মনোযোগের দাবিদার এই ডারসোইৎজ। কারণ আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে ইসরায়েলের পক্ষে দাঁড়াতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাকেই নিয়োগ করার কথা ভাবছেন। এমনিতে এই গণহত্যার মামলায় মাথা খাটানোর মতো কিছুই নেই। তবে তথ্য ও যুক্তির বাইরে গিয়ে অপরাধীদের পক্ষে সাফাই গাইতে বিশেষ সুনাম রয়েছে ডারসোইৎজের। এরই মধ্যে একাধিক উপলক্ষে নিজেকে গোঁড়া জায়নবাদীর চেয়েও বেশি বলে প্রমাণ করেছেন ডারসোইৎজ। যেমন ২০০৬ সালের গ্রীষ্মে লেবাননের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধের সময় যখন ৩৪ দিনে ১২০০ মানুষের মৃত্যু হয়, যার বেশিরভাগই ছিল বেসামরিক নাগরিক। এর এক সপ্তাহ পর ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের জন্য কলম ধরেন ডারসোইৎজ, যার শিরোনাম ছিল যন্ত্রণার পাটিগণিত। সে লেখায় তিনি ‘বেসামরিকীকরণের ধারাবাহিকতা’ বলে একটি নতুন প্রস্তাব করেন, যার প্রধান যুক্তি ছিল লেবাননে সত্যিকারের কোনো বেসামরিক নাগরিকই নেই। ডারসোইৎজের ‘ধারাবাহিকতায়’ নারী এবং শিশুদেরও সব সময় বেসামরিক নাগরিক হিসেবে ধরা যাবে না। ইসরায়েলের পক্ষে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতের মামলায় এই যুক্তি খুবই কাজে লাগবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
নিশ্চিত করেই বলা যায়, এপস্টেইনের তালিকা কোনো চমক নয়, বরং মনে করিয়ে দিচ্ছে এলিট নিয়ন্ত্রিত একটি নষ্ট সমাজব্যবস্থায় কীভাবে ক্ষমতাশালীদের ভয়ংকর কার্যকলাপ আইনের আওতার বাইরেই রয়ে যায়। গণমাধ্যমে যতই ট্যাবলয়েডের মতো মর্যাদা দেওয়া হোক না কেন এটা আসলে কোনো সংবাদের পর্যায়েই পড়ে না।
লেখক : আলজাজিরার কলাম লেখক
আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : নাদিয়া সারওয়াত