ফুসফুস ক্যানসার প্রতিরোধে সচেতন হোন

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০৩ এএম

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

নভেম্বর মাসকে বিশ্বব্যাপী ‘ফুসফুস ক্যানসার সচেতনতা মাস’ হিসেবে পালন করা হয়। লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষকে ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি, প্রাথমিক শনাক্তকরণের গুরুত্ব এবং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ সম্পর্কে সচেতন করা। ফুসফুস ক্যানসারের হার দেশে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুরুষদের মধ্যে এটি অন্যতম প্রধান ক্যানসার, তবে সাম্প্রতিক সময়ে নারীদের মধ্যেও এর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ধূমপান, বায়ুদূষণ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং অনিয়মিত জীবনধারা ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

ফুসফুস ক্যানসার কী?

ফুসফুস ক্যানসার হলো ফুসফুসের কোষের অস্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণহীন বৃদ্ধি, যা ধীরে ধীরে টিউমারে পরিণত হয়। এটি শুধু ফুসফুসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও ছড়িয়ে পড়তে পারে, যেমন লিভার, হাড়, মস্তিষ্ক ও অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি। ফুসফুস আমাদের শরীরের অক্সিজেন সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। কোষের নিয়ন্ত্রণহীন বিভাজন ফুসফুসের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ব্যাহত এবং দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করে। প্রাথমিক পর্যায়ে ফুসফুস ক্যানসার লক্ষণ প্রকাশ করে না, সচেতনতা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা অপরিহার্য।

কারণ

ফুসফুস ক্যানসারের প্রধান কারণ হলো তামাকজাত দ্রব্য। ধূমপানের মাত্রা ও সময়কাল বেশি হলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। পরোক্ষ ধূমপান বিশেষত শিশু ও গর্ভবতী মহিলাদের জন্য ক্ষতিকর। বায়ুদূষণ ও পেশাগত ঝুঁকি : রাসায়নিক গ্যাস, অ্যাসবেস্টস, ধাতব ধূলিকণা এবং কিছু কারখানার ধোঁয়া দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত করে। শহরে বাতাসে চগ২.৫, কার্বন মনোক্সাইড ও অন্যান্য দূষণ ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। পরিবারে পূর্বে ফুসফুস ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বেশি। রেডন গ্যাস ও বিকিরণও ফুসফুস ক্যানসারের কারণ হতে পারে। ফলমূল ও সবজি কম খাওয়া, প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খাওয়া। পর্যাপ্ত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিন গ্রহণ না করা। ব্যায়াম না করা, স্থূলতা ও অসুস্থ জীবনধারা দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমায়।

জটিলতা

ফুসফুস ক্যানসার শুধু ফুসফুসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, এটি সমগ্র দেহে জটিলতা সৃষ্টি করে। শ্বাসকষ্ট ও অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। টিউমার বায়ু চলাচল বাধাগ্রস্ত করে।

কফে রক্ত বা রক্তক্ষরণ হতে পারে। বারবার ব্রঙ্কাইটিস বা নিউমোনিয়া হতে পারে। লিভার, হাড়, মস্তিষ্ক বা অ্যাড্রেনাল গ্রন্থিতে ছড়িয়ে পড়লে মারাত্মক জটিলতা। স্নায়ু বা হাড়ে ছড়িয়ে পড়লে চলাচলে ব্যাঘাত।

প্রাথমিক লক্ষণ

  দীর্ঘদিন ধরে শুকনো বা কফযুক্ত কাশি   কফে রক্ত বা বাদামি দাগ  বুকে ব্যথা বা শ্বাস নিতে কষ্ট  শ্বাসকষ্ট ও ক্লান্তি,  খাবারে অরুচি ও ওজন হ্রাস,  কণ্ঠ ভাঙা বা গিলে অসুবিধা,  ঘন ঘন ফুসফুস সংক্রমণ,  উপসর্গ দেখা মাত্রই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

রোগ নির্ণয়

সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার সাফল্য অনেক বৃদ্ধি পায়। ১. চেস্ট এক্স-রে : প্রাথমিক স্ক্রিনিং।

২. সিটি স্ক্যান : টিউমারের আকার, অবস্থান ও বিস্তার বোঝার জন্য। ৩. বায়োপসি : কোষ সংগ্রহ ও মাইক্রোস্কোপে পরীক্ষা।

৪. ব্রঙ্কোস্কপি : ফুসফুসে ক্যামেরাযুক্ত টিউব দিয়ে নমুনা। ৫. চঊঞ স্ক্যান: ক্যানসার শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়েছে কিনা বোঝার জন্য। বয়স ৫০-এর বেশি বা দীর্ঘমেয়াদি ধূমপায়ীদের জন্য বছরে একবার লো-ডোজ ঈঞ স্ক্যান করানো উচিত।

চিকিৎসা

অস্ত্রোপচার : প্রাথমিক পর্যায়ে টিউমার বা আক্রান্ত অংশ কেটে ফেলা।  কেমোথেরাপি : ওষুধের মাধ্যমে ক্যানসার কোষ ধ্বংস।   রেডিয়েশন থেরাপি : উচ্চক্ষমতার বিকিরণ ব্যবহার।

 টার্গেটেড থেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি : নির্দিষ্ট জিন বা প্রোটিন লক্ষ্য করে ওষুধ।  পার্সোনালাইজড ট্রিটমেন্ট : রোগীর জিনগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত