প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধন সুয়েজ খাল

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৫, ০৯:১৪ এএম

ইউরোপ ও এশিয়াকে একসূত্রে গেঁথেছে সুয়েজ খাল। ভূ-রাজনীতিতে যেমন এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ তেমনি ইউরোপের অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এই খাল। ১৮৫৮ সালে নির্মিত খালটি যেমন সমৃদ্ধ করেছে একটি বিস্তৃত জনপদ তেমনি এর দখলদারিত্ব নিয়ে সংঘটিত হয়েছে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ। বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সুয়েজ খাল নিয়ে লিখেছেন মুমিতুল চৌধুরী

কতটুকু জানি

পূর্ব ও পশ্চিমকে একসূত্রে যুক্ত করতে দ্বিতীয় সেনুস্রেট বা দ্বিতীয় রামেসাই শাসনামলে ছোট একটি খাল খনন করা হয়েছিল বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন। নীল নদের সঙ্গে লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে যোগাযোগব্যবস্থার জন্য কিংবদন্তি সেসোস্ট্রিস সম্ভবত একটি খাল খনন করেছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব ১৮৩০ সালের দিকে একটি সেচনালা নির্মাণ করা হয়। বন্যা মৌসুমে নদীর পানি সেই নালা দিয়ে নীল নদের পূর্ব উপকূলে গিয়ে পড়ত। খাল নির্মাণ করার দুশো বছর পরেও ক্লিওপেট্রা দেখলেন পূর্ব-পশ্চিমকে সংযুক্ত করতে পারে এমন কোনো নৌপথ নেই। কারণ তার সময়ে বন্যার পলি জমে নীল নদের পেলুসিয়াক শাখাটি প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অষ্টম শতাব্দীতে কায়রো ও লোহিত সাগরের মধ্যে চলাচলের জন্য একটি খাল ছিল। খালটি আধুনিক সুয়েজের কাছাকাছি এসে শেষ হয়েছিল। এই খালের নির্মাতা কে তা নিয়ে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ১৪৮৮ সালে বার্তেলোমিউডিয়াস দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে আসার একটি নৌপথ আবিষ্কার করেন। এর ফলে ভারতের মসলা পরিবহন সহজ হয়ে যায়। ভূমধ্যসাগরের একচেটিয়া বাণিজ্যের অবসান ঘটে। এর আগ পর্যন্ত ভেনিসের মসলা বাণিজ্য ছিল রমরমা। ১৭৯৮ সালের শেষ দিকে নেপোলিয়ন প্রাচীন জলপথের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন। নেপোলিয়নের নির্দেশে তখন উত্তর মিসরের প্রতœতত্ত্ববিদ, বিজ্ঞানী, মানচিত্র বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীদের একটি দল একযোগে তাদের কাজ শুরু করেন। তারা এ কাজে বেশ সফল হন। তাদের আবিষ্কার ও কাজের বিবরণ সমস্ত কিছু ‘ডেসক্রিপশন ডে ল’ ইজিপ্ট’ বইয়ে লিপিবদ্ধ আছে। পরবর্তী সময়ে ১৮০৪ সালে ফরাসি সম্রাট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরে নেপোলিয়ন লোহিত ও ভূমধ্যসাগর সংযুক্ত করে একটি খাল স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ভীষণ ব্যয়বহুল হওয়ায় সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ১৮৫৪ ও ১৮৫৬ সালে ফ্রেঞ্চ কূটনৈতিক ফার্ডিনান্ড ডে লেসেপস মিসর ও সুদানের খেদিব সায়েদ পাশার কাছ থেকে একটি ছাড়পত্র পান। ছাড়পত্রে বলা ছিল সব দেশি জাহাজ চলাচলের জন্য একটি খাল নির্মাণ করতে হবে। নির্মাণের পরে উদ্বোধনের দিন থেকে কোম্পানি ৯৯ বছরের জন্য এটি পরিচালনার সুযোগ পাবে। সাতটি দেশের ১৩ জন বিশেষজ্ঞ নিয়ে গঠিত কমিটি কাজ শুরু করে। মিসরে জরিপ ও বিশ্লেষণ শেষে খাল নির্মাণ ও ব্যবহারের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্যারিসে শুরু হয় এক আলোচনা। ১৮৫৬ সালের ডিসেম্বর মাসে এই আলোচনা থেকে একটি সর্বসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। সমস্ত অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ১৮৫৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর চালু হয় সুয়েজ খাল।

