ট্রাম্পের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির সখ্য কেন

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০৭ এএম

গোড়ার কথা বা পরিশিষ্ট নিয়ে চোদ্দ অধ্যায়ের ১৩৫ পাতার ছোট একটি বই। লিখেছেন নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়। ভদ্রলোক ছিলেন একদা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের নেতা। পরে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে কট্টর আরএসএস বিরোধী। বেশ কয়েক বছর আগে ইংরেজি ভাষায় তার লেখা, ‘ইন দ্য বেলি অফ দ্য বিস্ট’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। মুগ্ধ না বলে চমকে উঠেছিলাম শব্দটিই হয়তো এখানে ঠিকঠাক। কেননা এর আগেও আরএসএস বা সংঘ পরিবার সম্পর্কে লেখাপত্তর একদম পড়িনি তা নয়। তবে পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষত্ব এই যে তিনি তাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ছিলেন। বাবাও বিশিষ্ট সংঘ নেতা জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলে বাবার দৌলতে শৈশব থেকেই পার্থ বড় হয়েছেন সংঘের পরিবেশে।

তাই ভেতর থেকে একটা সংগঠনের ভালোমন্দ যেভাবে চেনা সম্ভব তা হাজার গবেষণাতেও অসম্ভব। তাই প্রাক্তন আরএসএস নেতার লেখা নিছক কোনো রচনা নয়। এ এক জবানবন্দি। যা পড়তে পড়তে শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। মনে রাখতে হবে, সব সময় মনে রাখবেন এই আরএসএস কিন্তু ভারতের শাসকদের মূল চালিকাশক্তি। দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং দীর্ঘদিন ছিলেন আরএসএসের প্রচারক। আরএসএস নিয়ন্ত্রণ করে বিজেপি দলটিকে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা ও আর দু-একজন ছাড়া দেশের আজকের নীতিনির্ধারকদের প্রায় সবাই আরএসএস থেকে উঠে এসেছেন। এবং আজও তারা এই সংগঠনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। ফলে আরএসএসকে না জানলে আজ ভারত কোন পথে যাচ্ছে, কাদের নির্দেশে তা কোনোদিনই পুরোপুরি বুঝতে পারবেন না।

এবারের নির্বাচন, স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। কে জিতবে এখানে অবান্তর প্রশ্ন। প্রশ্ন হচ্ছে বিজেপি যদি বিপুল সংখ্যক আসনে জিতে ফের দেশের কুরসি দখল নিতে পারে, তখন আমাদের দেশের গণতন্ত্র, ব্যক্তি, বাক বা ধর্মীয় আচরণের স্বাধীনতা কতটা থাকবে, এই দেশ পুরোপুরি ফ্যাসিবাদী পথে হাঁটবে কি না তাই নিয়ে।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় তার অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝেছেন যে ভয়ংকর এক সময় আসতে চলেছে। ইন দ্য বেলি অফ দ্য বিস্ট লেখার পর পরই কষ্ট করে লেখকের সঙ্গে আলাপ করেছিলাম। ঘনিষ্ঠতা বাড়ার এক পর্যায়ে তিনি যখন স্রেফ পার্থ দা হয়ে উঠলেন। তখন থেকে এটা বুঝতে পেরেছি যে ভদ্রলোকের সঙ্গে অন্যান্য অনেক ব্যাপারে একমত না হলেও সংঘ পরিবারের মতাদর্শ ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে তার অসি যুদ্ধ তারিফযোগ্য। নতুন এই বইয়ের তিনি নাম দিয়েছেন ‘ভারত শেষ ধ্বংসের সন্ধিক্ষণে’। বইটা ছোট, কিন্তু পরতে পরতে বিস্ফোরক দিয়ে ঠাসা।

