মাঙ্কিপক্স নতুন রোগ নয়

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৩:২৭ এএম

মাঙ্কিপক্স কিন্তু নতুন কোনো রোগ নয়।রোগটি প্রথমে বানরের মধ্যে দেখা দিয়েছিল বলে এর নাম মাঙ্কিপক্স। বানর, ইঁদুর, কাঠবিড়ালি, বন্য কুকুর ও খরগোশ ইত্যাদি প্রাণী থেকেও মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে এই ভাইরাস। এটি এক ধরনের জুনোটিক ডিজিজ, মানে প্রাণী থেকে মানুষে ছড়ায়। সাধারণত গৃহপালিত প্রাণী যেমন গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, হাঁস, মুরগি থেকে এ রোগ ছড়ায় না।

কীভাবে ছড়ায় : মাঙ্কিপক্সে আক্রান্ত প্রাণী বা ব্যক্তির সরাসরি সংস্পর্শে এলে, শ্বাস-প্রশ্বাস থেকে একে অপরকে সংক্রমিত করে। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি, থুতু কিংবা দীর্ঘক্ষণ মুখোমুখি আলাপচারিতার ফলেও মাঙ্কিপক্স ছড়াতে পারে। শরীরে থাকা ক্ষত বা ফোসকার সংস্পর্শে এলে এ রোগ সুস্থ দেহে ছড়িয়ে পরে। আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে যৌন সম্পর্ক এ রোগ ছড়ানোর অন্যতম কারণ। সমকামীদের এই রোগে আক্রান্তের ঝুঁকি বেশি। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত দ্রব্যাদি যেমন পোশাক, বিছানা, তোয়ালে ইত্যাদির সংস্পর্শে এলেও বিস্তার লাভ করতে পারে।

উপসর্গ : উপসর্গ অনেকটা ফ্লুর মতো, ভাইরাসটি বায়ুবাহিত এবং প্রায় চার দিন বাতাসে টিকে থাকতে পারে। মাঙ্কিপক্সে আক্রান্ত হওয়ার ৬ থেকে ১৩ দিনের মধ্যে, ক্ষেত্রবিশেষে ৫ থেকে ২১ দিনের মধ্যে প্রথম লক্ষণ প্রকাশ পায়। যেকোনো ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারে, তবে ৯০% রোগী ১৫ বছরের কম।

মাঙ্কিপক্সের উপসর্গ মৃদু। শুরুতে জ¦র, মাথাব্যথা, কাশি, হাঁচি শরীরব্যথা, ক্লান্তি, অবসাদ ইত্যাদি দেখা দেয়। ফুলে যেতে পারে লসিকা গ্রন্থি। এক থেকে তিন দিনের মধ্যে গায়ে বসন্তের মতো ফুসকুড়ি ওঠে। মুখে শুরু হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে হাতের ও পায়ের তলায় বসন্তের মতোই প্রথমে লাল, তারপর ভেতরে জলপূর্ণ দানা, শেষে শুকিয়ে পড়ে যেতে থাকে। মাঙ্কিপক্স ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে যৌনাঙ্গ এবং পায়ুপথের আশপাশে ফুসকুড়ি সবচেয়ে বেশি দেখা দেয়। এই ফুসকুড়িগুলো পরে ফোসকায় পরিণত হয়, শুকিয়ে খোসপাঁচড়ার মতো এবং প্রচন্ড পরিমাণে চুলকানি ও ব্যথা হয়। দুই থেকে চার সপ্তাহ স্থায়ী হয় এই রোগ। নিজেই সেরে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা হয় না। যদিও এ রোগের উপসর্গগুলো সাধারণত মৃদু আকারে প্রকাশ পায়, ক্ষেত্রবিশেষে শিশু, গর্ভবতী বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের জন্য মারাত্মক হতে পারে।

জটিলতা : স্থায়ী ক্ষত, বিকৃত দাগ, ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে যেমন ফুসফুস, ব্রেন ও চোখে ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়তে পারে। চোখের কর্নিয়ায় ইনফেকশন ছড়ালে রোগী দৃষ্টিশক্তিও হারিয়ে ফেলতে পারে।

শনাক্ত : মাঙ্কিপক্স শনাক্তের ক্ষেত্রে পিসিআর পরীক্ষাই নির্ভরযোগ্য। এ ক্ষেত্রে ত্বকের ক্ষত স্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। বায়োপসির মাধ্যমেও এ রোগটি নির্ণয় করা সম্ভব।

চিকিৎসা : মাঙ্কিপক্স ভাইরাসজনিত রোগ বলে আপনা থেকেই সেরে যায়, তেমন চিকিৎসার দরকার হয় না। উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা যেমন জ¦র বা শরীর ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল, পুষ্টিকর খাবার ও পানি গ্রহণ, বিশ্রাম ইত্যাদিই হলো চিকিৎসা। অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসার কোনো নির্দেশনা নেই। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণের দরকার নেই। আক্রান্ত রোগীকে প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি এবং ক্ষত না শুকানো পর্যন্ত আলাদা রাখা।

প্রতিরোধ মাঙ্কিপক্সের উপসর্গ রয়েছে যেমন জ্বর, কাশি, শরীর ব্যথা বা ফুসকুড়ি আছে এমন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলা এবং শারীরিক সংস্পর্শ পরিহার করা। ত্বকের ফোসকা ভালো না হওয়া পর্যন্ত আলাদা রাখতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তি এবং সেবা প্রদানকারী উভয়ে মাস্ক ব্যবহার করা। সাবান বা অ্যালকোহল সম্পন্ন হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করা। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলা। যেখানে সেখানে থুতু না ফেলা ইত্যাদি। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিস সাবান, জীবাণুনাশক ডিটারজেন্ট দিয়ে জীবাণুমুক্ত করা। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত দ্রব্যাদি যেমন তোয়ালে, রুমাল, বালিশ, চাদর ইত্যাদির সংস্পর্শ থেকে বিরত থাকা। আক্রান্ত বন্যপ্রাণী অথবা ইঁদুর, কাঠবিড়ালি, খরগোশ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকা। প্রাণীর কামড়, আঁচড়, লালা বা প্রস্রাবের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকা। অসুস্থ অবস্থায় সংক্রমিত দেশে ভ্রমণ না করা। সংক্রমিত কোনো দেশে ২১ দিনের মধ্যে ভ্রমণ করলে চিকিৎসা নিতে হবে।

টিকা :  অনুমোদিত না হলেও জরুরি ব্যবহারের জন্য মাঙ্কিপক্সের টিকা দেওয়ার জন্য ওষুধ প্রস্তুতকারকদের নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

দরকার সচেতনতা : জরুরি প্রয়োজন ছাড়া যেসব দেশে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি সে দেশে ভ্রমণ না করা। তবে ব্যক্তিগত সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতাই এই রোগ প্রতিরোধে  সহায়ক। আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনতা বেশি জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত