যেমন ভয়াবহ হবে কেয়ামতের শাস্তি

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৩:৩৬ এএম

কেয়ামত শব্দের অর্থ উঠে দাঁড়ানো। পরিভাষায় কেয়ামত হলো, আল্লাহর সব সৃষ্টির ধ্বংস শেষে বিচার দিবস। ইসলামি আকিদা অনুসারে হজরত ইসরাফিল (আ.) শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়ার মাধ্যমে কেয়ামত শুরু হবে। সেদিন আল্লাহ এই বিশ^জগৎ ধ্বংস করে দেবেন। একেই বলে কেয়ামত। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘যেদিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে, সেই দিনটি হবে অনেক কঠিন দিন।’ (সুরা মুদ্দাসসির ৮-৯)

কেয়ামতের দিন হাশরে মাঠে মানুষের বিচার হবে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘আজ প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের প্রতিফল দেওয়া হবে। আজ কারও প্রতি জুলুম করা হবে না। আল্লাহ হিসাব গ্রহণে তৎপর।’ (সুরা মুমিন ১৭) শেষ বিচারের দিন প্রতিটি মানুষ তার দুনিয়ার কর্মফল অনুযায়ী ন্যায্য প্রতিদান পাবেন। কেয়ামতের দিন আল্লাহ তার বান্দাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলবেন। মানুষের কথাও ধৈর্যের সঙ্গে শ্রবণ করবেন। অতঃপর তার পাপ-পূণ্যের হিসাব-নিকাশ করে তার জন্য জান্নাত অথবা জাহান্নামের ফয়সালা প্রদান করবেন।’

রাসুল (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দেওয়া পর্যন্ত কোনো মানুষ এক কদমও নড়তে পারবে না। তা হলো এক. সে তার জীবনকাল কোন কাজে অতিবাহিত করেছে? দুই. যৌবনের শক্তি সামর্থ্য কোথায় ব্যয় করেছে? তিন. ধন-সম্পদ কোন পথে উপার্জন করেছে? চার. অর্জিত ধন-সম্পদ কী কাজে ব্যয় করেছে? পাঁচ. সে দ্বীনের কতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছে? সে অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছে? (তিরমিজি ২৪১৬)

পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি কেয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের মানদ- স্থাপন করব। সুতরাং কোনো ব্যক্তির প্রতি সামান্য পরিমাণ অবিচার করা হবে না। যদি কারও আমল সরিষার দানা পরিমাণও হয়, তবুও আমি তা উপস্থিত করব। আর আমি হিসাব গ্রহণকারী হিসেবে যথেষ্ট।’ (সুরা আম্বিয়া ৪৭) এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, কেয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা মানুষের ভালো-মন্দ আমলের হিসাব নেওয়ার জন্য মিজান তথা দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করবেন। কারও প্রতি সামান্য অবিচার করা হবে না।

উদাসীন ব্যক্তিদের অবস্থা : দুনিয়ায় কিছু মানুষ কোরআনে বর্ণিত বিধিবিধান সম্পর্কে গাফেল তথা উদাসীন থাকে, এমনকি সেটার বিরোধিতাও করে। তারা দেখেও না দেখার, জেনেও না জানার, শোনেও না শোনার মতো আল্লাহর বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে। এ ধরনের লোকদের আল্লাহ হাশরের ময়দানে অন্ধ, বোবা ও বধির করেই উত্থিত করবেন। কেয়ামতের ময়দানে সম্ভবত তারাই হবে সবচেয়ে অসহায় ও হতভাগ্য মানুষ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি কেয়ামতের দিন তাদের একত্রিত করব মুখে ভর দিয়ে চলা অবস্থায় অন্ধ, বোবা ও বধির করে। তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম। যখনই তা নিস্তেজ হবে, তখনই আমি তাদের জন্য আগুন বাড়িয়ে দেব। এটিই তাদের কর্মফল। কারণ তারা আমার আয়াতগুলো অস্বীকার করেছিল, আর বলেছিল অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হলেও কি আমরা নতুন সৃষ্টিরূপে পুনরুত্থিত হব?’ (সুরা বনি ইসরাইল ৯৭-৯৮) অর্থাৎ হাশরের ময়দানে তারা শুধু অন্ধ, বোবা ও বধিরই হবে না, বরং তাদের খুবই লাঞ্ছিত অবস্থায় অত্যন্ত কষ্ট দিয়ে মুখে ভর করা অবস্থায় উল্টোভাবে দাঁড় করিয়ে চালানো হবে। তাদের পা থাকবে ওপরের দিকে আর মুখম-ল থাকবে মাটিতে ঘেঁষা। মুখে ভর দিয়ে, মাটিতে ছেঁচড়িয়ে ছেঁচড়িয়ে তারা হাশরের ময়দানে হাজির হবে। সেখানে গিয়ে তারা এ অবস্থাতেই দাঁড়িয়ে থাকবে।’ এখন সবার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, মুখের ওপর ভর করে চলাচল কি সম্ভব? এমন প্রশ্ন সাহাবায়ে কেরামের মনেও এসেছিল। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, একদিন জনৈক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসুল! কেয়ামতের দিন কাফেরদের কীভাবে মুখের ওপর হাঁটিয়ে একত্রিত করা হবে? উত্তরে তিনি বললেন, যিনি দুনিয়াতে মানুষকে দুই পায়ের ওপর চালাতে পারছেন, তিনি কি কেয়ামতের দিন তাকে মুখের ওপর ভর করে চালাতে পারবেন না? (সহিহ বুখারি ৪৭৬০)

মিথ্যা অপবাদ ও সম্পদ আত্মসাৎকারী : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, তোমরা কি জান নিঃস্ব কে? তারা বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের মধ্যে নিঃস্ব হচ্ছে ওই ব্যক্তি, যার নগদ অর্থ নেই, কোনো সম্পদও নেই। রাসুল (সা.) বলেন, আমার উম্মতের মধ্যে ওই ব্যক্তি হচ্ছে নিঃস্ব, যে কেয়ামতের দিন নামাজ, রোজা, জাকাতসহ বহু আমল নিয়ে উপস্থিত হবে এবং এর সঙ্গে সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, কারও রক্ত প্রবাহিত (হত্যা) করেছে, কাউকে মারধর করেছে ইত্যাদি অপরাধও নিয়ে আসবে। সে তখন বসবে এবং তার নেক আমল থেকে এই ব্যক্তি কিছু নিয়ে যাবে, অন্য ব্যক্তি কিছু নিয়ে যাবে। এভাবে সম্পূর্ণ বদলা (বিনিময়) নেওয়ার আগেই তার সৎ আমল নিঃশেষ হয়ে গেলে তাদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। তারপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সহিহ মুসলিম ২৫৮১) তবে হাশরের ময়দানে আল্লাহর অনুগত ও সৎকর্মশীল প্রকৃত মুমিন ব্যক্তিদের অবস্থা ততটা বিপজ্জনক হবে না। মুমিন ও মুত্তাকিদের বিভিন্ন নেক আমল সেদিন তাদের মাথার ওপর ছায়া বিস্তার করে কঠিন তাপদাহ থেকে তাদের রক্ষা করবে। তাদের কাছে হিসাব-নিকাশের সময় খুব কম বলে মনে হবে। তাদের হিসাব খুব সহজেই হবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, মুমিনের কাছে কেয়ামতের দিনটি জোহর ও আসর নামাজের মধ্যবর্তী সময়টুকুর মতো মনে হবে। (মুসতাদরাকে হাকিম ১/১৫৮) আল্লাহতায়ালা মুসলিম উম্মাহকে কেয়ামতের ভয়াবহতা থেকে হেফাজত করুন। আমাদের সবাইকে আল্লাহর দেওয়া কিতাব কোরআনের বিধান এবং রাসুল (সা.)-এর আদেশ-নিষেধ মেনে জীবন গড়ার তওফিক দান করুন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত