চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টা সেবা বন্ধ রাখলেন চিকিৎসকেরা

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৫২ পিএম

দুই চিকিৎসককে মারধরের প্রতিবাদে ২৪ ঘণ্টার জন্য (মঙ্গলবার ভোর ৬টা থেকে বুধবার ভোর ৬টা পর্যন্ত) রোগীদের সেবা বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) চট্টগ্রাম শাখা। 

কর্মসূচির অংশ হিসেবে মঙ্গলবার (২৩ এপ্রিল) ভোর ৬টা থেকে চট্টগ্রামে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বার এবং রোগ নির্ণয়কেন্দ্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। আগামীকাল ভোর ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টা এই কর্মসূচি পালন হবে। 

চট্টগ্রাম ও আশপাশের জেলা থেকে নগরের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সেবা নিতে গিয়ে অসংখ্য রোগী ফিরলেন বিনা চিকিৎসাতেই।  চিকিৎসা না পেয়ে ফেরার মুখে অনেক রোগী ও তাদের স্বজনেরা বলে গেলেন ‘আমাদের কি অপরাধ?’

মঙ্গলবার (২৩ এপ্রিল) সকাল থেকে নগরের বেসরকারি সিএসসিআর, মেডিকেল সেন্টার, পার্কভিউ হসপিটাল, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতাল, এপিক, শেভরণসহ বিভিন্ন  প্রতিষ্ঠানে ভিড় জমে  রোগী ও তাদের স্বজনদের। 

সকাল ১০টায় ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থেকে ছয় বছরের সন্তানকে নিয়ে প্রবর্ত্তক মোড়ে বেসরকারি সিএসসিআর হাসপাতালে এসেছিলেন আবদুল মোতালেব। চিকিৎসা সেবা বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েন তিনি। সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টার পর্যন্ত অপেক্ষা করে ৮ বছরের শিশুকন্যার চিকিৎসা না পেয়ে একই হাসপাতাল থেকে হতাশ হয়ে ফেরেন নগরের চান্দগাঁও এলাকার গৃহবধূ মরিয়ম বেগম।

মঙ্গলবার সকাল ১১টায় পাবর্ত্য রাঙামাটি থেকে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত স্বামী চিং মং চাকমার সিটিস্ক্যান করাতে নগরের কাতালগঞ্জে বেসরকারি রোগনির্ণয় কেন্দ্র ইবনে সিনায় আসেন স্ত্রী শুভ্র চাকমা। বেলা ১টা পর্যন্ত অপেক্ষার পরে তিনি জানতে পারেন–চিকিৎসকদের কর্মবিরতির কারণে বুধবার (২৪ এপ্রিল) ভোর ৬টা পর্যন্ত কোনো রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে না। অবশেষে হতাশ হয়ে অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে ইবনে সিনা ত্যাগ করেন তিনি। 

মঙ্গলবার বেলা ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত সরেজমিন নগরের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ঘুরে অসংখ্য রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তির চিত্র দেখতে পান দেশ রুপান্তরের এই প্রতিবেদক। নগরের পাঁচলাইশ এলাকায়   শেভরণ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়–শরীরের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার করতে আসা শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশুর জটলা। তাদের একজন রুবেল কান্তি ধর। 

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘লিপিড প্রোফাইল, সিবিসি পরীক্ষার জন্য রক্তের নমুনা দিতে এসেছি। সকাল থেকে দুপর পর্যন্ত অপেক্ষা করছি। কিন্তু যারা নমুনা নেবেন তারা চেম্বারে নেই। আমাদের কী দোষ?’

চমেক হাসপাতালের অদূরে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়েও দেখা গেছে একই চিত্র। চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বার বন্ধ। আগে থেকে সাক্ষাতের দিন ধার্য থাকায় অর্শরোগ বিশেষজ্ঞ এক চিকিৎসকের কাছে  ফটিকছড়ি থেকে এসছেন ৬০ বছর বয়সী লোকমান হাকিম (ছদ্মনাম)। 

তিনি বলেন, ‘দুই চিকিৎসককে মারধরের জেরে চিকিৎসকদের কর্মসূচি ডাকা রোগীদের সঙ্গে তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়। এসব চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’

দুই চিকিৎসককে মারধরের জেরে গত ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে অনুষ্ঠিত এক প্রতিবাদ সভা  থেকে এই কর্মসূচি আহ্বান করে বিএমএ চট্টগ্রাম শাখা। এর আগে ২০ এপ্রিল চট্টগ্রামের চিকিৎসকেরা দুই ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করেন। ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ মঙ্গলবার সকাল ছয়টা থেকে ২৪ ঘণ্টা ব্যক্তিগত  চেম্বার বন্ধ রাখার পাশাপাশি ল্যাব ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও  বেসরকারি হাসপাতালে রোগী ভর্তি বন্ধ রাখা হয়েছে।

স্পাইনাল কড এর এক্স-রে করতে মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় পাঁচলাইশ থানার অদূরে বেসরকারি পার্কভিউ হসপিটালে আসেন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত কক্সবাজার জেলার বাসিন্দা কলেজছাত্র রুবেল ধর। তার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। 

খেদের সুরে রুবেল ধর বলেন, ‘এক্স-রে করাতে সকাল থেকে চার-পাঁচটি  রোগ নির্ণয়কেন্দ্রে গিয়েছি। চিকিৎসকদের অবস্থান কর্মসূচির কারণে কোথাও এক্স-রে করাতে পারিনি। এটা খুব কষ্টের।’ 

জাহাঙ্গীর হোসেন নামে আরেক যুবক তার মায়ের কিডনি পরীক্ষার জন্য সকাল থেকে এপিক, ইবনে সিনা, সিএসসিআর, শেভরণে রোগ নির্ণয়কেন্দ্রে গিয়ে ব্যর্থ হন। ‘আমাদের কি দোষ, এটা কি মগের মুল্লুক? প্রশ্ন জাহাঙ্গীরের। 

চিকিৎসকদের কর্মবিরতির কারণে রোগীদের ভোগান্তির কথা স্বীকার করে পার্কভিউ হসপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. রেজাউল করিম মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে পাঁচটায় দেশ রুপান্তরকে বলেন, ‘চিকিৎসকদের সামাজিক নিরাপত্তা নেই। দুই চিকিৎসককে রোগীর স্বজনেরা মারধর করলেন। ঘটনায় জড়িতদের তাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত একজন আসামিকেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।’

জানা গেছে, চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগীর সাক্ষাতের সময়সূচি দেওয়া হয় সাধারণত সকালবেলা। কিন্তু মঙ্গলবার অনেকেই স্বশরীরে গিয়েও চিকিৎসকদের সাক্ষাতের তারিখ পাননি অনেক রোগী ও তাদের স্বজনেরা। 

পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সহকারী ব্যবস্থাপক সুজন দে সাংবাদিকদের বলেন, ‘চিকিৎসক নেতাদের নির্দেশনা রয়েছে–মঙ্গলবার ভোর ৬টা থেকে বুধবার ভোর ৬টা পর্যন্ত নতুন রোগী এন্ট্রি করা যাবে না।’ এদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে সব বিভাগের রোগীদের সেবা চালু রয়েছে বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহসান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা সরকারি হাসপাতাল। এখানে সমস্যা নেই।’

বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি ডা. মুজিবুল হক খান বলেন, ‘আমাদের সহকর্মীকে মারধরের ঘটনায় কর্মসূচির ঘোষণা করেছি। বুধবার (২৪ এপ্রিল) সকাল পর্যন্ত আমাদের এ কর্মসূচি চলবে। তবে জরুরি চিকিৎসা সেবা এ কর্মসূচির আওতামুক্ত থাকবে।’ 

প্রসঙ্গত, ১৪ এপ্রিল চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড়ে মেডিকেল সেন্টার হাসপাতালে রোগীর স্বজনেরা রিয়াজ উদ্দিন নামে এক চিকিৎসককে মারধর করেন। এর আগে ১১ এপ্রিল পটিয়ার একটি হাসপাতালে রক্তিম দাশ নামে অপর এক চিকিৎসকের ওপর হামলা হয়। এর প্রতিবাদে চিকিৎসকদের ধারাবাহিক কর্মসূচি চলছে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত