জাহাজ বাড়ছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি)। সরকারের এই সংস্থাটি নিজস্ব অর্থায়নে ৬৩ হাজার ৫০০ টনের দুটি আধুনিক বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ ক্রয় করছে। ইতোমধ্যে সরকারের ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির অনুমোদনের পর জাহাজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কারখানা চীনে গিয়েও একটি প্রতিনিধিদল পরিদর্শন করে এসেছে। মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) বিএসসির সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক এসব তথ্য জানান।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, সরকারি অনুমোদন অনুযায়ী এই দুটি জাহাজ সেপ্টেম্বর ও নভেম্বর ২০২৫-এ বিএসসির বহরে যুক্ত হওয়ার কথা। সেহিসেবে আমরা চলতি বছরেই এগুলো থেকে আয় পাওয়া শুরু করবো। আধুনিক কারিগরি বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি সমৃদ্ধ এসব জাহাজ যুক্ত হলে বিএসসির পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
তিনি জানান, জাহাজ দুটি ক্রয়ে মোট ব্যয় হবে মা.ড. ৭৬.৬৯৮ মিলিয়ন, যা দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্য মা.ড. ৮০.৪০ মিলিয়নের চেয়ে ৪.৬০ শতাংশ কম। প্রস্তাবিত জাহাজ দুটি সরবরাহ করবে হ্যালিনিক ড্রাই বাল্ক ভ্যানচার এলএলসি।
জাহাজগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরে বিএসসির এমডি বলেন, এতে কোনট্রা রোট্যাটিং প্রোপেলার (সিআরপি) প্রযুক্তি থাকছে, যা জ্বালানি খরচ কমাবে এবং অপারেশনাল দক্ষতা বাড়াবে। অ্যারোডাইনামিক ব্রিজ ডিজাইন বাতাসের বাধা কমিয়ে জাহাজকে আরও দ্রুত ও সাশ্রয়ী করবে। এছাড়া আধুনিক হাল ফর্ম ডিজাইন জাহাজের গতি বাড়াবে ও জ্বালানি সাশ্রয় করবে।
পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে নির্বাচনী অনুঘটক হ্রাস (এসসিআর) এক্সস্ট গ্যাস বয়লার, যা ইঞ্জিন থেকে নাইট্রোজেন অক্সাইড নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করবে। জাহাজ দুটি গ্রিন শিপ ধারণা অনুযায়ী তৈরি, যা আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদন্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আইএমও টিয়ার-৩ সার্টিফাইড ইঞ্জিন দ্বারা চালিত।
এর আগে জাহাজ দুটি কেনার জন্য গত ৪ জুন আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলে আটটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র ক্রয় করে এবং তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়। মূল্যায়ন কমিটি জাহাজের কারিগরি যাচাই শেষে হ্যালিনিক ড্রাই বাল্ক ভ্যানচার এলএলসি-এর প্রস্তাব সুপারিশ করে। সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএসসির নির্বাহী পরিচালক (বাণিজ্য) মো. আনোয়ার পাশা, নির্বাহী পরিচালক (প্রযুক্তি) ইঞ্জি. মো. ইউসুফ, সচিব আবু সাফায়াৎ মো. শাহেদুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সাজিয়া পারভীনসহ বিভাগীয় প্রধানগন উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করা বিএসসির বহরে একসময় ৪৪টি জাহাজ ছিল। কিন্তু নানামুখি অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনায় বিএসসি লোকসান দিতে দিতে একেবারে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়। এক পর্যায়ে ২০১৮ সালে এসে সংস্থার বহরে জাহাজের সংখ্যা মাত্র দুইটিতে নেমে আসে। পরবর্তীতে চীন সরকারের আর্থিক সহায়তায় সর্বশেষ ২০১৮ সালে তিনটি এবং ২০১৯ সালে তিনটি মিলে ছয়টি জাহাজ নিয়ে বিএসসির বহর উন্নীত হয় ৮টি জাহাজে। ২০২২ সালের ২ মার্চ ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে রকেট হামলায় ‘এমভি বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। ২০২২ সালে বিএসসির বহর আবার ৭টি জাহাজে নেমে আসে। গত বছরের অক্টোবরে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ৩৭ বছরের পুরনো এমটি বাংলার সৌরভ ও এমটি বাংলার জ্যোতি জাহাজ দুটি অগ্নিকান্ডে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই দুইটি জাহাজ স্ক্র্যাপ হিসেবে পরবর্তীতে ৫৫ কোটি টাকায় বিক্রি করে দেয়া হলে বিএসসিতে জাহাজের বহর নেমে আসে মাত্র ৫টিতে।
