সন্ধ্যা হলেই সক্রিয় বালুখেকোরা

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৬:৫৯ এএম

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনাবক্ষে রাতের আঁধারে অবৈধ বালু উত্তোলন থামছেই না। দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে বালুখেকোরা। প্রতি রাতেই উপজেলার চরকালীপুরা, গুয়াগাছিয়া ও মল্লিকেরচর গ্রামসংলগ্ন মেঘনার তীরঘেঁষে অবৈধ বালু উত্তোলন চলছে। অর্ধশত ড্রেজার দিয়ে নিয়মিত তোলা হচ্ছে বালু। এতে করে নদী তীরবর্তী তিন ফসলি জমি ভাঙনের কবলে পড়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মেঘনার ওই তিন স্থান থেকে শতাধিক বাল্কহেডে করে এক রাতেই অন্তত ২০ লাখ ঘনফুট বালু লোপাট হচ্ছে। আওয়ামী লীগের শাসনামলের শেষের দিকে এ বালু উত্তোলনের মহোৎসব দেখা দেয়। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পরও মেঘনায় অবৈধ বালু উত্তোলনের সেই একই চিত্রের দেখা মিলেছে। বালু উত্তোলনের দ্বন্দ্বের জেরে সম্প্রতি খুন হয়েছে মেঘনার কুখ্যাত নৌ-ডাকাত বাবলা বাহিনীর প্রধান উজ্জল খালাসী ওরফে বাবলা।

সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, গজারিয়া উপজেলার মল্লিকেরচর গ্রামসংলগ্ন নদীতে বাবলা বাহিনী ও গুয়াগাছিয়া গ্রামসংলগ্ন নদীতে নৌ-ডাকাত নয়ন বাহিনী অবৈধ বালু উত্তোলন করে আসছিল। গত ২২ অক্টোবর সকালে মল্লিকেরচর গ্রামের একটি বাড়িতে অবস্থানকালে প্রতিপক্ষের গুলিতে খুন হন বাবলা। এ ঘটনায় গজারিয়া থানায় বাবলার মা ফরিদা বেগমের করা মামলায় গুয়াগাছিয়া গ্রামের ইউপি সদস্য জমিস উদ্দিন, একই গ্রামের নয়ন বাহিনীর প্রধান নয়ন সরকার ও সেকেন্ড ইন কমান্ড পিয়াস সরকারসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। বাবলা হত্যা মামলায় প্রতিপক্ষ নয়ন বাহনীর লোকজন আসামি হলেও তারা বালু উত্তোলন বন্ধ করেনি।

এদিকে জেলা প্রশাসন চরকালীপুরা, নয়ানগর, রমজানবেগ ও ষোলআনি গ্রামসংলগ্ন মেঘনার বালুমহাল ইজারা দিয়েছে ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে। ১২৮ একর এলাকার এ মহালে বালু উত্তোলনে বৈধতা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। কিন্তু গত বর্ষায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধেও গ্রামঘেঁষে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছিল।

উপজেলার চরকালীপুরা গ্রামের জুলহাস মিয়ার স্ত্রী শাহিদা বেগম বলেন, ড্রেজারের মাধ্যমে রাতে বালু তোলায় হয়। বাধা দিতে গেলে ড্রেজার ও বাল্কহেড থেকে গুলি করে। ভয়ে কিছু করতে পারি না।

একই গ্রামের রিমন হোসেন বলেন, রাতে গ্রাম ঘেঁষে বেশ কিছু সংখ্যক ড্রেজারে বালু তোলা হয়। ড্রেজারের চারপাশ থেকে অর্ধশত বাল্কহেডে সেই বালুভর্তি করে। গুয়াগাছিয়া গ্রামে নৌ-ডাকাত নয়ন, মল্লিকের চরের জসিম বেপারী ও রতন বেপারীর নেতৃত্বে এ বালু তোলা হচ্ছে। এ সময় তাদের কাছে অস্ত্র থাকে, তাই ভয়ে কেউ কিছু বলে না।

চরকালীপুরা গ্রামের এবাদুল্লাহ মাঝি বলেন, গ্রাম থেকে নদীর তীরের দুই কিলোমিটার পর্যন্ত তিন ফসলি জমি ছিল। সেখানে ক্ষিরাই, আলু ও ধান চাষ করা হতো। বালু উত্তোলনে এসব জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। এখন গ্রামই ভাঙনের ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ অফিসার রিফাত হোসাইন। তিনি দাবি করে বলেন, অবৈধভাবে বালু তোলায় ১৮ কোটি টাকার রাজস্ব দিয়ে বালুমহাল ইজারা নিয়ে ক্ষতির সম্মুখে পড়েছেন তারা। তিনি বলেন, ‘সরকার-নির্ধারিত মহাল থেকে দিনের বেলায় আমরা বালু উত্তোলন করি। সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ড্রেজার ফিরে যায়। এদিকে অন্ধকার নামলে মহালের বাইরে চলে আসে অসংখ্য ড্রেজার ও বাল্কহেড। রাতভর চলে অবৈধ বালু উত্তোলন। এতে করে বালু বিক্রিতে দিনের বেলায় প্রত্যাশিত বাল্কহেড পাচ্ছি না।’

রাতের মেঘনায় অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও গজারিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মামুন শরীফ। তিনি দৈনিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাতের আঁধারে একটি প্রভাবশালী চক্র বালু উত্তোলন করছে। এদের সঙ্গে পেরে উঠতে পারছে না সাধারণ মানুষ। অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ে নদী তীরবর্তী জনগণের অসংখ্য অভিযোগ ছিল। সম্প্রতি রাতে মেঘনায় দুই দফা অভিযান চালানো হয়েছে। এর মধ্যে গত ২৭ নভেম্বর রাতভর অভিযানে তিনি বালুবাহী তিনটি বাল্কহেড জব্দ ও বালু উত্তোলনে জড়িত পাঁচজনকে আটক করে জেল-জরিমানা করেন। এরপর ১ ডিসেম্বর রাতে অভিযান চালিয়ে দুটি বাল্কহেড জব্দ করে সর্বমোট ৩ লাখ টাকা জরিমানা করেন।

গজারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কোহিনুর আক্তার বলেন, ‘অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে আমরা সব সময়ই অভিযান চালাচ্ছি। ইতোমধ্যে অভিযানে পাঁচজনকে আটক করে জেল-জরিমানা করা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পরপরই আমরা অভিযানে যাই। তবে গেলে তাদের পাওয়া যায় না। তার আগেই বালুখেকোরা পালিয়ে যায়। তবে তাদের ধরতে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত