আরব বসন্তের পর ২০১১ সালেই সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ বিরোধী বিক্ষোভ জোরালো হয়েছিল। সে সময় বিষয়টি আলোচনার ভিত্তিতে তা সমাধান না করে তীব্র দমন ও নিপীড়নের পথ বেছে নিয়ে দেশটিকে ঠেলে দিয়েছিলেন ১৩ বছরের তীব্র গৃহযুদ্ধের মধ্যে। এই সময়ে দেশটিতে নিহত হয়েছে প্রায় ছয় লাখ মানুষ। দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় কোটির বেশি নাগরিক। ওই যুদ্ধটা সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাতে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক নানা পরাশক্তি ও প্রক্সি গোষ্ঠী।
অবশ্য গত ৮ ডিসেম্বর থেকে দেশটিতে শুরু হয়েছে নতুন অধ্যায়। বিদ্রোহীদের মাত্র দুই সপ্তাহের কম ব্যবধানে চালানো ঝটিকা অভিযানে পতন ঘটেছে বাশার আল আসাদের দীর্ঘ ২৪ বছরের শাসনকাল। সেখানে গঠিত হয়েছে বিদ্রোহীদের অন্তর্বর্তী সরকার। এখন পুরো পৃথিবীর দৃষ্টি দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক পরিসরে কোন গোষ্ঠী কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। বা কোন পরাশক্তির অবস্থা কী দাঁড়ায় সেদিকে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে পরাশক্তিগুলো বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক ও ইসরায়েলের লাভ-ক্ষতির হিসাবের বিষয়টি উঠে এসেছে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিরিয়ার দ্বন্দ্বে আসাদকে দীর্ঘদিন ধরে সমর্থন দিয়ে আসছিল ইরান ও রাশিয়া। আর অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক নানা বিদ্রোহী গ্রুপ ও মিলিশিয়াদের সমর্থন দিয়ে আসছিল। এ ছাড়া ভৌগোলিক কারণে দেশটির সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িত মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম পরাশক্তি ইসরায়েল। এখন দেখার বিষয় কোন দেশের ভবিষ্যৎ সিরিয়ায় কেমন হতে পারে সেটি।
তুরস্ক
সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলাকালীন তুরস্ক বিদ্রোহীদের একাংশকে সমর্থন দিয়েছিল। যাদের বেশির ভাগই এখন সিরিয়ান ন্যাশনাল আর্মির ব্যানারে যুদ্ধ করছে। দেশটি এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটিকে রাজনৈতিক, মিলিটারি ও অস্ত্র সহযোগিতা দিয়েছে। বর্তমানে তুরস্ক কুর্দি ওয়াইপিজি মিলিশিয়াকে নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। যেই বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি ‘ওয়াইপিজি মিলিশিয়া’ নামে পরিচিত। তারা যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট ও কুর্দিদের নেতৃত্বে থাকা সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সের (এসডিএফ) অন্যতম অংশ। এরপরও এখন তুরস্ক চায় দেশটিতে থাকা প্রায় ৩০ লাখ সিরীয় শরণার্থী যেন নিজ দেশে ফিরে যায়।
সিরিয়া সংকটে তুরস্ক রাজনৈতিকভাবেও যুক্ত। ২০২০ সালে তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। যাতে করে উত্তর-পশ্চিমে বিদ্রোহীদের শক্ত ঘাঁটি ইদলিব সরকার পুনরুদ্ধার থেকে পিছিয়ে আসতে চাপ তৈরি হয়। ইদলিবের নিয়ন্ত্রণে ছিল ইসলামি সশস্ত্র গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শাম। যাদের নেতৃত্বে করা অভিযানেই আসাদ সরকারের পতন হয়েছে।
রাশিয়া
মিত্র হিসেবে আসাদ সরকারের সঙ্গে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই রুশ বাহিনীর ঘাঁটি রয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন সিরিয়ায় রাশিয়ার উপস্থিতি জারি রেখে আসাদকে দীর্ঘদিন ধরে সমর্থন দিয়ে এসেছেন। এতে করে তিনি এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে চাওয়া পশ্চিমা শক্তিগুলোকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। ২০১৫ সালে রাশিয়া আসাদের পক্ষে বিমান বাহিনীও মোতায়েন শুরু করে। যার অংশ হিসেবে সিরিয়ার আকাশ ও নৌ-ঘাঁটি ৪৯ বছরের জন্য লিজ নেয় মস্কো। যা পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে শুরু করে ওই অঞ্চলে রাশিয়ার কর্র্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নিজেদের বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে জাহির করতে আসাদের নতজানু নীতি বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছে মস্কো। তবে ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পরেই যেন সমীকরণ পাল্টাতে থাকে। এতে করে আসাদ সরকার আগের মতো আর সামরিক সহযোগিতা না পাওয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কাছে সহজেই পরাজয় স্বীকার করে নিতে হয়। বর্তমানে পরিবারসহ আসাদ মস্কোতেই অবস্থান করছেন।
যুক্তরাষ্ট্র
২০১১ সালে সিরিয়ায় গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলে আসাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তাতে সমর্থন দেন বারাক ওবামার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। এমনকি পরে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকে সামরিক সহায়তাও দেওয়া হয়। এ ছাড়া ২০১৪ সালে আইএস দমনে সংঘাতেও যুক্ত হয় ওয়াশিংটন।
মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিয়েশন তখন সিরিয়ায় বিমান হামলা শুরু করে। পাশাপাশি স্পেশাল ফোর্স নিযুক্ত করে যারা কি না কুর্দি নেতৃত্বাধীন এসডিএফ এলায়েন্সকে আইএস-এর দখলকৃত দেশটির উত্তরপূর্ব অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে সহযোগিতা করে।
আসাদ রেজিমের পতনের পর মার্কিন সরকার সিরিয়ায় থাকা আইএস ক্যাম্পগুলো কয়েক ডজন বিমান হামলা করার দাবি করেছে। যাতে করে টালমাটাল পরিস্থিতিতে গ্রুপটি কোনো সুবিধা না নিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি নির্বাচিত ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। সিরিয়া সংকটকে তিনি ‘বিপর্যস্ত’ আখ্যা দিয়ে এটি থেকে ওয়াশিংটনের দূরে থাকা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট
থাকাকালীন ট্রাম্প সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৯০০ মার্কিন সেনা রয়েছে; যার বেশির ভাগই উত্তর-পূর্বে।
ইরান
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের সময় থেকেই সিরিয়ার সঙ্গে ইরানের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এমনকি ১৯৮০ এর দশকে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধের সময় দেশটি তেহরানকে সহায়তা করেছিল। সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের সময় আসাদ সরকারের সমর্থনে ইরান শত শত সৈন্য পাঠিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সঙ্গে খরচ করেছিল বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার।
হাজার হাজার শিয়া মুসলিম যোদ্ধারা ইরানের অধীনে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। যাদের বেশির ভাগই লেবাননের হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুক্ত। একইসঙ্গে ইরাক, আফগানিস্তান ও ইয়েমেনের পক্ষ থেকেও সিরিয়ান সেনাদের সহায়তা করা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলের সাথে দ্বন্দ্বের জেরে হিজবুল্লাহ বেশ কঠিন সময় পার করছে। এতে করে সিরিয়া নিয়ে গোষ্ঠীটির আগ্রহ কমেছে এবং আসাদ সরকারের পতনকে ত্বরান্বিত করেছে।
ইসরায়েল
১৯৬৭ সালের ছয় দিনব্যাপী চলা যুদ্ধ শেষের দিকে ইসরায়েল সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখল করেছিল। ১৯৮১ সালে একতরফাভাবে তা বর্ধিতও করেছিল। যদিও তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়নি। চলমান যুদ্ধে ইরানের যুক্ত থাকার অভিযোগে ইসরায়েল সিরিয়ার বহু লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা করেছে। যদিও তেল আবিবের পক্ষ থেকে তা স্বীকার করা হয়নি। এমনকি আসাদের পতনের পরেও নেতানিয়াহু সরকার বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে। যার মধ্যে রয়েছে সিরিয়ার মিলিটারি স্থাপনা, নৌঘাঁটি ও অস্ত্র তৈরির কারখানা। বিপজ্জনক গোষ্ঠীর কাছে অস্ত্র যাতে না যায় তাই তারা হামলা করেছে বলে জানিয়েছে দেশটি। এমনকি ইসরায়েল গোলান মালভূমির বাফার জোনও দখল করেছে। এক্ষেত্রে তেল আবিবের যুক্তি, যেহেতু আসাদ রেজিমের পতন ঘটেছে তাই আগের চুক্তিও আর কার্যকর নেই। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, দেশটির সৈন্যরা বাফার জোন ছাড়িয়েও আরও কিছু অতিরিক্ত অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। তবে তারা দামেস্কের দিকে যাচ্ছে না বলে তেল আবিবের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
