নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়োজিত ‘হীরাঝিল আবাসিক এলাকা সমাজকল্যাণ সমিতির প্রশাসককে তাড়িয়ে চলছে চাঁদাবাজি। সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই সমিতির নাম পরিবর্তন, কার্যালয় দখল ও মনগড়া কমিটি করে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে হীরাঝিল সমাজকল্যাণ সমিতির নেতাদের বিরুদ্ধে।
এলাকার বাড়ি ও ফ্ল্যাট মালিকদের অভিযোগ, সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে বাড়িপ্রতি মাসে ৫০০ টাকা, ফ্ল্যাট প্রতি ২৫০ টাকা, দোকান প্রতি ৩৫০ টাকা করে চাঁদা আদায় করছে ভুয়া সমিতির নেতারা। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নিয়োজিত পরিচ্ছন্ন কর্মীদের কাছ থেকে মাসে ৯০ হাজার টাকা চাঁদা নিচ্ছেন তারা।
হীরাঝিলের বাসিন্দা আল হেরা ভবন মালিক শ্রমিকদলের কেন্দ্রীয় কমিটির অর্থ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক এমপি শামীম ওসমানের ঘনিষ্ট ইউসুফ রশিদ সভাপতি ও মফিজউদ্দিন মজু সাধারণ সম্পাদক হয়ে ২৩ সদস্যের মনগড়া কমিটি করেছে। তারা সমিতির আসল নাম পরিবর্তন করে ভুয়া নাম দিয়ে কমপক্ষে এলাকার ৫ শতাধিক বাড়ি, কয়েক হাজার ফ্ল্যাট ও ৫ শতাধিক দোকান থেকে লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করছে।
সমিতির যুগ্ম সম্পাদক হারুনুর রশিদ জানান, এলাকার সকল বাড়ি ও ফ্ল্যাট থেকে টাকা নেওয়া হয়না। ২৭০টি বাড়ি, ৩৩০টি ফ্ল্যাট ও ৩৮০টি দোকান থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে। পরিচ্ছন্ন কর্মীদের কাছ থেকে মাসে ৯০ হাজার টাকা নেওয়ার কথা স্বাীকার করেন তিনি। সে হিসেবে ২৭০টি বাড়ি থেকে ৫০০ টাকা করে মাসে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, ৩৮০টি দোকান থেকে ৩৫০ টাকা করে মাসে ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা, ৩৩০টি ফ্ল্যাট থেকে ২৫০ টাকা করে মাসে ৮২ হাজার ৫০০ টাকা আদায় হচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হীরাঝিল আবাসিক এলাকা সমাজকল্যাণ সমিতিটি সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে রেজিস্ট্রেশন করা। কার্যালয়টি হীরাঝিল প্রদান সড়কের এ/৫৬ নম্বর বাড়ির নিচ তলায়। সমিতির প্রতিষ্ঠাতা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হাবিবুল্লাহ হবুল। গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হবুলসহ সমিতির অধিকাংশ লোকজন এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। তখন তরুণ দল নেতা টিএইচ তোফা তার লোকজন নিয়ে সমিতির কার্যালয় দখল করেন। চাঁদাবাজির অভিযোগে টিএইচ তোফা গ্রেপ্তার হলে ইউসুফ রশিদের নেতৃত্বে বিএনপি সমর্থিত কিছু লোকজন সমিতির নিয়ন্ত্রণ নেন।
নারায়ণগঞ্জ সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ২০২৪ সালে সমিতির রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদ শেষ হয়। নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন কমিটি করে রেজিস্ট্রেশন নবায়নে প্রতিবন্ধকতা দেখা দিলে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দপ্তরের কর্মকর্তা মোহাম্মদ রিয়াজ উদ্দিনকে প্রশাসক নিয়োক করা হয়। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না নিয়ে ও প্রশাসক নিয়োজিত থাকা সত্ত্বেও সমিতির নাম পরিবর্তন ও নতুন সাইনবোর্ড লাগিয়ে কার্যালয় দখল করে এলাকায় চাঁদাবাজি, সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নকর্মীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় ও সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করায় ৭ দিনের মধ্যে জবাব দেওয়ার জন্য সভাপতি ইউসুফ রশিদকে গত ১২ জানুয়ারি নোটিশ প্রদান করেন প্রশাসক রিয়াজ উদ্দিন। নির্ধারিত সময়ে জবাব না দেওয়ায় গত মাসের ২৩ তারিখ আরেকটি নোটিশ প্রদান করা হয়।
জানতে চাইলে মোহাম্মদ রিয়াজ উদ্দিন বলেন, সমিতিটি বর্তমানে সঠিক নিয়মে চলছে না। দুটি নোটিশ করার পর জবাব পেলেও তা যথাযত নয়। সময় স্বল্পতার কারণে পরবর্তী প্রদক্ষেপ নিতে পারছি না। খুব শিগগিরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ বলেন, সমিতির কর্মকাণ্ড বিষয়ে শুনেছি। ইউসুফ রশিদসহ সমিতিতে যারা আছে তারা কেই বিএনপির কোনও পদ-পদবিতে নাই। ইসুফকে কখনও কোন দলীয় কর্মসূচিতে দেখি নাই। সমিতিটি বিএনপির দলীয় কোনও সংগঠন নয়। যে কারণে দলীয়ভাবে কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে চাঁদাবাজির বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের লোকজনকে অবহিত করব।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক মফিজ উদ্দিন মজু বলেন, প্রশাসক নিয়মিত কার্যালয়ে না আসায় কাজের অসুবিধা হচ্ছিল। তাই আগের নাম বাদ দিয়ে হীরাঝিল সমাজকল্যান সমিতি নাম দিয়ে নতুন কমিটি করে রেজিস্ট্রেশনের জন্য জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরে আবেদন করেছি। কিন্তু সমাজসেবা অধিদপ্তর রেজিস্ট্রেশন দিচ্ছেন না। চাঁদাবাজিসহ যেসব অভিযোগ তুলে প্রশাসক রিয়াজ উদ্দিন নোটিশ দিয়েছে তার জবাব দিয়েছি। আদায়কৃত টাকা থেকে দারোয়ান, অফিস স্টাফ, মসজিদের ইমাম, মোয়াজ্জেমের বেতন, অফিস ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও অন্য খরচ বাদে যে টাকা থাকবে তা সমাজের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।
সমিতির কার্যালয় ও ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়েও সভাপতি ইউসুফ রশিদকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার ফোন করলে রিং হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ আব্দুল বারিক বলেন, সমিতিটি সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতায় রয়েছে। কিছু জামেলা চলছে বলে জানতে পেরেছি। তবে চাঁদাবাজির বিষয়ে কেউ লিখিত অভিযোগ করলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
