বিভক্ত নেতারা, বাড়ছে বিরোধ

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২৪, ০২:২৮ এএম

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বিএনপির দলীয় কোন্দল। এ কোন্দল ছড়িয়ে পড়েছে থানা থেকে ওয়ার্ড পর্যায়ে। দলটির রাজনীতি বিভক্ত হয়ে পড়েছে দুটি ভাগে। কেন্দ্র ঘোষিত দলীয় কর্মসূচিও তারা পালন করছে আলাদাভাবে। দলীয় নেতাকর্মীদের বিভক্তি আর রেষারেষি এমন পর্যায়ে নেমেছে যে, একপক্ষ আরেক পক্ষের ওপর হামলা, মামলা করছে। ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বেও করা হচ্ছে বহিষ্কার। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিদ্ধিরগঞ্জ বিএনপির এক পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা বিএনপির সভাপতি গিয়াস উদ্দিন। অন্য পক্ষের নেতৃত্বে আছেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যাপক মামুন মাহমুদ। শীর্ষস্থানীয় এ দুই নেতার দ্বন্দ্বে পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে। তাদের দ্বন্দ্বের খেসারত দিতে হচ্ছে তৃণমূল নেতাকর্মীদের। তারা দুজনই সিদ্ধিরগঞ্জের বাসিন্দা। ফলে তাদের বিরোধের প্রভাব সিদ্ধিরগঞ্জে প্রকট।

দলীয় একটি সূত্র জানায়, গত ৫ অগস্টের পর থেকে সিদ্ধিরগঞ্জে ব্যাপক দখলবাণিজ্য ও চাঁদাবাজি শুরু করেছে জেলা বিএনপির সভাপতি গিয়াস উদ্দিনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বিএনপি নেতাকর্মীরা। আদমজী ইপিজেটসহ বিভিন্ন পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাত দখল নিয়ে গিয়াস উদ্দিন বলয়ের দুপক্ষের মধ্যেই একাধিকবার মারামারি, ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়ার ঘটনা ঘটছে। রসুলবাগ এলাকায় আনমন প্যাকেজিং কারখানার মালামাল নেওয়াকে কেন্দ্র করে গত ১ নভেম্বর রাতে থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আকবর হোসেনসহ চারজনকে কুপিয়ে আহত করেছে নিজ গ্রুপের নেতাকর্মীরা। সাইনবোর্ডে পরিবহন টিকিট কাউন্টার দখল নিয়ে ৩০ অক্টোবর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেনের ভগ্নিপতি ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোক্তার হোসেন ও থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আকবর হোসেনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, ফুটপাত চাঁদাবাজি ও সরকারি খাল দখল নিয়ে গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে কদমতলী এলাকায় ছাত্রদলের রাকিবুর রহমান সাগর ও বিএনপির শামীম ঢালির মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। তারা দুপক্ষই গিয়াস উদ্দিন বলয়ের। তাদের এসব কর্মকা- দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সভাপতি মো. মাজেদুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন গিয়াস উদ্দিনের ঘনিষ্ঠজন হওয়ায় তারা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার অপচেষ্টা করছে। গিয়াস উদ্দিনের মদদে যারা অপকর্ম করছে তাদের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা না নিয়ে মামুন মাহমুদ বলয়ের কাউকে বহিষ্কার, কাউকে হত্যা মামলার আসামি করছেন তারা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রুবেল নিহতের ঘটনায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় করা হত্যা মামলায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আক্তার হোসেন টুটুল, রেদোওয়ান হোসেন পাপ্পু ও ছাত্রদল নেতা স্বপন মোল্লাকে আসামি করেছে গিয়াস উদ্দিনের লোকজন। এর প্রতিবাদে গত ২৮ অগস্ট স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন।  

সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সদস্য অকিল উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, ‘দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে চাঁদাবাজি আর দখল বাণিজ্য করছে গিয়াস উদ্দিনের লোকজন। অথচ দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করার অভিযোগে গিয়াস উদ্দিনের পকেট কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বহিষ্কার করছে মামুন মাহমুদের সমর্থকদের। বিয়ষটি খুবই দুঃখজনক।’ 

এ বিষয়ে জেলা বিএনপির সভাপতি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। তার মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে দখলবাণিজ্য ও চাঁদাবাজিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না মন্তব্য করে গিয়াস উদ্দিনের ঘনিষ্ঠজন সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন বলেন, ‘কে কার বলয়ে সেটা বড় কথা নয়। আমরা সবাই বিএনপি করি। বিএনপির বদনাম হবে এমন কাজ যেই করবে, তার বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’       

জানতে চাইলে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যাপক মামুন মাহমুদ বলেন, ‘সিদ্ধিরগঞ্জ বিএনপিতে কোন কোন্দল নেই। সুবিধাবাদী একটি মহল পরিকল্পিতভাবে কোন্দল সৃষ্টি করে ফায়দা হাসিল করার চেষ্টা করছে। এক গডফাদারের পরিবর্তে সিদ্ধিরগঞ্জে আমরা আরেক গডফাদার জন্ম হতে দেব না। বিগত ১৫ বছর গর্তে লুকিয়ে থাকা সুবিধাবাদীরা ৫ আগস্টের পর থেকে চাঁদাবাজি ও দখলবাণিজ্য শুরু করেছে। দলীয় স্বার্থে এসব চলতে দেওয়া যায় না।’

নিজের সমর্থকদের বহিষ্কার কারার বিষয়ে মামুন মাহমুদ বলেন, ‘বিএনপির গঠনতন্ত্রে কাউকে বহিষ্কার করার এখতিয়ার একমাত্র দলের চেয়ারম্যানের রয়েছে। অন্য কেউ দলের কোনো নেকাকর্মীকে বহিষ্কার করতে পারে না। এটি গঠনতন্ত্রের ৫ ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।’ আন্দোলনে নিহতের ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মীদের হত্যা মামলার আসামি করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা যারা করেছে তারা নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য করেছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত