চট্টগ্রামে বেপরোয়া কিশোর গ্যাং, এক মাসে ২ জনকে হত্যা

আপডেট : ১০ মে ২০২৪, ০৭:০৯ পিএম

চট্টগ্রাম নগরে কিশোর গ্যাংয়ের দাপট যেন থামছেই না। এবার তাদের এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে প্রাণ গেল মেহেদী হাসান নামে ১৮ বছর বয়সী নিরীহ এক তরুণের। গতকাল (৯ মে) দিবাগত রাতে ইপিজেড থানার আকমল আলী রোডের পকেট গেট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। 

নিহত মেহেদী স্থানীয় একটি পোশাক কারখানার ক্যান্টিনে বয় হিসেবে কাজ করতো। এর আগে গত ৫ এপ্রিল আকবর শাহ থানাধীন পশ্চিম ফিরোজ শাহ আবাসিক এলাকায় ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের ছোড়া ইটের আঘাতে গুরুতর আহত হন কুরবান আলী নামের এক দন্ত চিকিৎসক। পাঁচদিনের মাথায় নগরের বেসরকারি একটি হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।


 এ নিয়ে গত এক মাসের ব্যবধানে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় এক চিকিৎসকসহ প্রাণ গেল দুজনের। গতকাল রাতে ইপিজেড থানা এলাকায় সংঘটিত দুই গ্রুপের মারামারির মধ্যে পড়ে ছুরিকাঘাতে নিহত তরুণ মেহেদীকে নিরীহ মন্তব্য করেছেন নগর পুলিশের উপকমিশনার (বন্দর) শাকিলা সোলতানা। তিনি বলেন, ‘টার্গেট ছিল আরেকজনকে মারার কিন্তু শিকার হয়ে গেল নিরীহ মেহেদী হাসান।  

স্থানীয় সূত্রের দাবি, গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে মারামারিতে জড়ানো দুই পক্ষের মধ্যে একপক্ষের নিয়ন্ত্রণ করেন ব্যারিস্টার সুলতান আহমেদ ডিগ্রি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইয়াছিন আরাফাত। আরেক পক্ষ নিয়ন্ত্রণ করেন বন্দরটিলার নয়ারহাট এলাকার ছাত্রলীগ  নেতা পরিচয়দানকারী নাঈমুল ইসলাম শুভ। তবে পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে মেহেদী হত্যাকাণ্ডে স্থানীয় কিশোর গ্যাং তথা আলোচ্য দুই ছাত্রলীগ নেতার সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন সিএমপির উপকমিশনার শাকিলা সোলতানা। 

পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান,  ইপিজেড থানাধীন ‘কন্ডা আর্টস মেটারিয়াল’ নামে একটি কারখানায় কাজ করে রমজান ও সাদিকুর রহমান নামে দুই তরুণ। রমজানের কাছে পাওনা এক হাজার টাকা নিয়ে গতকাল (৯ মে) দুজনের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয় রমজান ও সাদিকুরের মধ্যে। এ সময় রিফাত নামে আরেক যুবক (হামলায় আহত) বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেন। রিফাত ছেলেটি রমজানের পক্ষ নিয়েছে বলে সন্দেহ হয় সাদিকুরের। এক পর্যায়ে রিফাতকে দেখে নেয়ার হুমকি দেয় সাদিকুর। এর জের ধরে বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে আকমল আলী রোডের পকেট গেট এলাকায় দুই গ্রুপ মারামারিতে লিপ্ত হয়। মারার পরিকল্পনা ছিল রিফাতকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত শিকার হয়ে যায় নিরীহ মেহেদী হাসান। অবশ্য একই ঘটনায় রিফাতও আহত হয়ে এখন চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। 

স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, রিফাতকে মারার জন্য ছাত্রলীগ নেতা ইয়াছিন আরাফাতের অনুসারী কিশোর গ্যাং ঠিক করে সাদিকুর। অপরদিকে খবর পেয়ে ছাত্রলীগ নেতা নাঈমুর রহমান শুভ’র অনুসারী কিশোর গ্যাং ঠিক করে রিফাত। কারখানা ছুটি শেষে পকেট গেট এলাকায় জড়ো হয়ে মারামারিতে লিপ্ত হয় দুই কিশোর গ্যাং গ্রুপ। 

ইপিজেড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হোছাইন দেশ রূপান্তরকে শুক্রবার বিকেলে জানান, নিহত  মেহেদী হাসান ভোলার লালমোহন থানার গোরিন্দা বাজার এলাকার বাসিন্দা। আহত রিফাত ইপিজেড থানার ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের ২ নম্বর সাইড পাড়ার মালুর বাড়ির মো. মিন্টুর  ছেলে। মেহেদী হত্যার ঘটনায় তার মা রেহেনা বেগম বাদী হয়ে শুক্রবার (১০ মে) বিকেলে ইপিজেড থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এতে সাদিকুর রহমানের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ৭/৮জনকে আসামি করা হয়েছে। বছর খানেক আগে চট্টগ্রাম শহরে এসে ‘মেরি মৌ’ নামের একটি পোশাক কারখানার ক্যান্টিনে বয় হিসেবে কাজ নেয় মেহেদী হাসান। মেহেদী হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তার অভিযান চলছে বলেও জানান ওসি। 

এর আগে গত ৫ এপ্রিল নগরের আকবর শাহ থানার পশ্চিম ফিরোজ শাহ আবাসিক এলাকায় দন্ত চিকিৎসক কুরবান আলীকে ইট দিয়ে আঘাত করা হয়। তার মাদ্রাসা পড়ুয়া ছেলে আলী রেজাকে বাঁচাতে এসে তিনি হামলার শিকার হন। আলী রেজা ওই দিন সন্ধ্যায় সেখানে ইফতারি কিনতে এসেছিল। ওই এলাকায় জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের নির্মাণাধীন একটি ভবন থেকে ১৫-২০ জন কিশোর গ্যাং সদস্য লাঠি-সোটা নিয়ে আলী রেজার ওপর হামলা চালায়। খবর পেয়ে সেখানে যান চিকিৎসক বাবা। এ সময় কিশোর গ্যাংয়ের এক সদস্য কুরবান আলীর মাথায় ইট ছুড়ে মারে। গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১০ এপ্রিল কুরবান আলী মারা যান।

এ ঘটনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্বদাতা গোলাম রসুল নিশানসহ ১২জনকে আসামি করে মামলা করেন নিহত দন্ত চিকিৎসক কুরবান আলীর ছেলে মো. আলী রেজা। মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কুরবান আলী হত্যা মামলায় সম্প্রতি উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন নিশান, রাজুসহ তিনজন। মামলার বাকি ছয় আসামি এখনো অধরা।

 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত