ঢাকা মহানগর উত্তর এবং দক্ষিণ বিএনপিসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ চার মহানগরে আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেছে বিএনপি। ব্যর্থতার কারণে বিলুপ্ত করা কমিটিগুলোর নতুন নেতৃত্বে পুরনোদের রাখা হয়েছে। প্রায় ২৩ দিন পর ঘোষিত এ কমিটি নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। ঢাকা মহানগরের কমিটি নিয়ে উচ্ছ্বাস থাকলেও বরিশাল মহানগর বিএনপির কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীরা অধিকাংশই ক্ষুব্ধ। আর চট্টগ্রাম মহানগরেও একপেশে কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ।
গতকাল রবিবার দুপুরে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কমিটি ঘোষণা করা হয়। নবগঠিত চার আহ্বায়ক কমিটিকে তিন মাসের মধ্যে নতুন কমিটি গঠনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার কথা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর উত্তরে জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নিরব ও সদস্য সচিব হিসেবে দলের ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সদস্য সচিব আমিনুল হককে বেছে নিয়েছে হাইকমান্ড। দক্ষিণের আহ্বায়ক কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয়েছে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনুকে। সদস্য সচিব করা হয়েছে সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক তানভীর আহমেদ রবিনকে। বরিশাল মহানগরে তিন সদস্যের আহ্বায়ক কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয়েছে মনিরুজ্জামান খান ফারুককে। তিনি সাবেক কমিটিরও আহ্বায়ক ছিলেন। সদস্য সচিব করা হয়েছে জিয়াউদ্দিন সিকদার জিয়াকে। তিনি সাবেক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। এ ছাড়া সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে আফরোজা খানম নাসরিনকে। তিনিও আগের কমিটির সদস্য ছিলেন। চট্টগ্রাম মহানগরে দুই সদস্যের আহ্বায়ক কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয়েছে বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহকে এবং সদস্য সচিব করা হয়েছে নাজিমুর রহমানকে।
গত ১৪ জুন ঢাকা দক্ষিণের আহ্বায়ক আবদুস সালাম ও সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনু, চট্টগ্রাম মহানগরের আহ্বায়ক ডা. সাহাদাত হোসেন ও সদস্য সচিব আবুল হাশেম বক্কর এবং বরিশাল মহানগরের আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ও সদস্য সচিব মীর জাহিদুল কবিরের নেতৃত্বাধীন আহ্বায়ক কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়।
জানা গেছে, পদপ্রত্যাশী নেতারা দৌড়ঝাঁপ করলেও এবার খুব বেশি কাজে লাগেনি। বিগত যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার অপেক্ষাকৃত তরুণদের দিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, শীর্ষ নেতাদের অধিকাংশ চেয়েছিলেন ঢাকা মহানগর কমিটিতে সিনিয়র-জুনিয়র সমন্বয় করে কমিটি দেওয়া হোক। ঘোষিত কমিটিতে তার প্রতিফলন না হওয়ায় ক্ষুব্ধ তারা। এর আগে অবিভক্ত ঢাকা মহানগরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মির্জা গোলাম হাফিজ, লে. জে. (অব.) মীর শওকত আলী, সাদেক হোসেন খোকা, মির্জা আব্বাসের মতো হেভিওয়েট নেতারা দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই তুলনায় এবারের কমিটি অনেকটা তারুণ্যনির্ভর ও জুনিয়র নেতাদের সমন্বয়ে করা হয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির প্রস্তাবিত কমিটির আলোচনায় আমিনুল হক আহ্বায়ক এবং যুবদলের সাবেক সহসভাপতি এসএম জাহাঙ্গীর সদস্য সচিব ছিলেন। তবে যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নিরব কারামুক্তির পর কমিটিতে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করেন। আর ছিটকে পড়েন জাহাঙ্গীর। নিরব যুবদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক থেকে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দীর্ঘ ১৫ বছরে কখনো রাজপথের আন্দোলনে মাঠে পাওয়া যায়নি। যুবদলের সভাপতি হিসেবে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনকালে একেবারে শেষ মুহূর্তে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেন। এসব কারণে নিরবের এই পদ পাওয়ায় অনেকেই ক্ষুব্ধ। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে আমিনুল হক দায়িত্ব পালনকালে দ্রুত সময়ের মধ্যে কমিটি গঠনে তৎপর ছিলেন। কোনো অনিয়ম কিংবা কমিটি বাণিজ্যের অভিযোগ না ওঠায় তার প্রতি আস্থা রেখেছেন হাইকমান্ড।
সাইফুল আলম নিরব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দল তার ওপর যে গুরু দায়িত্ব অর্পণ করেছে, তার মর্যাদা রক্ষায় তিনিসহ মহানগরের প্রত্যেক নেতাকর্মী ও সমর্থক সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করবেন।’
এদিকে মজনু ও রবিনের সর্বশেষ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকায় দক্ষিণ মহানগর কমিটির নেতৃত্ব নিয়ে তেমন অভিযোগ করতে দেখা যায়নি নেতাদের।
তানভীর আহমেদ রবিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ঢাকা মহানগরের তার বাবার ওপর আস্থা রেখেছিলেন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এবার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার ওপর যে গুরু দায়িত্ব দিয়েছেন, সেটি তিনি পালনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।’
এদিকে চট্টগ্রামে বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকাকে প্রাধান্য দিয়ে মূল্যায়ন করার কথা বলা হলেও নবগঠিত কমিটির দুজনই ছিলেন মাঠের বাইরে। সহসাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মীর হেলাল পক্ষে ও বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীমের বিপক্ষে এ কমিটি হয়েছে বলে দলের ভেতরেই আলোচনা রয়েছে।
আর বরিশালের কমিটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অধিকাংশ নেতাকর্মীর অভিযোগ, সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরীনের অনুগতদের দিয়ে ঘোষিত এ কমিটি একতরফা হয়েছে। সিনিয়র-জুনিয়র সমন্বয় হলেও মহানগরের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা রাজনীতি ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, কমিটির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক সাংগঠনিকভাবে খুব দক্ষ হিসেবে পরিচিত নন। জিয়াউদ্দিন সিকদার জিয়া গত আন্দোলনে যেমন ভালো ভূমিকা রেখেছেন, তেমনি সাংগঠনিকভাবেও অভিজ্ঞ। তবে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিনকে নিয়েই সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা। তার মতো একজন কনিষ্ঠ নেতার নিচে মহানগর বিএনপির অন্যান্য প্রভাবশালী নেতার পদায়ন কীভাবে হবে, এটা ঘিরেই আপত্তি তাদের।