সুয়েজ নিয়ে যুদ্ধ

ফরাসি ও মিসরীয় সরকারের অর্থায়নে ১০ বছর কাজের পর ১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল খোলা হয়। খাল পরিচালনার দায়িত্ব পায় মিসরীয় কোম্পানি ‘ইউনিভার্সাল কোম্পানি অব সুয়েজ মেরিটাইম ক্যানেল’। ভূ-রাজনীতিতে খালটি কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি ভূমধ্যসাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে ক্ষুদ্রতম পথে সমুদ্র যোগাযোগ স্থাপন করে, একই সঙ্গে বাণিজ্যের পথ সহজ করে দেয়। বিশেষ করে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তি এই খাল ব্যবহার করে বেশ উপকৃত হয়। ১৮৭৫ সালে, ঋণ এবং আর্থিক মন্দার ফলে মিসর ব্রিটিশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন ডিইজরায়েলির কাছে খালের শেয়ার বিক্রি করতে বাধ্য হয়। তারা মাত্র ৪ মিলিয়ন পাউন্ডেরও কম মূল্যে খাল পরিচালনার ৪৪ শতাংশ শেয়ার নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে নেয়। খালের বিনিয়োগকারীদের বেশিরভাগই ছিল ফরাসি ব্যবসায়ী। ফলে সুয়েজের একপাশে ইসরায়েল ও অন্যপাশে মিসর হওয়া সত্ত্বেও ব্রিটেন ও ফ্রান্স তাদের প্রভাব জারি রাখতে সক্ষম হয়।

১৮৮২ সালে মিসরের আগ্রাসন এবং দখলের সঙ্গে, যুক্তরাজ্য মিসর দখল করে নেয় এবং সেই সঙ্গে খালের পরিচালনার ভার নিজের কাঁধে তুলে নেয়। ১৮৮৮ সালের ‘কনভেনশন অব কনস্টান্টিনোপল’ খালটিকে যুক্তরাজ্যের অধীনে একটি নিরপেক্ষ অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে। অটোমান শাসকরা আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়। কনভেনশনটি ১৯০৪ সালে কার্যকর হয়। একই বছর ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যা সুয়েজ খাল নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনায় একটি ভারসাম্য আনে।

যুদ্ধে সুয়েজ

নৌপরিবহনে সুয়েজ খালের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে যুদ্ধেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৯০৪-০৫ সালের রাশিয়া-জাপান যুদ্ধের সময় রাশিয়ান নৌবাহিনীর প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরে জাপান আকস্মিক হামলা করে। এর শোধ নিতে রাশিয়ানরা বাল্টিক সাগরে তাদের নৌবহর থেকে বাহিনী পাঠায়। কিন্তু জাপান ও ব্রিটেনের ভেতরে চুক্তি থাকায় ব্রিটিশরা খালের ভেতর দিয়ে রাশিয়ান নৌবহর যেতে দিতে

অস্বীকৃতি জানায়। এর ফলে নৌবহর আফ্রিকা ঘুরে আসতে বাধ্য হয় এবং জাপানি বাহিনী পূর্ব এশিয়ায় তাদের অবস্থান মজবুত করতে যথেষ্ট সময় পায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেন ও ফ্রান্স খালটি বন্ধ করে দেয়। জার্মান নেতৃত্বাধীন অটোমান বাহিনী ফেব্রুয়ারি ১৯১৫ সালে খাল উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। খাল রক্ষায় যুক্তরাজ্য ১ লাখ সৈন্য পাঠায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ব্রিটেন মিসর ও ইরাকে শক্তিশালী ব্রিটিশ প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করে। ব্রিটেনের সামরিক শক্তির প্রায় ৮০ হাজার সৈন্য সুয়েজ খালসহ বিশাল সামরিক কমপ্লেক্স এ অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিল। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটি ছিল। এটি ধীরে ধীরে এটি অ্যাংলো-মিসরীয় সম্পর্কের উত্তেজনার উৎস হয়ে ওঠে। যুদ্ধের পরে মিসরের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি একটি আমূল পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়। অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, মুদ্রাস্ফীতি এবং বেকারত্বের হার বেড়ে যায়। মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুড জনপ্রিয়তা পেতে থাকে এবং দেশটিতে ব্রিটেনের প্রভাব জনসাধারণের বিদ্বেষের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কারণ ইসরায়েল সৃষ্টিতে ব্রিটেন বড় ভূমিকা পালন করছিল। ব্রিটিশবিরোধী নীতির ফলে ব্রিটেনের সঙ্গে মিসরের সম্পর্ক ক্রমে শীতল হয়ে পড়ে। ১৯৫৬ সালের জুলাই মাসে মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আব্দেল নাসের ১২০ মাইল সুয়েজ খাল জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেন। সঙ্গে আংশিকভাবে নীল নদজুড়ে আসোয়ান বাঁধ নির্মাণের জন্য উদ্যোগ নেন। পশ্চিমা দেশগুলো এই বাঁধ নির্মাণে ও অর্থায়ন করতে অস্বীকৃতি জানায়। ইউরোপের ব্যবহৃত তেলের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সুয়েজের জলপথের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফ্রান্স আলজেরিয়ার উপনিবেশে নাসেরের বিরোধীপক্ষকে সমর্থন করে। ফ্রেঞ্চম্যান ফার্ডিনান্ড ডি লেসেপসের অধীনে নির্মিত খাল দখল নিয়ে তীব্র আপত্তি জানায়। ফ্রান্স ও ইসরায়েল একসঙ্গে গ্রেট ব্রিটেনে যোগ দেয়। দুদিন পরে, খাল রক্ষার ছদ্মবেশে অ্যাংলো-ফরাসি বাহিনী মিসরীয় লক্ষ্যবস্তুতে বোমাবর্ষণ শুরু করে। ১৮৬৯ সালে ৫ নভেম্বর ব্রিটিশ এবং ফরাসি প্যারাট্রুপার নেমে খাল দখল করতে শুরু করে।

জাতিসংঘ দ্রুত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাস করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং ইসরায়েলকে অস্ত্র প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন মিসরে অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ করেছিল। তারা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দেয়। মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক যুদ্ধের আশঙ্কায় প্রেসিডেন্ট ডুইট ডি. আইজেনহাওয়ার সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যাহারের জন্য ন্যাটো মিত্র ও ইসরায়েলকে নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দেন। ব্রিটিশ ও ফরাসি সৈন্য ডিসেম্বর ১৯৫৬ সালে মিসর ত্যাগ করেন। ১৯৫৭ সালের মার্চ মাসে ইসরায়েল সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যাহারের পর মিসর বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য খালটি পুনরায় খুলে দেয়।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব

সুয়েজ ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে লোহিত সাগরকে সংযুক্ত করেছে। এ খাল খনন করার আগে উত্তর আটলান্টিক ও উত্তর ভারতীয় মহাসাগরের সরাসরি কোনো যাত্রাপথ ছিল না। ফলে দক্ষিণ আটলান্টিক ও ভারতীয় মহাসাগরের দক্ষিণভাগ হয়ে প্রায় পনের হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে ঘুরে যেতে হতো। এটি উত্তর প্রান্তের উপকূল থেকে সুয়েজ শহরের পোর্টসেইড থেকে শুরু করে দক্ষিণ প্রান্তের পোর্ট টিউফিক পর্যন্ত বিস্তৃত। উত্তর ও দক্ষিণের সামুদ্রিক চ্যানেলগুলো বাদ দিয়েই ১৯৩.৩০ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই খাল। কেবল ২০২০ সালেই ১৮ হাজার ৫০০ জাহাজ সুয়েজ খাল অতিক্রম করেছে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫১.৫টি জাহাজ সুয়েজ খাল পার হয়। আন্তর্জাতিক পণ্য বাণিজ্যের ১২ শতাংশ সুয়েজ খাল দিয়ে পরিবাহিত হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তেল পরিবহনের জন্য খালটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পেট্রোলিয়াম ব্যবসায় নিয়ে গবেষণা করা ইতিহাসবিদ ড্যানিয়েল ইয়েরগিন এই সময়ের কথা লিখেছেন, ১৯৫৫ সালে হিসাব করে দেখা যায় খালের ভেতর দিয়ে যে জাহাজ চলাচল করে তার অর্ধেকই পেট্রোলিয়ামের জাহাজ। এর ফলে ইউরোপের দুই-তৃতীয়াংশ তেল এর মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে।

সে সময় পশ্চিম ইউরোপ মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন ২ মিলিয়ন ব্যারেল, খালের মাধ্যমে ১২ লাখ এবং পারস্য উপসাগর থেকে ভূমধ্যসাগরে পাইপলাইনের মাধ্যমে ৮ লাখ ব্যারেল আমদানি করে। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য থেকে দৈনিক আরও ৩ লাখ ব্যারেল আমদানি করে। যদিও এই পাইপলাইন ইরাক এবং পারস্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর তেলক্ষেত্রকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। ফলে রাজনৈতিক দিক দিয়ে এই নৌপথগুলো সব সময়ই অস্থিতিশীল। ব্রিটিশ নেতারা তাদের এখনো সুয়েজ খালের মধ্য দিয়ে সমুদ্রপথ ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। ২০০০ সালের মধ্যে ব্রিটেনে আমদানিকৃত তেলের মাত্র ৮ শতাংশ সুয়েজ খালের মধ্য দিয়ে কেপ রুট দিয়ে আসে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত