ইসলাম একটি জ্ঞানভিত্তিক জীবনব্যবস্থা। পবিত্র কোরআনের প্রথম অবতীর্ণ শব্দই হলো ‘ইকরা’ অর্থাৎ পড়–ন। পড়ার সঙ্গে লেখার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। ইসলামে লিখন শিল্প কেবল তথ্য সংরক্ষণের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি পবিত্র আমানত এবং ইবাদতের অংশ। ইসলামের দৃষ্টিতে লিখন শিল্পের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হলো।
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, লিখন বা কলমের ব্যবহার মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ নেয়ামত। মহান আল্লাহ সুরা আলাকের ৪ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেছেন, ‘যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন।’ আল্লাহতায়ালা ‘কলম’ নামে একটি স্বতন্ত্র সুরা নাজিল করেছেন এবং সেই সুরার শুরুতে কলমের কসম খেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নুন, শপথ কলমের এবং তারা যা লিখে তার।’ (সুরা কলম ১)
আল্লাহ যখন কোনো বিষয়ের কসম খান, তখন তা ওই বিষয়ের অপরিসীম গুরুত্বকেই প্রমাণ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে আরবরা মূলত মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ইসলাম এসে সেই ধারাকে লিখন শিল্পের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। বদরের যুদ্ধে শিক্ষিত বন্দিদের মুক্তির শর্ত ছিল দশজন মুসলিম শিশুকে লেখা ও পড়া শেখানো। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ইসলাম শুরু থেকেই জ্ঞান সংরক্ষণে লিখনকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআন আজ আমাদের হাতে অক্ষত অবস্থায় আছে লিখন শিল্পের কল্যাণে। অহি নাজিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নবীজি (সা.) তা অহি লেখকদের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। পরবর্তী সময়ে সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িরা লাখ লাখ হাদিস লিখে সংরক্ষণ করেছেন, যা আজ মুসলিম উম্মাহর পথপ্রদর্শক।
ইসলামি দাওয়াতের প্রসারে লিখন পদ্ধতি ছিল এক শক্তিশালী হাতিয়ার। রাসুলুল্লাহ (সা.) সমকালীন রাজা-বাদশাহদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে পত্র পাঠিয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে, দূরবর্তী মানুষের কাছে সত্যের বাণী পৌঁছাতে লিখন পদ্ধতি অপরিহার্য। পরবর্তী সময়ে ইমাম গাজালি, ইবনে সিনা বা ইমাম বুখারির মতো মনীষীদের লেখা গ্রন্থগুলোই শতাব্দী ধরে ইসলামের আলো ছড়িয়েছে। ইসলামে প্রাণীর ছবি আঁকা নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে মুসলিম শিল্পীরা লিখন শিল্প বা ক্যালিগ্রাফিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। পবিত্র কোরআনের আয়াতকে সুন্দর করে সাজিয়ে লেখা কেবল শিল্প নয়, বরং আল্লাহর কালামের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ এবং সওয়াবের কাজ হিসেবে গণ্য হয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে লিখন শিল্প কেবল নান্দনিক প্রকাশ নয়, বরং আধ্যাত্মিকতা, জ্ঞান সংরক্ষণ ও সভ্যতার ধারক। কোরআন শরিফের সংরক্ষণ থেকে শুরু করে স্থাপত্যে অলঙ্করণ পর্যন্ত লিখন শিল্প মুসলিম সমাজে এক অনন্য মর্যাদা লাভ করেছে। তাই বলা যায়, লিখন শিল্প ইসলামি সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র এবং বিশ্বসভ্যতার এক অমূল্য সম্পদ।
লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক
