কোরআনে বর্ণিত বিজয়ের স্বরূপ

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৪:৩৫ এএম

প্রতিটি বিজয় উচ্ছ্বাসের, দারুণ উল্লাসের। আর নিজ মাতৃভূমি বিজয় মহোৎসব ও মহানন্দের। কেননা কোনো জাতির ছোট-বড় যে কোনো উৎসব উদযাপন এবং আনন্দানুভূতির মুহূর্ত তৈরি হওয়ার জন্য প্রথমেই চাই স্বাধীন ও নিরাপদ একটি ভূখণ্ড। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আমরা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ভূখণ্ডের মালিক হই। আমাদের অদম্য বীর সৈনিকরা মহোৎসব ও মহানন্দের এই বিজয় ছিনিয়ে আনেন পাকিস্তানি দখলদারদের পরাজিত করে।

পবিত্র কোরআনে বিজয়ের দুটি রূপ সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। তা হলো স্বার্থ ও সাম্রাজ্যবাদী বিজয়ের রূপ এবং কল্যাণ ও আদর্শবাদী বিজয়ের রূপ। স্বার্থ ও সাম্রাজ্যবাদী বিজয়ের রূপ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘রাজা-বাদশাহরা যখন কোনো জনপদে প্রবেশ করে তখন তা বিপর্যস্ত করে এবং সেখানকার মর্যাদাবান ও সম্মানিত লোকদের অপদস্থ করে।’ (সুরা নামল ৩৪)

স্বার্থ ও সাম্রাজ্যবাদী বিজয়ের এই রূপটি ছিল বর্বর পাকিস্তানিদের। ১৯৪৭ সালে আমাদের দেশের শাসনভার দেওয়া হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের হাতে। পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান আলাদা ভূখণ্ডে বিভক্ত হলেও উভয় ভূখণ্ডের মানুষই ছিল মুসলমান। ব্রিটিশদের দুইশো বছর শোষণ-পীড়নের পর আমরা আশাবাদী ছিলাম আমাদের মুসলমান ভাই পাকিস্তানিদের অধীনে আমরা ন্যায়বিচার পাব, দুইশো বছরে লুণ্ঠিত হওয়া অধিকার ফিরে পাব। কিন্তু তেমনটি হয়নি। ক্রমেই পাকিস্তানিরা ব্রিটিশদের চেয়েও ভয়াবহ জালেম শাসক হয়ে ওঠে। দীর্ঘ চব্বিশ বছর ব্রিটিশদের চেয়েও অমানবিক শোষণ কার্যক্রম চালায় আমাদের ওপর। আমরা শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মত। যার স্পষ্ট নির্দেশ হলো, ‘মুসলমান ভাই ভাই। মুসলমানের রক্ত ও মানমর্যাদা একে অপরের জন্য আমানতস্বরূপ।’ পাকিস্তানি নেতা ও শাসকবর্গ সেই আমানত রক্ষা করেনি। পাকিস্তানি নেতা ও শাসকদের মুখে ধর্মের বাণী থাকলেও কাজকর্মে ছিল তারা ভয়ানক বর্বর ও পিশাচ। তারা দীর্ঘ চব্বিশ বছরের শাসনকার্যে বর্বরতায় ব্রিটিশদেরও পেছনে ফেলেছিল। আর সর্বশেষ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে বাঙালি জাতির ওপর চালিয়েছিল বর্বরোচিত গণহত্যা। এতে আমরা হারিয়েছি দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। শহীদ হয়েছেন অসংখ্য যোদ্ধা। তাদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে এ দেশের মাটি। সম্ভ্রম হারিয়েছেন অসংখ্য মা-বোন। তাদের চাপা কান্নায় কম্পিত হয়েছে এ দেশের আকাশ-মাটি। দখলদাররা পুড়িয়ে দিয়েছে অসংখ্য ঘরবাড়ি। তাদের এমন বর্বরোচিত নির্যাতন ও অত্যাচারে এ দেশের আকাশে জড়ো হয়েছিল ঘন কালো মেঘ। অদম্য বীরদের হার না মানা সংগ্রামে দেশের আকাশ থেকে দূর হয় সেই ঘনঘটা মেঘ। উদিত হয় বিজয়ের এক রক্তিম সূর্য।

কল্যাণ ও আদর্শবাদী বিজয়ের রূপ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমি পৃথিবীতে তাদের প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা নামাজ আদায় করবে, জাকাত দেবে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। আর সব কর্মের পরিণাম আল্লাহর এখতিয়ারে।’ (সুরা হজ ৪১) কল্যাণ ও আদর্শবাদী বিজয়ের এই রূপটি হলো আমাদের। এটি হচ্ছে সত্য ও আদর্শের বিজয়। মানব ও মানবতার বিজয়। আমাদের সৌভাগ্য, মহান আল্লাহ আমাদের এমন বিজয় দান করেছেন। এই বিজয়ের মাধ্যমে আমরা নিজ ভূখণ্ডে আমাদের সামাজিক, নাগরিক, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয়সহ সব ধরনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি।

