বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান দুটো মাধ্যমের একটি হলো পশুপালন। অনেক সময় বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে পশুপালন না করার কারণে লোকসান গুনতে হয়। পশুপালন বিভাগে পড়াশোনা করলে জানতে পারবেন বিজ্ঞানসম্মতভাবে পশু লালন-পালন, খামার পরিচালনা, পশুর প্রজনন, খাদ্য, কৌলীতত্ত্ব, পশুর রোগবালাই ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়। উন্নত নতুন সংকর প্রাণী উদ্ভাবনেও কাজ করা যায়। পশুপালন বিষয়ে পড়ার প্রতি দিন দিন ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ বাড়ছে। এ বিষয়ে পড়ে দেশে তো বটেই, দেশের বাইরেও ভালো চাকরির সুযোগ আছে। তাই এই পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে আকৃষ্ট হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।
পড়ার যোগ্যতা
আবেদনকারী শিক্ষার্থীকে এসএসসি বা সমমান এবং এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় চতুর্থ বিষয় ছাড়া ন্যূনতম জিপিএ ৪.০০ পেতে হবে। উভয় পরীক্ষায় সর্বমোট জিপিএ ন্যূনতম ৮.৫০ থাকতে হয়। জিসিই-ও এবং জিসিই-এ লেভেলে পাসকৃত শিক্ষার্থীদের ও লেভেল এবং এ পরীক্ষায় অন্তত দুটো বিষয়ে উত্তীর্ণ হতে হবে। উভয় পরীক্ষায় সর্বমোট জিপিএ ৮.৫০ এবং আলাদাভাবে ন্যূনতম জিপিএ ৪.০০ থাকতে হয়। এ ও বি গ্রেডের জন্য জিপিএ যথাক্রমে ৫ ও ৪ গণনা করা হবে।
পশুপালন অনুষদ
বাংলাদেশের প্রাণিজ চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ১৯৬২ সালে প্রথম বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ে পশুপালন অনুষদ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই অনুষদে মোট পাঁচটি বিভাগের মধ্যে রয়েছে পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগ, পশু বিজ্ঞান বিভাগ, পশু প্রজনন ও কৌলিবিজ্ঞান বিভাগ, পশুপুষ্টি ফিল্ড এবং ডেইরি বিজ্ঞান বিভাগ। সাড়ে চার বছরের কোর্সটিতে ৬ মাস ইন্টার্নি করতে হয়।
দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার আমিষের চাহিদা পূরণে ভেটেরিনারি (পশুচিকিৎসাবিদ্যা) ও অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রির (পশুপালন) স্নাতকরা অবদান রেখে চলেছেন। পোলট্রি শিল্পসহ পশুখাদ্য উৎপাদন ও পশুর ওষুধ উৎপাদনে কাজ করছেন স্নাতকরা। পশুচিকিৎসা ও পশুপালন দুটি আলাদা ক্ষেত্র। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদাভাবে পশুপালনের ওপর পড়াশুনা রয়েছে। অন্য বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্স নামে সমন্বিত বিষয় আছে। এ জন্য চাকরির ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতাও রয়েছে। সরকারির পাশাপাশি অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এখান থেকে পাস করা স্নাতকরা চাকরি করতে পারেন। ভেটেরিয়ানরা শুধু পশু চিকিৎসাতেই সীমাবদ্ধ না, পশুপাখির মাধ্যমে যেসব রোগ মানুষের মধ্যে ছড়ায় তা নিয়েও গবেষণা করছেন। বিদেশে ভেটেরিনারিদের চাহিদাও ব্যাপক।
চাকরির ক্ষেত্র
এ বিষয়ে ভালো রেজাল্ট করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে উপজেলাগুলোতে ভেটেরিনারি সার্জন হিসেবে যোগ দেওয়ার সুযোগ তো আছেই। একই পরীক্ষায় পশুপালন অনুষদের স্নাতকরা উপজেলাগুলোতে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পশু উৎপাদন কর্মকর্তা কিংবা পোলট্রির উন্নয়ন কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন, যা পরবর্তী সময়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি পান। বিভিন্ন ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে লেকচারার হিসেবে যোগ দেওয়া যায়। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (বিএলআরআই) বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে কাজের সুযোগ রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের অধীনে বিভিন্ন সরকারি ফার্ম ও গবেষণা কেন্দ্রে নিয়োগ পান স্নাতকরা।
সরকারি প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটা, সাভারের বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় গো প্রজননকেন্দ্র ও দুগ্ধ খামার, কক্সবাজারের হরিণ প্রজননকেন্দ্র, সিলেটে ছাগল প্রজননকেন্দ্র, বাগেরহাটে মহিষ প্রজননকেন্দ্র, বেশ কয়েকটি জায়গায় কুমির প্রজননকেন্দ্র এবং বন্য প্রাণী প্রজননকেন্দ্রে শুধু ভেটেরিনারি ও পশুপালন গ্র্যাজুয়েটরা চাকরি করছেন। বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় ক্যাডারে কিউরেটর এবং নন-ক্যাডারে অফিসার হিসেবে কাজ করছেন তারা। এ ছাড়া যুব উন্নয়ন কেন্দ্র ও যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেও চাকরি করছেন অনেকে। অনেকেই ব্যক্তিগত পর্যায়ে পোলট্রি ও ডেইরি খামার দিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। বেসরকারি পর্যায়ে কাজের ক্ষেত্র অনেক বেশি বিস্তৃত। বেসরকারি দুধ ও পোলট্রির খামার, ব্র্যাক, ফিড মিল, এনজিও এবং আন্তর্জাতিক সংস্থায় চাকরির সুযোগ আছে। এগুলোর মধ্যে আড়ং ডেইরি, কাজি ফার্মস, আফতাব বহুমুখী ফার্ম, মিল্ক ভিটা, সিপি ফুড উল্লেখযোগ্য।
কোথায় পড়বেন
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদে রয়েছে ভেটেরিনারি সায়েন্স বিভাগ এবং ঝিনাইদহে রয়েছে সরকারি ভেটেরিনারি কলেজ।