দুর্নীতি মানবসমাজের ভয়াবহ এক ব্যাধি। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর উন্নতি ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হলো এই সর্বগ্রাসী দুর্নীতি। মহান আল্লাহ প্রতিটি জাতিকে চলার মতো যথেষ্ট সম্পদ ও উপকরণ দিয়েছেন। যে জাতি সেই সম্পদ ও উপকরণকে যথাযথ কাজে লাগাতে পারে, তারাই উন্নতির চূড়ায় আরোহণ করে। সম্পদের যথোপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত হলে সীমিত সম্পদ নিয়েও উন্নতির প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যায়। কিন্তু এর অন্যথা হলে সম্পদের যতই প্রাচুর্য থাকুক, জাতি কখনো উন্নতি করতে পারে না। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। আল্লাহ এই জাতিকে ধনসম্পদে সমৃদ্ধ করেছেন। বিভিন্ন ধরনের খনিজ সম্পদ যেমন দিয়েছেন, তেমনই মেধা ও মানব সম্পদের প্রাচুর্যও দিয়েছেন। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে এসেও আমরা লড়াই করছি ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও অভাবের সঙ্গে। এর অন্যতম কারণ হলো আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা দুর্নীতি। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো অনেক রাষ্ট্র এক সময়ে বাংলাদেশের সমপর্যায়ের থাকলেও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনা ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে তারা এখন উন্নত বিশ্বের গর্বিত অংশীদার। পক্ষান্তরে আমরা এখনো তৃতীয় বিশ্বের গ্লানি বহন করে চলছি।
এ দেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন কম হয়নি। দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করা হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দুর্নীতি রোধ করার জন্য নানা কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু কোনো কৌশলই তেমন কার্যকর বা ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়নি। দুর্নীতি আপন অবস্থায় বহাল রয়ে গেছে। দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ম্য দিনদিন বেড়েই চলছে। হীন ব্যক্তিস্বার্থের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে দেশ ও জাতিকে। এমনকি যারা দুর্নীতি দমনের দায়িত্বে রয়েছেন, সেই কর্তাব্যক্তিদেরও অনেকে সীমাহীন দুর্নীতিতে লিপ্ত। এই দুরবস্থার প্রধানতম কারণ হলো মানুষের অন্তরে আল্লাহ ও পরকালের ভয় না থাকা। আল্লাহ ও পরকালের এই ভয়কে ইসলামি পরিভাষায় তাকওয়া বলে। সব দুর্নীতি ও অন্যায় রোধে এই তাকওয়া বা খোদাভীতি হতে পারে একমাত্র কার্যকর হাতিয়ার।
কারও অন্তরে যখন আল্লাহর ভয় থাকবে, তখন কোনো লোভ-লালসা ও প্রলোভন তাকে নীতিবিচ্যুত করতে পারবে না। কারণ একজন মুমিন মাত্রই জানেন, দুনিয়ায় অপরাধের বিচার হোক বা না হোক, আখেরাতে সব অপরাধের বিচার হবে। দুনিয়ার আইনের চোখ ফাঁকি দেওয়া গেলেও আল্লাহর চোখ ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব। তার দরবারে সব কর্মকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতেই হবে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। আর প্রত্যেকেই যেন চিন্তা করে দেখে, আগামীকালের জন্য সে কী প্রেরণ করেছে। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা যা করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত।’ (সুরা হাশর ১৮) মহান আল্লাহ অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেব, তাদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।’ (সুরা ইয়াসিন ৬৫)
নীতিবিরুদ্ধ সব কাজই দুর্নীতি। ন্যায়কে উপেক্ষা করে অন্যায়কে বেছে নেওয়াই দুর্নীতি। ইসলাম কোনো প্রকার অন্যায় ও অনিয়মকে প্রশ্রয় দেয় না। দুর্নীতি ও অসদুপায় অবলম্বনের বিরুদ্ধে ইসলাম সর্বোচ্চ কঠোরতা আরোপ করেছে। সর্বক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করতে বলেছে। কোরআন ও হাদিসের অসংখ্য স্থানে এ ব্যাপারে তাগিদ ও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সঙ্গে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে দণ্ডায়মান হও। কোনো কওমের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের এমনভাবে প্ররোচিত না করে যে, তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ করো, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো, আল্লাহ সে বিষয়ে জানেন।’ (সুরা মায়েদা ৮)
প্রকৃত অর্থে উন্নত সমাজ ও রাষ্ট্র গড়তে হলে নাগরিকদের মধ্যে তাকওয়া বা খোদাভীতি থাকা প্রয়োজন। এজন্য রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক এবং সচেতন নাগরিকদের খোদাভীরু হওয়ার পাশাপাশি তাদের দায়িত্ব হলো, জনগণকে ইসলামি অনুশাসন মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করা। তাদের দুর্নীতির ইহকালীন ও পরকালীন ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সচেতন করা। এর পাশাপাশি দেশের প্রতিটি সেক্টরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সম্মুখীন করতে হবে। তাহলেই একটি নৈতিক, সুখী ও কল্যাণমুখী সমাজ গড়া সম্ভব হবে।