মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার পারদ চরমে। গতকাল শনিবার দিবাগত রাতে যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান একযোগে আঘাত হেনেছে ইরানের তিনটি উচ্চ-গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু কেন্দ্রে—ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইস্পাহানে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এই হামলার খবর প্রথম নিশ্চিত করেন ট্রুথ সোশ্যালে। পরে ইরানও হামলার বিষয়টি স্বীকার করে নেয়।
এই তিনটি স্থাপনায় একসাথে হামলার ঘটনা নজিরবিহীন। উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সীমিত উত্তেজনা চললেও এ ধরনের সমন্বিত হামলা ইঙ্গিত দেয় এক নতুন ধরনের সামরিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের দিকে। কূটনৈতিক মহল বলছে, এই হামলা শুধু একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য এক প্রকার হুমকিস্বরূপ বার্তা।
ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (এইওআই) এই হামলাকে ‘বর্বরোচিত আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। সংস্থাটির দাবি, হামলার সময় পরমাণু স্থাপনাগুলোতে তেজস্ক্রিয় কোনো উপাদান ছিল না, আগে থেকেই সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। আল জাজিরা ও ইরানি বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, তেহরান পূর্বাভাস পেয়েই ওইসব কেন্দ্র খালি করে দিয়েছিল—যা ইঙ্গিত দেয়, ইরান সম্ভাব্য হামলার ব্যাপারে প্রস্তুত ছিল।
এইওআই এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘হাজারো বিজ্ঞানী ও শহীদের রক্তে গড়া পরমাণু কর্মসূচি কোনো হামলায় থেমে যাবে না।’
তেহরানের কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হোসেইন শরিয়তমাদারি পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের নৌঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে হবে এবং হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে বন্ধ করে দিতে হবে।’
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয় হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে। এই প্রণালি বন্ধ হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, সমগ্র বিশ্বে জ্বালানিবাজারে ধস নামতে পারে। অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিশ্বমন্দার আরেকটি ঢেউ ডেকে আনতে পারে।
এদিকে ইরানে হামলার পর গতকাল জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ‘এভাবে চলতে পারে না। এখনই শান্তি চাই। না হলে ইরানে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি ঘটবে।’ তিনি হামলাকে ‘অসাধারণ সামরিক সাফল্য’ বলে আখ্যা দেন এবং জানান, ‘এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে কাজ করেছে।’
ট্রাম্পের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট—এটি শুধু প্রাথমিক পদক্ষেপ, পরবর্তী সময় আরও বড় ধরনের অভিযান চালানো হতে পারে যদি ইরান প্রতিরোধ অব্যাহত রাখে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘আপনার দৃঢ় সিদ্ধান্ত ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেবে।’
তবে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যে বিপজ্জনক উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ। এটি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। কেবলমাত্র শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক সমাধানই এ সংঘাতের উপযুক্ত পথ।’
এই ঘটনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—এই হামলা কি একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সূচনা, না কি এটি একটি সীমিত কৌশলগত বার্তা? বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বা বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়, তবে সংঘাতের মাত্রা অনেক গুণ বেড়ে যাবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে।
তখন মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং গোটা বিশ্ব পরিণত হবে এক ভয়াবহ জ্বালানি ও নিরাপত্তা সংকটের কেন্দ্রে। কূটনীতি এখন এক কঠিন পরীক্ষার মুখে—জাতিসংঘ শান্তির বার্তা দিচ্ছে, অথচ যুদ্ধের ঢোল বাজছে মাটিতে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘর্ষ এখন আর নিছক কথার লড়াই নয়। পরমাণু স্থাপনায় হামলা, পাল্টা হুমকি, এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে বিশ্ব আজ আরেকটি বড় যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। এখন দেখার বিষয়, শীতল কূটনীতি আগুনের এই উত্তাপ কমাতে পারে কি না।
তথ্যসূত্র: বিবিসি ও আল–জাজিরা
‘মিস্টার ট্রাম্প, যুদ্ধ মাত্র শুরু’
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্বেগ
অনেক টার্গেট এখনো বাকি রয়েছে: ট্রাম্প