নবীজির প্রতি সাহাবিদের আনুগত্য

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২৪, ০১:৫২ এএম

সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকে যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল দুনিয়াতে আগমন করে তাওহিদ ও রিসালাতের দাওয়াত দিয়েছেন। মানুষকে অন্ধকারাচ্ছন্ন জাহেলি সমাজ ব্যবস্থা থেকে মুক্ত করে সত্য-সঠিক ও ন্যায়-ইনসাফের আলোকিত জীবন ব্যবস্থার পথে আহ্বান করেছেন। এই আহ্বানে যারা সারা দিয়েছে তারা দুনিয়াতে সফল মানুষে পরিণত হয়েছে।

হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সর্বশেষ নবী ও রাসুল। তিনি নবুওয়াত লাভের পর মানুষের মাঝে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। যারা তার দাওয়াত কবুল করে ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন তারা পৃথিবীতে সৌভাগ্যশালী মানুষে পরিণত হয়েছেন এবং সর্বশেষ নবী ও রাসুলের সাহাবি হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। সাহাবিরা ছিলেন রাসুল (সা.)-এর প্রতি খুবই আনুগত্যশীল। রাসুল (সা.) তাদের যখন যে বিষয়ে আদেশ-নিষেধ করেছেন সঙ্গে সঙ্গে তারা সে বিষয়ে আনুগত্য প্রকাশ করেছেন। তারা অনুসরণ করেছে নবীজির প্রতিটি কথার, প্রতিটি কাজের এবং প্রতিটি আদেশ-নিষেধের। নবীজির আনুগত্য প্রকাশে বিন্দুমাত্রও কমতি করেননি তারা। এক্ষেত্রে গোটা উম্মতের ইতিহাসে তাদের অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। নবীজির আনুগত্য-অনুকরণের যে দৃষ্টান্ত তারা স্থাপন করেছেন তার নজির খুঁজে পাওয়া দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল। নবীজির প্রতিটি কথা, আদেশ-নিষেধ, আকিদা-বিশ্বাস, ইবাদত-বন্দেগি, লেনদেন, চলাফেরা, স্বভাব-চরিত্র, আচার-ব্যবহারসহ সর্বক্ষেত্রে তাকে আদর্শরূপে ধারণ করেছিলেন। ফলে তাদের জীবন হয়ে উঠে নববী-আদর্শের জীবন্ত ছবি। নবীজির পরিপূর্ণ ও একনিষ্ঠ আনুগত্যই গোটা উম্মতের মধ্যে তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্মে পরিণত করে। নবীজি (সা.) ছিলেন উম্মতের জন্য নমুনা। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘বস্তুত রাসুলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ এমন ব্যক্তির জন্য, যে আল্লাহ ও আখেরাত দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে।’ (সুরা আহজাব ২১)

রাসুল (সা.)-এর আদেশ-নিষেধের আনুগত্য ও অনুকরণ করা মুমিনের ইমানি কর্তব্য ও দায়িত্ব। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘রাসুল তোমাদের যা দেয়, তা তোমরা গ্রহণ করো এবং যা থেকে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত থাকো। তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর।’ (সুরা হাশর ৭)

কোরআনে আরও বর্ণিত হয়েছে, ‘আল্লাহ ও তার রাসুল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য সে ব্যাপারে তাদের নিজেদের কোনো রকম (ভিন্ন সিদ্ধান্তের) ইচ্ছা থাকবে না। আর যে আল্লাহ ও তার রাসুলের নাফরমানি করল, সে নিঃসন্দেহে সুস্পষ্টভাবে গোমরাহ (পথভ্রষ্ট) হলো।’ (সুরা আহজাব ৩৬) সাহাবায়ে কেরাম রাসুল (সা.)-এর প্রতি কেমন আনুগত্য করেছেন, সে বিষয়ে হাদিসের কিছু দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা হলো।

এক. আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, ওমর (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের বাপ-দাদার নামে কসম করতে নিষেধ করেছেন। ওমর (রা.) বলেন, আল্লাহর কসম! যখন থেকে আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এ কথা বলতে শুনেছি, তখন থেকে আমি তাদের নামে কসম করিনি। মনে থাকা অবস্থাতেও না, অন্যের কথা উদ্ধৃত করেও না।’ (সহিহ বুখারি ৬৭৪৪)

দুই. আয়েশা (রা.) বলেন, আল্লাহতায়ালা প্রাথমিক যুগের মুহাজির নারীদের ওপর অনুগ্রহ করুন, যখন আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করলেন, ‘তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন ওড়না দ্বারা আবৃত করে’, তখন তারা (বিলম্ব না করেই গায়ে থাকা) তাদের চাদর ছিঁড়ে তা দিয়ে ওড়না তৈরি করে নেন। (সহিহ বুখারি ৪৭৫৮)

তিন. খায়বারের যুদ্ধের ঘটনা। রাসুল (সা.) সাহাবিদের নিয়ে যুদ্ধে ছিলেন। একজন এসে জানাল, মানুষ গাধার গোশত খাচ্ছে। তিনি একজনকে এই ঘোষণা করতে বললেন, আল্লাহ ও তার রাসুল তোমাদের গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন। তোমরা তা খেয়ো না, ফেলে দাও। তা অপবিত্র। এ ঘোষণা শুনে গোশতের পাত্র উপুড় করে দেওয়া হলো। অথচ তাতে গোশত টগবগ করছিল। (সহিহ বুখারিন ৪১৯৯)

চার. মুজাহিদ (রহ.) বলেন, ‘আমি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-এর সঙ্গে এক সফরে ছিলাম। তিনি একটি স্থান অতিক্রম করার সময় সেখানে পার্শ্ব পরিবর্তন করলেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি এমন করলেন কেন? তিনি বললেন, আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে এমনটি করতে দেখেছি।’ (মুসনাদে আহমদ ৪৮৭০)

পাঁচ. হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘একবার আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বকরি জবাই করলেন। এরপর পরিবারের লোকদের জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কি আমার ইহুদি প্রতিবেশীকে হাদিয়া দিয়েছ? আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, জিবরাইল প্রতিবেশী সম্পর্কে আমাকে এমন তাগিদ দিয়েছেন যে, আমার মনে হয়েছে, প্রতিবেশীকে ওয়ারিশ বানিয়ে দেবেন।’ (সুনানে আবু দাউদ ৫১৫২)

ছয়. রাসুল (সা.)-এর একজন স্ত্রী হলেন উম্মে সালামা (রা.)। তার আগের স্বামী ছিলেন আবু সালামা (রা.)। আবু সালামা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর রাসুল (সা.) তাকে বিয়ে করেন। তার আগের স্বামীর ঔরসজাত একজন সন্তান হলো ওমর ইবনে আবু সালামা (রা.)। তার প্রতিপালন করতেন রাসুল (সা.)। একবার খাওয়ার সময় ওমর ইবনে আবু সালামা (রা.) পাত্রের এখান থেকে ওখান থেকে খাচ্ছিলেন। রাসুল (সা.) বললেন, হে বাছা! খাওয়ার সময় বিসমিল্লাহ বলবে। ডান হাতে খাবে এবং নিজের দিক থেকে খাবে। ওমর ইবনে আবু সালামা (রা.) বলেন, এরপর থেকে আমি সর্বদা এভাবেই খেতাম। (সহিহ বুখারি ৫৩৭৬)

সাত. একবার রাসুল (সা.) সোনার আংটি বানালেন। তখন সাহাবিরাও সোনার আংটি বানালেন। পরে রাসুল (সা.) তা খুলে ফেললেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম! আমি আর কখনো তা পরিধান করব না। তখন সাহাবিরাও খুলে ফেললেন। (সহিহ বুখারি ৭২৯৮)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত