পানিতে হলুদ মেশানোর প্রতিক্রিয়া, বিজ্ঞান কী বলে

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৫, ০৭:৫৪ পিএম

অন্ধকার ঘরে মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে তার ওপর রাখা একটি স্বচ্ছ পানিভর্তি গ্লাস। ধীরে ধীরে সেই পানিতে ঢালা হচ্ছে হলুদের গুঁড়ো। মুহূর্তেই পানির ভেতর শুরু হলো এক রহস্যময় নৃত্য—হলুদের ঝরেপড়া কণাগুলো যেন কোনো জাদুর জগত থেকে উঠে এসেছে। রূপকথার গল্পের মতো জাদু। তবে এমনটা হওয়ার পেছনে বিজ্ঞানের বিজ্ঞানের মজার খেলা।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকে এ দৃশ্য চোখে পড়ছে হরহামেশাই। রীতিমতো ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে এটি। আর বরাবরের মতো এই ট্রেন্ডের পক্ষে বিপক্ষে চলছে আলোচনা ও সমালোচনা।

কেউ কেউ মজা করে বলছেন বাজারে হলুদের দাম এবার বুঝি বেড়ে গেলো, আবার কেউ বলছেন পয়সা দিয়ে কেনা হলুদের গুঁড়া এভাবে সবাই মিলে অপচয় করা ঠিক না। কেউ আবার দোকানে হলুদের ঘাটতি দেখিয়ে মজার মিম বানাচ্ছেন। কেউ কেউ ভিডিও করতে গিয়ে মা-বাবার বকুনি খাচ্ছেন, আবার সেই ঘটনাকেই ভিডিও বানিয়ে পোস্ট দিচ্ছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। যেন পুরো অনলাইন জগত জুড়েই এখন শাসন করছে এই ‘হলুদের আলো’।

এই ‘জাদুর’ পেছনে অবশ্য রয়েছে কঠিন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। হলুদের গুঁড়োয় থাকা একটি উপাদান—রাইবোফ্লাভিন—যেটি অতিবেগুনি (ইউভি) আলোতে বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখায়। এই উপাদানটি আলোর তরঙ্গ শোষণ করে এবং তা পুনরায় বিচ্ছুরণ করে এক সোনালি আভায়। ফোনের ফ্ল্যাশ যখন পানির গ্লাসের মধ্য দিয়ে আলো দেয়, তখন কাঁচ ও পানির ভিন্ন ভিন্ন প্রতিসরণ সূচকের কারণে তৈরি হয় প্রতিফলন ও প্রতিসরণের এক চমৎকার সমন্বয়।

তবে আসল মজা শুরু হয় যখন হলুদের গুঁড়ো ধীরে ধীরে পানিতে মেশে। এই গুঁড়ো পুরোপুরি গলে না; বরং ভেসে থাকে ক্ষুদ্র কণায়, যা তৈরি করে একটি সাসপেনশন। এই ভাসমান কণাগুলো যখন আলোর মুখোমুখি হয়, তখন তারা আলোকে ছড়িয়ে দেয়। এই ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাটিকেই বলা হয় টিনডাল ইফেক্ট, যার নাম এসেছে আইরিশ পদার্থবিজ্ঞানী জন টিনডালের নাম অনুসারে। সহজ করে বললে, চোখে দেখা না গেলেও, পানির অণুর চেয়ে বড় ওই ক্ষুদ্র কণাগুলোর মুখে যখন আলো পড়ে, তখনই তৈরি হয় এই মনোমুগ্ধকর আলোর খেলা।

এই ছোট্ট পরীক্ষাটি এতটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠার আরেকটি কারণ হলো মানুষের প্রতিক্রিয়া—বিশেষ করে শিশুদের। যখন একটি বাচ্চা প্রথমবার এই ঝলমলে ঝলক দেখে, তাদের বিস্মিত চোখ আর খোলা-মুখের অভিব্যক্তি কোনো পরিপূর্ণ বিজ্ঞানের থিসিসকেও হার মানায়। আর সেই মুহূর্তগুলো যখন ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের মিষ্টি মিউজিক আর একটু ভিডিও এডিটিংয়ের ছোঁয়ায় রঙিন হয়ে ওঠে, তখন সেটি শুধু ভিডিও নয়, হয়ে ওঠে এক টুকরো অনুভব। শোনা যায়, এই ট্রেন্ডটির শুরু টিকটক থেকে, পরে ছড়িয়ে পড়ে ইনস্টাগ্রাম আর ফেসবুকে।

তবে, এই আনন্দদায়ক পরীক্ষার মাঝেও সচেতনতা থাকা জরুরি। বাজারে পাওয়া সাধারণ হলুদের গুঁড়োয় অনেক সময় অতিরিক্ত রঙ বা রাসায়নিক উপাদান মেশানো থাকে, যা চোখে গেলে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে এই পরীক্ষার সময় সতর্ক থাকা একান্ত প্রয়োজন।

বিজ্ঞান শুধু গবেষণার নয়, বিনোদনেরও হতে পারে—যদি সেটি আনন্দের সঙ্গে সচেতনতা মিলিয়ে করা হয়। সুতরাং, আমরা যখন আলো আর হলুদের এই ছোট্ট পরীক্ষাটি করি, তখন যেন শুধু টিনডাল সাহেবকে নয়, নিজেদের সাবধানতাকেও মনে রাখি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত