এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন
শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ
প্রতি বছর ১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস ডে পালন করা হয়। এই দিনটি বিশ্বব্যাপী মানুষকে একত্রিত করে ডায়াবেটিসের স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং প্রতিরোধ, নির্ণয় ও চিকিৎসা উন্নত করার উপায় তুলে ধরতে। ২০২৫ সালের থিম ‘উরধনবঃবং অপৎড়ংং খরভব ঝঃধমবং’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ডায়াবেটিস ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলে। যদিও অনেকেই মনে করেন ডায়াবেটিস শুধু বড়দের সমস্যা, এটি যেকোনো বয়সেই দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই রোগকে ডায়াবেটিস মেলিটাস বলা হয়। এ অবস্থায় সাধারণত রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়। শৈশবে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় টাইপ-১ ডায়াবেটিস, যেখানে শরীর ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না এবং অনেক সময় হঠাৎ করে দেখা দেয়। শিশুদের আজীবন ইনসুলিন নেওয়া, নিয়মিত রক্তের গ্লুকোজ মাপা, সঠিক খাবার গ্রহণ এবং শারীরিক কার্যক্রমে অংশ নিতে হয়। স্কুলগুলোকে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে এবং প্রয়োজনীয় নমনীয়তা দিতে হবে। শিক্ষক ও পরিচর্যাকারীদের রক্তে শর্করা কমে গেলে এর লক্ষণগুলো চেনা জরুরি। পাশাপাশি মানসিক সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেক শিশু নিজেদের আলাদা মনে করতে পারে।
কিশোর বয়সে পৌঁছালে হরমোনগত পরিবর্তন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণকে জটিল করে তোলে। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অনিয়মিতভাবে ওঠানামা করতে পারে। এ সময় স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা থাকায় অনেক কিশোর নিয়মিত মাপজোক বা ওষুধ নেওয়ায় অবহেলা করতে পারে। স্ট্রেস, খারাপ ঘুম এবং অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রবণতাও বাড়ে। বন্ধুদের প্রভাব এবং সামাজিক লজ্জাবোধ আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পরিবার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের খোলা যোগাযোগ, স্ব-পরিচর্যার দক্ষতা শেখানো এবং নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা প্রয়োজন।
মধ্যবয়সে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। জিনগত প্রবণতা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়ামের অভাব, স্থূলতা এবং মানসিক চাপ এর প্রধান কারণ। কাজ এবং পারিবারিক দায়িত্বে¡র কারণে অনেকেই নিজেদের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে পারেন না। এ সময় উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং স্নায়ুর ক্ষতির মতো জটিলতা শুরু হতে পারে। নিয়মিত পরীক্ষা, সুষম খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যায়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মক্ষেত্রে সুস্থতা বিষয়ক কর্মসূচি এবং স্বাস্থ্যকর খাবারের সুযোগ দেওয়া সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
গর্ভাবস্থায় অনেক নারীর ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ধরনের ডায়াবেটিস দেখা দিতে পারে, যাকে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বলা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি প্রসবের পর স্বাভাবিক হয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। মা ও শিশুর সুস্থতার জন্য নিয়মিত প্রেনাটাল চেকআপ, রক্তের গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণ এবং খাদ্য নিয়ন্ত্রণ জরুরি। প্রসবের পরও ফলোআপ পরীক্ষা অপরিহার্য।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ সময় চোখ, কিডনি, স্নায়ু এবং হৃদয়ের জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে। অনেক প্রবীণ ব্যক্তি একাধিক দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভোগেন, ফলে ওষুধের সংখ্যা ও চিকিৎসা পদ্ধতির জটিলতা বাড়ে। শারীরিক সীমাবদ্ধতা ব্যায়াম কমিয়ে দিতে পারে এবং স্মৃতি শক্তি কমে গেলে স্ব-পরিচর্যা কঠিন হয়ে যায়। ওষুধ সংগঠকের মতো সরল উপায় এবং পরিচর্যাকারীর সহায়তা বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, সক্রিয় থাকা এবং নিয়মিত চেকআপ স্বাধীনতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
জীবনের প্রতিটি ধাপেই মানসিক স্বাস্থ্যের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘস্থায়ী রোগ নিয়ে বেঁচে থাকার কারণে উদ্বেগ, ক্লান্তি এবং হতাশা দেখা দিতে পারে। শিশু একাকিত্ব অনুভব করতে পারে, কিশোররা বিরক্ত হতে পারে এবং প্রাপ্তবয়স্করা দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে পারে। পরিবার, বন্ধু এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সহায়তা অত্যন্ত প্রয়োজন। কাউন্সেলিং এবং সাপোর্ট গ্রুপ মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক।
প্রযুক্তি এখন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণকে আরও সহজ করছে। ধারাবাহিকভাবে রক্তে গ্লুকোজ মাপার ডিভাইস, ইনসুলিন পাম্প এবং মোবাইল অ্যাপ দ্রুত সতর্কতা ও তথ্য ম্যানেজমেন্টকে সহজ করে। টেলিমেডিসিন দূরবর্তী এলাকায় বসবাসকারীদের জন্যও চিকিৎসা সহজ করেছে। তবে এগুলোর সঠিক প্রশিক্ষণ ও খরচ এখনো চ্যালেঞ্জ।
প্রতিরোধ এখনো বিশ^ব্যাপী ডায়াবেটিস মোকাবিলার মূল কৌশল। অনেক ক্ষেত্রে টাইপ-২ ডায়াবেটিস সুস্থ জীবনযাপনের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা যায়। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক চাপ কমানো ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। স্কুলগুলো শুরু থেকেই সুস্থ অভ্যাস শেখাতে পারে, কর্মক্ষেত্রগুলো সক্রিয় জীবনধারা উৎসাহিত করতে পারে এবং কমিউনিটি প্রোগ্রাম নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের গুরুত্ব প্রচার করতে পারে।
এ বছরের থিম আমাদের শেখায়, ডায়াবেটিস হলো একটি আজীবনের যাত্রা, যা বয়সের সঙ্গে বদলে যায়। স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে এবং সাশ্রয়ী চিকিৎসা ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার, নিয়োগকর্তা এবং সমাজের অংশগ্রহণ প্রতিটি ধাপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