মাতৃভূমি থেকে দখলদারদের বিতাড়িত করা, মাতৃভূমি বিজয় করা, স্বাধীনতা অর্জন করা এবং স্বাধীন থাকা কতটা তৃপ্তি, আনন্দ ও নিরাপত্তার, তা হয়তো নতুন প্রজন্মের অনেকেই পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারবে না। তবে বর্তমানে ফিলিস্তিনের দিকে তাকালে আমরা তা যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারব। ফিলিস্তিনের মুসলমানরা নিজ ভূখণ্ডে এতটাই অসহায় ও অনিরাপদ যে, ইবাদতরত অবস্থায় কিংবা হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের সময়ও শত্রুদের হামলায় শহীদ হতে হচ্ছে। কী বর্বর ইসরায়েল জাতি! তারা মসজিদগুলোকে সমূলে ধ্বংস করছে। পাকিস্তান ও ইসরায়েল দখলদার বাহিনীর যদি তুলনা করা হয় তাহলে কিছু ক্ষেত্রে পাকিস্তান বাহিনী ছিল ইসরায়েল থেকেও বর্বর। ইসরায়েলিরা তো মুসলিম নয়। কিন্তু পাকিস্তানিরা মুসলিম হয়েও জানাজার নামাজরত অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করেছিল বলে শোনা যায়। তাদের অত্যাচারের মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ায়, মহান আল্লাহ তাদের শক্তি ও জুলুমকে ৯ মাসের ভেতরে স্তিমিত করে আমাদের দান করেন মহা বিজয়।

মক্কা বিজয়ের ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি, তা ছিল রক্তপাতহীন এক মহা বিজয়। সেদিন মক্কায় প্রবেশের সময় সাহাবিদের কেউ কেউ বলেছিল ‘আজ রক্তপাতের দিন।’ এ কথা শুনে রাসুল (সা.) তা বলতে নিষেধ করেন। অতঃপর তিনি বলেন ‘আজ দয়া ও করুণার দিন।’ সেদিন তিনি পুরো মক্কাবাসীর প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। অথচ মক্কার কাফের মুশরেকরা রাসুল (সা.)-কে কতভাবে হেনস্তা করেছে সেটার কোনো ইয়ত্তা নেই। এক সময় নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছে। আর মক্কা বিজয়ের আগে দীর্ঘ ১০ বছর নানাভাবে শত্রুতা পোষণ করেছে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। এত কিছুর পরও রাসুল (সা.) কাফের-মুশরেকদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। এটা তার মহানুভবতা।

১৯৭১ সালে আমাদের বিজয় দিবসের ইতিহাসের দিকে তাকালেও আমরা দেখতে পাই, দুপুর ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য নারী-পুরুষের সমাগম ঘটে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। তাদের মুখে ছিল হাসি। প্রাণে ছিল বিজয়ের সুর। সমাগমের উদ্দেশ্য ছিল একটাই। ৯৩ হাজার নিরুপায় সশস্ত্র পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ ও অস্ত্র জমা দেওয়ার দৃশ্য দেখা। সেদিন আর কোনো রক্তপাত হয়নি। সেদিনও নিরুপায় পাকিস্তানি হানাদারদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছিল। আমাদের ভেতরও আর প্রতিশোধস্পৃহা জাগেনি। আমরা স্বাধীন সার্বভৌম ভূখণ্ড পাচ্ছি, এটাই ছিল পরম আনন্দের। আর আমাদের বিজয়টি ছিল কোরআনে বর্ণিত কল্যাণ ও আদর্শবাদের বিজয়। তাই আমরা ছিলাম তাদের প্রতি ক্ষমাপরায়ণ।

বিজয়ীদের সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে, আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেন। তখন আপনার প্রতিপালকের পবিত্রতা বর্ণনা করুন। আর তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল।’ (সুরা নাসর ১-৩) সুতরাং বিজয়ের দিন করণীয় হলো, মহান আল্লাহর বড়ত্ব ও পবিত্রতার বর্ণনা করা এবং যুদ্ধ চলাকালে আমাদের অজান্তে যেসব ভুলত্রুটি হয়েছে, সেটার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। সুরা হজের ৪১ নম্বর আয়াত থেকে জানা যায়, বিজয়ীদের উচিত নামাজ আদায় করা, জাকাত প্রদান করা এবং সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করা। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের জন্য দোয়া করা এবং কোরআন পাঠসহ বিভিন্নভাবে সওয়াব পৌঁছে দিয়ে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করা।

আমাদের বিজয় অর্জনের মূল শক্তি ছিল বীর সৈনিকদের অকৃত্রিম দেশপ্রেম। সে সময় অসংখ্য বাঙালি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অসংখ্য শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয় এই দেশের মাটি। তাদের ত্যাগের বিনিময়ে আমরা বিজয় লাভ করি। মুক্তিযোদ্ধারা এ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন, নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। দেশের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো, নিজ মাতৃভূমিকে ভালোবাসা। এটাই রাসুল (সা.)-এর আদর্শ। রাসুল (সা.) যখন মাতৃভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনায় চলে যাচ্ছিলেন তখন তার চোখ থেকে অশ্রুর বন্যা বয়ে যাচ্ছিল এবং মনে মনে বলছিলেন, ‘হে মক্কা! আমি তোমাকে ভালোবাসি। কাফেররা নির্যাতন করে আমাকে যদি বের করে না দিত, কখনো আমি তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।’ (ইবনে কাসির ৩/৪০৪) হাদিসের বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) মদিনাকে খুব ভালোবাসতেন। কোনো সফর থেকে প্রত্যাবর্তনকালে মদিনার সীমান্তে উহুদ পাহাড় চোখে পড়লে তার চেহারায় আনন্দের আভা ফুটে উঠত। তিনি বলতেন, ‘এই উহুদ পাহাড় আমাদের ভালোবাসে, আমরাও উহুদ পাহাড়কে ভালোবাসি।’ (সহিহ বুখারি)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত