চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় শঙ্খ নদের বিভিন্ন স্থানে গত ১৬ বছর ধরে আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় থাকা প্রভাবশালীরা বালু তুলেছেন। সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ‘বালুর বাণিজ্য’ চলে গেছে বিএনপির প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে। তারা এখন মিলেমিশে অবৈধ বালু বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দীর্ঘদিনের এই বালু-দস্যুতার হাতবদল হয়েছে।
বালুমহালগুলো দখল নেওয়া নতুন প্রভাবশালীরা এবং তাদের ছত্রছায়ায় থাকা লোকজন সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অবৈধভাবে বালু তুলছেন। যদিও উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, আনোয়ারায় সরকার অনুমোদিত কোনো বালুমহাল নেই।
স্থানীয়দের তথ্য মতে, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ১৫টি অবৈধ বালুমহাল রয়েছে। এর মধ্যে হাইলধর ইউনিয়নে সাতটি, পরৈকোড়া ইউনিয়নে একটি, বারখাইন ইউনিয়নে দুটি, বরুমচড়া ইউনিয়নে তিনটি, জুঁইদ-ী ইউনিয়নে একটি ও রায়পুর ইউনিয়নে একটি।
খুরুস্কুল গোদারপাড় পয়েন্টে বিএনপি নেতা জসিম উদ্দিন ও খুরুস্কুল ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি, ইউপি সদস্য আবদুল গফুর, বরুমচড়া ভরাশঙ্খ খাল পয়েন্টে বিএনপিকর্মী মো. আবছার ও কানু মাঝির হাট পয়েন্টে বিএনপিকর্মী নুরুল আবছার অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের নেতৃত্ব নিয়েছেন। এ ছাড়া অন্যান্য বালুমহালগুলো স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ম্যানেজ করে ব্যবসা করছেন আগের দখলে থাকা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালীরা।
তবে বিএনপি নেতা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বালুমহালের জায়গাটি আমাদের। আগে আওয়ামী লীগের লোকজন ওই জায়গায় ব্যবসা করতেন। সরকার পরিবর্তনের পর জায়গাটি আমরা নিয়ে নিয়েছি। বালু ব্যবসার সঙ্গে আমি জড়িত নই।’
সম্প্রতি উপজেলার বরুমচড়া এলাকায় দেখা যায়, ভরাশঙ্খ খালে ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেশের প্রথম হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যামের পাশেই ফাঁকা জায়গায় স্তূপ করে রাখা হয়েছে বালু। সেখান থেকে বালু বিক্রি করে ডাম্প ট্রাকে করে পাঠানো হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। ২০২০ সালে নির্মিত এই এলিভেটর ড্যামের আশপাশের এলাকা পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। কিন্তু বালু-দস্যুতার কারণে ওই এলাকার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। একই চিত্র অন্য বালু মহালগুলোয়ও।
হাইলধর গ্রামের বাসিন্দা আবু তালেব, সেলিম উদ্দিন, আবুল কালামসহ বেশ কয়েকজন বলেন, ‘দিন-রাত ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করে নদের পাড়ে স্তূপ করে রাখা হয়। এসব বালু প্রকাশ্যে বিক্রি করছে কয়েকটি সিন্ডিকেট।’
এ কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শঙ্খ নদ থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু তুলে বিভিন্ন পয়েন্টে আনছেন তারা।
এ বিষয়ে বালু ব্যবসায়ী মো. আবছার বলেন, ‘সবাই যেভাবে ব্যবসা করছে, আমিও সেভাবে ম্যানেজ করে ব্যবসা করছি। আনোয়ারায় তো সরকার অনুমোদিত কোনো বালুমহাল নেই।’ অভিযুক্ত বিএনপিকর্মী নুরুল আবছার বলেন, ‘বর্তমানে আমি বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত নই।’
খুরুস্কুল ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউপি সদস্য বালু ব্যবসায়ী আবদুল গফুর বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে বালুর ব্যবসা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। বিএনপির লোকজন নিয়ে ফেলছে। আমাদের শেয়ারে রেখেছে, ঠিকই কখন ব্যবসা নিয়ে ফেলে তাও বলা যায় না।’
দলীয় পরিচয়ে অবৈধ ব্যবসার সুযোগ নেই জানিয়ে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দীন বলেন, ‘বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যেকোনো অবৈধ কর্মকা-ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেছেন। দলীয় প্রভাব খাটিয়ে দস্যুতা করার সুযোগ নেই। অবৈধ কাজের তথ্য-প্রমাণ থাকলে দ্বিধাহীন চিত্তে সংবাদ প্রকাশ করুন। প্রশাসন ব্যবস্থা নিক।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে বৈধভাবেও বালু তোলার কোনো সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