কলম যে কখনো কখনো তলোয়ারের চেয়ে অনেক শক্তিশালী, তা এই বইটি পড়ে আরও একবার বুঝতে পারলাম। আমাদের দুর্ভাগ্য যে ফ্যাসিবাদী রাজনীতি নিয়ে যারা, অন্তত সতত সোচ্চার তারাও কেউ জনে জনে এ ধরনের লেখা পৌঁছে দিতে উদ্যোগ নেন না। তারপর তো আছে, লেখক কোন দলের, কোন গোষ্ঠীর, কী তার উদ্দেশ্য ইত্যাদি ইত্যাদি হরেক জটিল প্রশ্ন। আমাদের রাজ্যে কি লেখা, কি ছবি, কি নাটক এসবের বিচার হয় না। এখানে কে বলছেন, কে লিখেছেন, কে সিনেমা বা নাটক করেছেন সেটাই বিচার্য। দেখতে হবে তিনি কোন দলের!  আমার দলের হলে সাত খুন মাপ। অন্যদের গায়ে বিরুদ্ধ গন্ধ লেগে থাকলে তার কাজ হাজার ভালো হলেও বিষবৎ পরিত্যাজ্য। বামপন্থি শিবিরের মধ্যে অবশ্য তুলনামূলকভাবে এই প্রবণতা বেশিই। সংস্কৃতির যত বড়াই করুক না কেন, বামেরা এই কঠিনতম পরিস্থিতিতেও গোষ্ঠীর বাইরে কাউকে স্বাগত জানাতে পারেন না এটা নিশ্চিত দুঃখের। অথচ এই বই কোনো সন্দেহ নেই নীচু তলার বামকর্মীদের কাছেও বিজেপি, আরএসএসের রাজনীতির বিপক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অস্ত্র।

বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে আরএসএস, বিজেপির রাজনীতি যে শুধুই জাতীয়তাবাদী নয়, এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক দক্ষিণপন্থার গভীর যোগ তা স্পষ্ট করে লেখক বুঝিয়েছেন। লেখক শুরুর দিকে এক অভিনবভাবে লেখাটা আরম্ভ করেছেন।

হুবহু তুলে দিচ্ছি ‘ফেসবুকে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম ২০২৩ সালের শেষের দিকে। তাতে লিখেছিলাম: একটা জরুরি সার্ভে করা দরকার আমার পরের বইটার জন্য। বইটা ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগেই বেরিয়ে যাবে, যাতে হিংসা-বিরোধী, ফ্যাসিস্ট-বিরোধী ও ধর্মান্ধতা-বিরোধী সাধারণ শান্তিকামী মানুষ তা কাজে লাগাতে পারেন। মোদি, আরএসএস, বিজেপি, এরা ২০১৯-এ পুলওয়ামা নামক নির্বাচনী স্টান্ট অর্থাৎ চমক দিয়েছিল। তুরুপের তাস। যার তদন্ত আজও জানা যায়নি, মিডিয়া এই ব্যাপারে চুপ। যাই হোক, প্রশ্ন রাখছি- এবারের স্টান্ট, চমক বা তুরুপের তাস কী হতে পারে আপনাদের মনে হয়? দু’তিন দিনের মধ্যে যেসব উত্তর এসেছিল, তার কয়েকটা এখানে দিলাম। উত্তরগুলো আলাদা আলাদা ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া গেছে। কেউ কেউ নাম ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছেন। যারা দেননি, তাদের নাম উহ্য রাখলাম এবং তাদের লেখা ঠিক যেমন পেয়েছি, তেমনি লিখেছি, কোনোরকম পরিবর্তন না করে। মহাশ্বেতা সমাজদার লিখেছিলেন রাম মন্দিরে হামলা তার জবাবে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে আক্রমণ। শোভনীতা দত্ত লিখেছেন তুরুপের ছোট অঙ্কের তাস ফেলা শুরু হয়ে গেছে। চন্দ্রায়ন অন্যতম। পরের তাস সৌর অভিযান। রঙের গোলাম আসবে সবার শেষে একটা বড় বিস্ফোরণ/দুর্ঘটনা হয়ে, সাধারণ মানুষের মৃত্যু, নাটকীয় অশ্রুপাত এবং দায়ী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, জাতিবিদ্বেষ উসকে দিয়ে মনে করিয়ে দেওয়া ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়’। পৌষালী গোস্বামী লিখেছেন ভারতবর্ষের যে কোনো নামকরা (তিরুপতি হতে পারে) মন্দিরে ব্যাপক বিস্ফোরণ, ঘটনার জন্য দায়ী পাকিস্তান... ব্যস কেল্লা ফতে।’

একের পর এক এ-রকম বহু মন্তব্যের মধ্যে দুটো জিনিস পরিষ্কার। এক, দেশের বহুসংখ্যক লোক বিশ্বাস করে ভারতের শাসকরা ক্ষমতা দখলের জন্য হেন কাজ নেই যা করতে পারে না। দুই, আপাত ধারণা তিনি, মহামহিম হিন্দু হৃদয় সম্রাট। তাও পুরো ঠিক নয়। বিজেপি আদতে একটি মনুবাদী হিংস্র দল। যাদের সঙ্গে সাধারণ ধর্মপ্রাণ হিন্দুর কোনো সম্পর্ক নেই।

লেখক অত্যন্ত যুক্তি দিয়ে পৃথিবীব্যাপী যে দক্ষিণপন্থি রাজনীতির বিস্তার, ভারতের শাসক রাজনীতির সঙ্গে যে তার গভীর যোগ তা বিশদভাবে বুঝিয়েছেন। বিশেষ করে আমেরিকার ট্রাম্পের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির সখ্য ঠিক কেন তার ব্যাখ্যা পাবেন বইটি পড়লে। ট্রাম্পের মতোই মোদি চমকে বিশ্বাস করেন। যা বলেন তা পুরোপুরি ফাঁকা আওয়াজ। যেমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি মসনদে বসলে দুনিয়ার যেখানে দেশের কালো টাকা লুকিয়ে রাখা আছে তা তিনি ফেরত আনবেন। তা এত টাকা যে সব ভারতের জনগণের পকেটে ঢুকবে ১৫ লাখ করে টাকা। এর চেয়ে বড় ধোঁকা যে হয় না, ভারতের লোকজন তা বুঝেছেন নিশ্চিত। নরেন্দ্র মোদি প্রায়ই দুর্নীতি নিয়ে সোচ্চার হন। চিৎকার করেন না খাউঙ্গি, না খানে দুঙ্গা। অর্থাৎ নিজে খাব না, খেতেও দেব না। নিজে ঘুষ খেয়েছেন কি খাননি জানি না। কিন্তু রাফায়েল থেকে হালের পৃথিবীর সব থেকে বড় স্ক্যাম, ইলেকটোরাল বন্ড দুর্নীতি যে বিজেপি আমলে, নরেন্দ্র মোদির শাসনকালে হয়েছে তা তো সবাই জানেন। লেখক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন বড় বড় কথার আড়ালে ভারতের অর্থনীতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রের অন্তঃসারশূন্য চেহারা।

আমি বই রিভিউ করতে বসিনি। শুধু পড়তে পড়তে মনে হলো পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আমার যন্ত্রণা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করি। আগামী নির্বাচনে কে কটা সিট পাবে তার থেকেও কঠিন বিষয়, চরম মনুবাদী দলটি যদি জেতে তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার বিপদ নিশ্চিত বাড়বে। এই বই পড়লে আরএসএসের সাম্প্রদায়িক চেহারা স্পষ্ট হবে। আরএসএসের ছুটি ও উৎসবের তালিকায় নমো নমো করে, চাঁদ সওদাগরের বাঁ হাতে মনসা পূজা করার মতো একটা দুটো বৌদ্ধ, শিখ ধর্মের উল্লেখ আছে। তাও তাদের নিজেদের দলে নেওয়ার স্বার্থে। মুসলিম, খ্রিস্টানদের নামগন্ধ নেই। আরও মজার কথা যে, ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসের কথাও নেই। তারপরেও বিজেপি, আরএসএস যদি দেশপ্রেমিক বলে পরিচিত হয়, তাহলে তা হবে শতাব্দীর সেরা জোকস। অভিযান বইটি ছেপে এক দুঃসাহসী কাজ করলেন। তাদের ধন্যবাদ।

লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত