৩৫ শিশু নিখোঁজের তথ্য গুজব নাকি সত্যি

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৪, ০৮:০৮ পিএম

চট্টগ্রামসহ সারা দেশে দুই-তিন দিন ধরে শিশু ‘নিখোঁজের’ তথ্য ভাসছে ফেসবুকে। কয়েকটি পেজ ও ও গ্রুপে শিশু নিখোঁজের স্ট্যাটাস ছড়িয়ে পড়েছে। যাচাই না করে এসব ঘটনাকে সত্য ধরে অনেকেই শেয়ার দিচ্ছেন নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে। এতে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা।

চট্টগ্রামের পুলিশ কর্মকতার্রা বলছেন, ফেসবুকে ‘ভিকটিম’ শিশুর ছবি ও তথ্য-দিয়ে বিভিন্ন গ্রুপ ও ব্যক্তিগত প্রোফাইলে নিখোঁজের স্ট্যাটাস দেওয়া হচ্ছে। বাস্তবে এসব গুজব। যারা হারিয়েছে তার কয়েকঘণ্টা পর বাড়ি ফিরে এসেছে। এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রামে ৪৮ ঘণ্টায় ৩৫ শিশু নিখোঁজের গুজব ছড়ানো নিয়ে সংশ্লিষ্ট কিছু গ্রুপের এডমিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ।

সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আবদুল মান্নান মিয়া রবিবার (৭ জুলাই) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুমের এডমিনরা ভুল স্বীকার করেছেন। মুচলেকা দিয়েছেন। এ বিষয়ে পুলিশ সতর্ক আছে। গুজবে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই।’

স্ক্রিনশট থেকে প্রাপ্ত চারজন অভিভাবকদের মোবাইলে আজ রবিবার (৭ জুলাই) কথা হয় দেশ রূপান্তরের। এর মধ্যে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, ঢাকার শাহজাহানপুর থানা ও লক্ষীপুর এলাকা থেকে ‘নিখোঁজ’ হওয়া চার শিশুর অভিভাবক। তারা জানান, শিক্ষক থেকে ছুটি নিয়ে মাদ্রাসা পড়ুয়া এক শিশু চলে যায় খালার বাড়িতে, আরেক মাদ্রাসা ছাত্র পরিবারকে না জানিয়ে চলে যায় ফুফুর বাড়িতে। পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া এক শিশু বন্ধুর সঙ্গে ট্রেনে চড়ে চলে যায় কিশোরগঞ্জে, সপ্তম শ্রেণির আরেক ছাত্র বন্ধুকে নিয়ে ঘুরতে চলে যায় কক্সবাজারে। তাদের কেউ কেউ সকালে ‘নিখোঁজ’ হয়ে সন্ধ্যায়, আবার কাউকে পরিবার উদ্ধার করেছে দুই বা তিনদির পর। এসব ঘটনায় ‘ভিকটিমের’ বাবা-মা নিজেরাই ফেসবুকে ছেলে ‘নিখোঁজের’ স্ট্যাটাস দিয়েছেন। অবশ্য কয়েকঘণ্টা পর ‘নিখোঁজ’ ছেলে ফিরে আসায় ফেসবুকের স্ট্যাটাস ডিলিট করে দেন।

চট্টগ্রাম নগর ও জেলা পুলিশের অন্যতম শীর্ষ কর্মকতার্দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে নগরের আকবর শাহ, পাঁচলাইশ ও হালিশহর থানা এলাকায় তিনটি নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। তবে ভিকটিম শিশু নয়, তরুণ ও প্রাপ্ত বয়স্ক। এর মধ্যে একজন ঋণের, অন্যজন প্রেমঘটিত এবং বাকি একজন অভিমান করে বাড়ি ছাড়েন। নিখোঁজ ওই তিনজনের মধ্যে দশম শ্রেণির এক ছাত্রকে আজ (৭ জুলাই) উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিএমপির এক কর্মকর্তা।

গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে জেলার ১৬ থানা এলাকায় বিশেষ করে সাতকানিয়া থেকে তিনজন শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় জিডি করেছেন অভিভাবকেরা। এর মধ্যে দুই শিশুকে উদ্ধার করা গেলে একজনকে এখনো উদ্ধার করা যায়নি বলে রবিবার বিকালে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন।    

ঢাকা-চট্টগ্রামে ৩৫ শিশু নিখোঁজ’ এর ঘটনা ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার বিষয়টি গুজব বলে মন্তব্য করে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আবদুল মান্নান মিয়া বলেন, ‘ফেসবুকে শিশু নিখোঁজের গুজব ছড়ানো হচ্ছে। আতঙ্ক সৃষ্টি উদ্দেশ্যেই এটা করা হচ্ছে। গুজব ছড়ানোর অভিযোগে তিনটি গ্রুপের এডমিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তারা ভুল স্বীকার করেছেন। ক্ষমা চেয়ে মুচলেকা দিয়েছেন। তবে এখনকার শিশুরা অনেক আবেগপ্রবণ ও স্বাধীনচেতা। অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলি তারা যেন শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে।’

ফেসবুকে শিশু নিখোঁজের খবর ভাইরাল হওয়ার বিষয়টি নিয়ে সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে বলে মন্তব্য করে চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন  বলেন, ‘শিশু নিখোঁজের তিনটি ঘটনায় পেশাদার কোনো অপরাধ চক্র জড়িত থাকার আলামত পাওয়া যায়নি। সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য ফেসবুকে গুজব চালানো হচ্ছে। এসবের বিরুদ্ধে পুলিশের সতর্ক দৃষ্টি আছে।’    

জানা গেছে, গত বুধবার (৪ জুলাই) সকাল ১১টার দিকে সাতকানিয়া উপজেলার একটি মাদ্রাসা ছাত্র মো. আবু সুফিয়ান (১১) বাড়ি যাওয়ার কথা বলে শিক্ষক থেকে ছুটি  নিয়ে চলে যায় বান্দরবান জেলার শুহলক এলাকায় খালার বাড়িতে। একই দিন সন্ধ্যায় বান্দরবান জেলার শুহলক এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে আসেন বাবা অটোরিকশা চালক  মো. মিজান। আলিফের গ্রামের বাড়ি সাতকানিয়া উপজেলার কেওচিয়া মাইজপাড়ায়। সে স্থানীয় ওবায়েদিয়া মাদ্রাসার তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।  ৩ জুলাই সকালে ‘নিখোঁজ’ হয় আরেক সাতকানিয়ার মাদ্রাসা ছাত্র রোবায়েদ হোসেন সায়েম (৮)। ৪ জুলাই সকালে তার খোঁজ পাওয়া যায় একই উপজেলার পদুয়ায় ফুফুর বাড়িতে। সায়েমের বাড়ি উপজেলার ছদাহা ইউনিয়নের রোয়াজির পাড়া।

লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ থানপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সিয়াম। তার বাবার নাম হারুনুর রশীদ। গত ২ জুলাই সকালে পরিবারকে না জানিয়ে এক বন্ধুর সাথে ঘুরতে সে চলে যায় কক্সবাজারে। সেখানে যাওয়ার পর ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে তারা। টাকা-পয়সা হারিয়ে কাঁদতে থাকে সিয়াম। এক নারী জিজ্ঞেস করলে তাকে ঘটনা খুলে বলে সিয়াম। ওই নারী তার বাবাকে মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানান। পরে তার বাবা হারুনুর রশিদ কক্সবাজার গিয়ে ছেলে ও তার বন্ধুকে বাড়ি নিয়ে আসেন। গত ৩ জুলাই বন্ধুর সঙ্গে ট্রেনে করে কিশোরগঞ্জ চলে যায় ঢাকার মতিঝিল কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র আলিফ। চারদিন পর ৭ জুলাই তাকে কিশোরগঞ্জ থেকে উদ্ধার করে পরিবার। এর আগে এ ঘটনায় থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেন তার মা সাবিনা আক্তার। আলিফ পরিবারের সঙ্গে থাকে ঢাকার শাহজাহানপুর থানার বারাকা হাসপাতাল এলাকার বাড়িতে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত