ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে এক নামে পরিচিত হওয়া খেলোয়াড়দের আলাদা একটা সুনাম আছে। যদি সেই নাম হয় রোমান পুরাণের দেবতা 'জিউস'-এর পুত্রের নামানুসারে, আর সেই খেলোয়াড় হন ফ্লুমিনেন্সের হয়ে খেলা ২৪ বছর বয়সী হfরকিউলেস—তাহলে তো কেবল নামেই নয়, পারফরম্যান্সেও আলো ছড়াতে হয়! হারকিউলেস সেটাই করে চলেছেন।
ক্লাব বিশ্বকাপে ফ্লুমিনেন্সের হয়ে প্রথম তিন ম্যাচে শুরুর একাদশে খেললেও তেমন নজর কাড়তে পারেননি হারকিউলিস পেরেইরা দো নাসিমেনতো। কিন্তু শেষ দুই ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেন তিনি। ইন্টার মিলানের বিপক্ষে রাউন্ড অব ১৬-তে ইনজুরি টাইমে বাঁ পায়ে পোস্টের নিচের ডান কোণায় বল জড়িয়ে এনে দেন জয়। কোয়ার্টার ফাইনালে আরেকটি ডান পায়ের গোল নিশ্চিত করে ফ্লুমিনেন্সের সেমিফাইনাল। দুই ম্যাচেই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের ভুল কাজে লাগিয়ে ছিলেন শিকারের মতো নির্ভুল। এই ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের জন্য ম্যাচসেরার পুরস্কারও উঠেছে তাঁর হাতে।
এর আগেই হরকিউলেস নিজের ক্লাবের জন্য হয়ে উঠেছিলেন এক নায়ক। আল হিলালের বিপক্ষে গোল করে ফ্লুমিনেন্সকে এই ক্লাব বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ এনে দিয়েছিলেন তিনিই। অথচ, খুব অল্পদিন আগেও হরকিউলেস খেলছিলেন নিম্নবিত্ত ক্লাবগুলোতে।
পিয়াউই অঙ্গরাজ্যের প্রত্যন্ত শহর জাইকোসে জন্ম হারকিউলেসের। প্রথম পেশাদার ক্লাবের স্বাদ পান সাও পাওলোর তৃতীয় বিভাগের দল ইসি সাও বার্নার্দোতে। কিছুদিন অনূর্ধ্ব-১৭ দলে খেলার পর ফিরে যান উত্তর-পূর্ব ব্রাজিলে। এরপর তিরাদেন্তেস-সিই হয়ে ২০১৯ সালে নাম লেখান আতলেতিকো-সিই-তে।
২০২০ সালের সাও পাওলো জুনিয়র ফুটবল কাপে পারফর্ম করে নজর কাড়েন, কিন্তু প্রতিযোগিতা শেষ হতেই করোনার কারণে ফিরতে হয় পিয়াউইয়ে। আতলেতিকো-সিই-এর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মারিয়া হোসে ভিয়েইরা বলেন, 'সে খুব করে বাড়ি যেতে চাইছিল। কিন্তু ওর বিকাশের জন্য আমরা ওকে বুঝিয়ে থামিয়েছি।'
পরবর্তীতে ধারে ক্রাতো ক্লাবে খেলে সিইয়ারার দ্বিতীয় বিভাগ থেকে এলিট পর্যায়ে উন্নীত করতে সাহায্য করেন। পরে আতলেতিকো-সিই-তে স্থায়ী হন এবং মাসে মাত্র ২ হাজার রিয়াল আয় করতেন। একদিন এসে জানান, বাবার জন্য মোটরসাইকেল কিনেছেন, যার কিস্তি ১,৮০০ রিয়াল! মারিয়া হোসে বলেনন, 'আমি তো শুনে প্রায় মরে যাচ্ছিলাম! কিন্তু সে সেটা ঠিকমতো পরিশোধ করেছে। আজ সে তার পরিবারকে অনেক ভালো জীবন দিতে পারছে। হারকিউলেস সবসময় এমনটিই স্বপ্ন দেখত—এটা ভাবলেই আমার ভালো লাগে। সে যখন এখানে এসেছিল, তখন কোনো বেতনই পেত না। আর এখন সে আমাদের পুরো দলের মাসিক বেতনের সমান আয় করে।”
২০২১ সালে সিয়ারার চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনাল পর্যন্ত দলকে নিয়ে যাওয়ার পর ফোর্টালেজার অনূর্ধ্ব-২৩ দলে ধারে যোগ দেন। সেখানে ব্রাজিলিয়েরাঁও ডি অ্যাসপিরান্তেস-এর সেমিফাইনালে উঠা দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। কোচ ভোজভোদার নজরে পড়ে যান, যিনি যুব দলের খেলা নিয়মিত দেখতেন।
এরপর ২০২২ সালের শুরুতে পেশাদার দলে উন্নীত হন, খেলেন ৪৮টি ম্যাচ। ফ্ল্যামেঙ্গোর বিপক্ষে মারাকানায় করা একটি গোলের জন্য সতীর্থ মইজেসের সঙ্গে বাজি জিতেছিলেন ৫০০ রিয়াল!
২০২৫ সালের শুরুতে ফ্লুমিনেন্স হারকিউলিসকে কিনে নেয় ২৯ মিলিয়ন রিয়ালে (৫.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার), যা ক্লাব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চুক্তি। সেই হারকিউলেসই ক্লাবকে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তুলে ফ্লুমিনেন্সকে কমপক্ষে ২১ মিলিয়ন ডলার মার্কিন ডলার নিশ্চিত করে দিয়েছেন।
হারকিউলেস বলেন, “আমি যখন ফ্লুমিনেন্সে আসি, কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। কিন্তু আমার পরিবার, সতীর্থরা এবং ক্লাবের সবাই পাশে ছিল। আমি বলেছিলাম, আমি কাজ করে যাব—ভালো কিছু নিশ্চয়ই আসবে। এটা কঠোর পরিশ্রমের ফল। এখনও অনেক ভালো কিছু বাকি। আমার যাত্রাটা কঠিন ছিল, বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ব্রাজিলে সবকিছু আরও কঠিন। কিন্তু আমি কখনো হাল ছাড়িনি। পরিবার সবসময় পাশে ছিল, আমি কাজ করে যাব।'
হেরকিউলেসের গল্প কেবল একজন ফুটবলারের সাফল্যের গল্প নয়—এটা আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় এবং পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতার গল্প।
ক্লাব বিশ্বকাপে চমক : সেমিফাইনালে ব্রাজিলের ফ্লুমিনেন্স
আবারও ব্যাটিং না করেই ম্যাচসেরা গ্লেন ম্যাক্সওয়েল