নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় পেছালো জ্বালানি লোডিং

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৫২ এএম

শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় পাবনার রূপপুরে নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজনীয় লাইসেন্স বা নিরাপত্তা ছাড়পত্র ইস্যু করেনি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। ফলে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে আগামী ৭ এপ্রিল যে জ্বালানি লোড করার কথা ছিল তা হচ্ছে না। এতে করে দেশের প্রথম পারমাণবিক এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনও পিছিয়ে গেল কিছুটা।

জানতে চাইলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সব কাজ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ। এখন এটা রিভিউ করতে পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের হয়তো ২-৪ দিন সময় লাগবে। এরপর ফুয়েল লোডিংয়ের তারিখ ঘোষণা করা হবে। আশা করছি খুব দেরি হবে না, এপ্রিলেই ফুয়েল লোড করা সম্ভব হবে।’

রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট মিলে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রটি নির্মাণ করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা রসাটম।

প্রকল্পটির প্রথম ইউনিট ২০২৩ সালে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৪ সালে উৎপাদনে যাওয়ার কথা ছিল। কয়েক দফা সময়সীমা পিছিয়ে এ মাসের ৭ এপ্রিল জ্বালানি লোড করার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা ইস্যুর কারণে তা আটকে গেছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, জ্বালানি লোড করার আগে সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রতিটি ধাপ শেষে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ইস্যু করে থাকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। জ্বালানি লোড করার আগে লাইসেন্স নিতে গিয়ে দেখা যায় কেন্দ্রটির অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। এরপরই আপত্তি তোলে পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।

একটি সূত্র জানায়, লাইসেন্স নিতে রাশিয়ান ঠিকাদার এবং প্রকল্পের কর্মকর্তারা নানানভাবে চেষ্টা-তদবির চালায়। আপাতত লাইসেন্স নিয়ে জ্বালানি লোড করার পর বাকি কাজ শেষ করবে এমন আশ^াস দেওয়া হয়। কিন্তু পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছে শতভাগ নিরাপত্তা ছাড়া লাইসেন্স দেওয়া হবে না।

বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার গভীর রাত পর্যন্ত সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক চলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো সুরাহা না হওয়ায় জ্বালানি লোডের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়া হয় বলে সূত্র জানিয়েছে।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। সেজন্য প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ করা হয় নিখুঁতভাবে। শেষ মুহূর্তে ছোটখাটো কিছু সমস্যা থাকার কারণে অল্প কয়েকদিনের জন্য জ্বালানি লোডিং শিফট হচ্ছে।

প্রকল্প পরিচালক ড. কবীর হোসেন জানান, জ্বালানি লোডিংয়ের জন্য যেসব ডকুমেন্টস দেওয়ার কথা ছিল তা আমরা দিয়েছি। বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আমাদের কন্ডিশনাল লাইসেন্স দেবে; যদি আমাদের কোনো গ্যাপ থাকে। যেহেতু ওনারা রেগুলেটরি ইনডিপেনডেন্ট বডি, ওনাদের আরও কিছু অবজারভেশন আসছে। সেটা করতে আমাদের একটু সময় লাগবে।

‘মূলত সমস্যা হয়েছে ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম-ফায়ার মেজারমেন্টে। ফায়ার ফাইটিং ডিপার্টমেন্টে ওনারা ফারদার ইন্সপেকশনে আসবেন। ফায়ার ইন্সপেকশন করবেন। প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হয়তো সময় লেগে যেতে পারে। তার জন্য জ্বালানি লোডিংয়ে তারিখ শিফট করতে হতে পারে। মনে হয় ৭ এপ্রিলে হয়তো করতে পারব না’ বলেন তিনি।

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান জানান, গত নভেম্বরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কমপ্রিহেনসিভ সেফটি সিস্টেম টেস্ট সম্পন্ন হয়। ফিজিক্যাল স্টার্টআপের (জ্বালানি লোডিং) প্রস্তুতির সামগ্রিক অবস্থা নিরীক্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, রাশিয়ার শিল্প ও কর্মক্ষেত্র নিরাপত্তা তদারকি সংক্রান্ত সংস্থা-ভিও সেফটি তিনটি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিদল গত ৭ নভেম্বর থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের বিস্তৃত ও সুনির্দিষ্ট পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। এ সময় ২৫৭টি অবজারভেশন চিহ্নিত করা হয়। এসব অবজারভেশনের মধ্যে ফের কিছু ক্ষেত্রে পুনঃপরীক্ষা এবং অতিরিক্ত কিছু এসেসমেন্ট করার জন্য বলা হয়েছে। আশা করছি কয়েকদিনের মধ্যেই এগুলো সম্পন্ন হবে এবং তাড়াতাড়ি আমরা জ্বালানি লোডিংয়ের লাইসেন্স পেয়ে যাব।

এদিকে জ্বালানি লোডিংয়ের উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রসাটমের একটি টিম বাংলাদেশে এসেছে। রসাটমের উচ্চ পর্যায়ের আরও কয়েকজন প্রতিনিধি আসার অপেক্ষায় রয়েছে। এখন রসাটমের প্রতিনিধি দল রাশিয়া ফিরে নতুন তারিখ ঘোষণার পর আবার আসবে বলে সূত্র জানিয়েছে।

এর আগে প্রকল্পের রুশ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘এটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট’ একটি সময়সীমা দেওয়ার পর সরকার ৭ এপ্রিলের তারিখটি চূড়ান্ত করেছিল। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, জুলাই নাগাদ কেন্দ্রটি থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের কথা ছিল এবং ডিসেম্বরের মধ্যে ১২০০ মেগাওয়াট পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল। তবে জ্বালানি লোডিং পিছিয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই লক্ষ্যমাত্রাও পিছিয়ে যাচ্ছে।

প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি লোডিং শেষ করতে প্রায় এক মাস সময় লাগে। এরপর পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া (চেইন রিঅ্যাকশন) শুরু করতে আরও দুই মাস সময় প্রয়োজন হয়। সব মিলিয়ে জ্বালানি লোডিংয়ের পর পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে অন্তত ১০ থেকে ১১ মাস সময় লাগে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৬ বছরের প্রকল্প ৯ বছরেও শেষ না হওয়ার ক্ষতি অপূরণীয়। বিলম্বের কারণে বিদ্যুৎ না পেয়েও প্রতিদিন ১০-১২ কোটি টাকা সুদ গুনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এ ছাড়া সেখানকার কর্মীদের বেতন-ভাতা বাবদ ও অন্যান্য খাতে ব্যয় হচ্ছে নিয়মিত। বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতির আয়ুষ্কালও কমছে। কেন্দ্রটি চালু হলে সাশ্রয়ী দামে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যেত। সরকারেরও আয় বাড়ত। অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানির আমদানি ব্যয়ও কমত। কমত লোডশেডিং। বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুতে যত দেরি হবে ক্ষতি ততই বাড়বে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত