পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় নিরপরাধ জওয়ানদের মুক্তি দাবিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে যমুনায় (প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন) পদযাত্রা করেছেন পরিবারের সদস্য ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্যরা। তারা শাহবাগ পর্যন্ত গেলে সেখানে পুলিশ তাদের বাধা দেয়।
গতকাল বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শুরু হওয়া এ পদযাত্রাটি শাহবাগ মোড়ে পৌঁছালে পুলিশ আটকে দেয়। এতে শাহবাগ থেকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, মৎস্য ভবন, কাকরাইল, সায়েন্সল্যাব এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত তারা শাহবাগ জাদুঘরের সামনে অবস্থান চালিয়ে যান।
এদিকে আন্দোলনের সদস্যদের পক্ষ থেকে ৯ সদস্যের প্রতিনিধিদল প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি দিতে যায়। তারা স্মারকলিপি দিয়ে ফিরলে সন্ধ্যায় চাকরিচ্যুত বিডিআর সদস্য এবং কারাগারে থাকা সদস্যদের পরিবার শাহবাগ ছেড়ে চলে যান। দেখা গেছে, সকাল থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জমায়েত হতে থাকেন তখনকার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে চাকরিচ্যুত বিডিআর সদস্য এবং কারাগারে থাকা সদস্যদের পরিবার। তারা সেখানে মানববন্ধন করে চাকরিচ্যুত বিডিআর সদস্যদের চাকরিতে পুনর্বহাল এবং কারাগারে থাকা সদস্যদের ‘অবিলম্বে’ মুক্তির দাবি জানানো হয়। পরে পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি দিতে তারা বাসভবন যমুনা অভিমুখে পদযাত্রা করেন। পদযাত্রা করে শাহবাগ মোড়ে এলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এ বিষয়ে পুলিশের রমনা জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বিডিআর বিদ্রোহের পর চাকরিচ্যুত ও কারাগারে থাকা বিডিআর সদস্যদের পরিবারের লোকজন এ আন্দোলন করছেন। তারা শাহবাগে এলে পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের আটকে দেওয়া হয়।
শাহবাগ থানার ওসি মোহাম্মদ খালিদ মনসুর বলেন, আন্দোলনরত সদস্যদের পক্ষ থেকে ৯ সদস্যের প্রতিনিধিদল প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি দিতে যায়। তারা স্মারকলিপি দিয়ে ফেরত এলে আন্দোলনরত সদস্যরা চলে যান।
জানা গেছে, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদর দপ্তরে বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। দেশের গ-ি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোড়ন তোলে ওই ঘটনা। এ ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা হয়। হত্যা মামলায় খালাস বা সাজাভোগ শেষে বিস্ফোরক মামলার কারণে ৪৬৮ জনের মুক্তি আটকে আছে।
হত্যা মামলায় ৮৫০ জনের বিচার শেষ হয় ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর। তাতে ১৫২ জনের ফাঁসি, ১৬০ জনের যাবজ্জীবন ও ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেওয়া হয়। খালাস পান ২৭৮ জন। ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর সেই মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায়ও হয়ে যায় হাইকোর্টে। তাতে ১৩৯ আসামির মৃত্যুদ- বহাল রাখা হয়। যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয় ১৮৫ জনকে। আরও ২২৮ জনকে দেওয়া হয় বিভিন্ন মেয়াদে সাজা। খালাস পান ২৮৩ জন।
হাইকোর্টের রায়ের আগে ১৫ জনসহ সব মিলিয়ে ৫৪ জন আসামি মারা গেছেন। হত্যা মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে ২২৬ জন আসামি আপিল ও লিভ টু আপিল করেছেন। অন্যদিকে হাইকোর্টে ৮৩ জন আসামির খালাস এবং সাজা কমানোর রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এসব আপিল ও লিভ টু আপিল এখন শুনানির অপেক্ষায়।
ক্ষমতার পালাবদলের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনার তদন্ত ফের শুরুর দাবি উঠছে। গত ১৯ ডিসেম্বর অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যান শহীদ পরিবারের সদস্যরা। ১৫ বছর আগে এই হত্যাকা- পুনঃতদন্তের জন্য গত ২৪ ডিসেম্বর আ ল ম ফজলুর রহমানকে প্রধান করে কমিশন গঠন করে ৯০ দিনের সময় বেঁধে দিয়েছে সরকার।
গতকাল বিকেলে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন থেকে ফিরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক সমন্বয়ক মাহিন সরকার বলেন, বিডিআর হত্যাকা-ের পুনঃতদন্তের দাবিতে রাতে আমরা শহীদ মিনারে অবস্থা কর্মসূচি পালন করব। যদি ন্যায়বিচারের ইঙ্গিত না দেখি, তাহলে বৃহস্পতিবার (আজ) শাহবাগ ব্লকেড করা হবে। একইসঙ্গে আমাদের কর্মসূচি চলমান থাকবে।
বিডিআর ৪৬ ব্যাচের সদস্য কে এ রাজ্জাক বলেন, আমরা রাতেও শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি পালন করব। ন্যায়বিচারের আভাসের জন্য বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা পর্যন্ত শহীদ মিনারে অপেক্ষা করব। যদি ন্যায়বিচারের ইঙ্গিত না পাই, তাহলে আমরা শাহবাগ ব্লকেড করব।
