মশা মরে না, সংকটকালে তবুও ডিজেলের অপচয়

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৪ এএম

ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট যখন প্রকট, ‘ডিজেলের অভাবে চলছে না সেচপাম্প, ধানক্ষেত ফেটে চৌচির, উৎকণ্ঠায় কৃষক’ এমন খবর যখন আসছে সারা দেশ থেকে, তখনো ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশা নিধনের নামে প্রতিদিন অপচয় করছে ১০ হাজার লিটার ডিজেল। অথচ মশা নিধনের এই ব্যর্থ প্রয়াসের ফলে একদিকে মশার যন্ত্রণা, এমনকি মৃত্যুর হাত থেকেও রেহাই পাচ্ছে না নগরবাসী, ওই দিকে জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ নগরবাসী। হাজার হাজার কোটি টাকা ও জ্বালানি খরচ করেও মশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। নানা পদ্ধতি ও ওষুধ ব্যবহার করেও কোনো কূলকিনারা করতে পারছে না সরকারি সেবাদানকারী শীর্ষ সংস্থা দুটি। ফগিং মেশিন দিয়ে ওষুধ ছড়ানোর মাধ্যমে মশা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে দীর্ঘদিন থেকে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। অথচ ‘অকার্যকর’ পদ্ধতি থেকেও বের হতে পারছে না তারা।

ফগিং মেশিনের ডিজাইন দেখতে অনেকটাই কামানের মতো হওয়ায় ‘মশা মারতে কামান দাগা’ কথাটি প্রচলিত হয়েছে। বিকট শব্দ আর ধোঁয়া ছড়িয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকায় জানান দেওয়া হয়, মশা নিধনের জন্য কিছু একটা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মশা নিধনের এই পদ্ধতি দেশে অকার্যকর। রাস্তাঘাট বা খোলা জায়গায় কোনো কাজে আসে না। এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফগিং পদ্ধতি ইনডোরে কিছুটা কাজ করে। কিন্তু আউটডোরে অকার্যকর। এতে সাউন্ড হয়, ধোঁয়া উড়ে, মানুষ মনে করে কিছু একটা হচ্ছে। জাস্ট একটা আই ওয়াশ ছাড়া আর কিছুই নয়। দীর্ঘদিন ধরে এগুলো নিয়ে কথা হচ্ছে, কিন্তু জেনে বুঝেও এ থেকে কেউ বের হচ্ছেন না।

প্রায় একই কথা বলেন বাংলাদেশ প্রাণিবিজ্ঞান সমিতির সাবেক সভাপতি কীটতত্ত্ববিদ ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফগিং কাজ করে না। তবে বদ্ধ জায়গায় (যেমন আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং, গুদাম) কিছুটা কাজ করে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি কাজ করে না ঠিক, কিন্তু বন্ধ করে দিলে মানুষ বলবে সিটি করপোরেশন কোনো কাজ করছে না।

জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফগিং তেমন কাজ করে না, এটা সবাই জানে। কিন্তু এ থেকে বের হয়ে আসতে সময় লাগবে। আমরা এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশের মশক নিধন পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করছি। নগরবাসীকে মশা থেকে মুক্তি দিতে ভালো কার্যকর পদ্ধতি প্রয়োগ করতে আমরা বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, সামনে ডেঙ্গুর মৌসুম। এই মুহূর্তে পুরনো পদ্ধতি বাদ দিলে মশক নিধনের কাজ করা কঠিন হয়ে যাবে। আমরা সব বিষয় নিয়ম অনুযায়ী করব।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম মশা নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের একটি শহর সফর করেছিলেন। সেখান থেকে এসে ফগিং করে মশা মারার চেষ্টাকে ভুল পদ্ধতি বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। যদিও তার বাকি মেয়াদে তিনিও এই পদ্ধতি বন্ধ করেননি। অজুহাত হিসেবে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার কথা বলেছিলেন।

মশা না মরলেও ফগিং পদ্ধতির মাধ্যমে মশা নিধনের পেছনে যে ব্যয় হচ্ছে তার পুরোটাই অপচয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন দুটির ফগিং কার্যক্রমে প্রতিদিন অন্তত ১০ হাজার লিটার ডিজেল খরচ হচ্ছে। এই হিসাবে বছরে ৩৬ লাখ ৫০ হাজার লিটার ডিজেল ব্যয় হচ্ছে। এর বাইরে ফগার মেশিন ও জনবলের পেছনে মোটা অঙ্কের অর্থ খরচ তো আছেই। দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভায়ও একই পদ্ধতিতে মশা নিধনের চেষ্টা চলছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘ফগিং করে মশা মরে না’ এটা সবাই জানেন। এক সময় বিশেষজ্ঞরা এ কথা বলতেন, এখন সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও স্বীকার করেন। তারপরও ফগিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে সিটি করপোরেশনগুলো। কোনো কোনো সময় মেয়র, মন্ত্রী বা প্রশাসক ধোঁয়া উড়িয়ে মশক নিধন কার্যক্রমের উদ্বোধন করে থাকেন। এভাবে হাঁকডাক দিয়ে মশা মারার কাজ না করলে মানুষ মনে করে সিটি করপোরেশন কিছুই করছে না। তাই মানুষকে বোঝানোর জন্য ফগিং করা হয় বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, যেহেতু এই পদ্ধতিতে মশা মরছে না, আর তেলগুলোও সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না, সরকারের উচিত এই ব্যর্থ পদ্ধতি এবং অপচয় নিয়ে অনুসন্ধান করা। এতে একদিকে যেমন জ্বালানি সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে মশা মারার নামে কোটি টাকার বাণিজ্য বন্ধ হবে। এই পদ্ধতির পরিবর্তে সিটি করপোরেশন চাইলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে কার্যকর পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারে।

এদিকে, মশাবাহী রোগ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৪১৩ জন। আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন।

ডিজেল মূলত পরিবহন, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, নির্মাণ, পরিবহন ও নৌ খাতে ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে তেলের সংকট নেই বলা হলেও প্রতিদিন পাম্পগুলোর সামনে গাড়ির ভিড় আর তেলের জন্য হাহাকার মানুষের উৎকণ্ঠা বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে কৃষি খাতে এ সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। আমাদের জামালপুর জেলা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, পুরো জেলায় ডিজেলচালিত সেচপাম্পের ওপর নির্ভরশীল কৃষকরা মারাত্মক সংকটে পড়েছেন। প্রতিদিন তেলের পাম্প ও খুচরা দোকানে ঘুরেও তারা তেল সংগ্রহ করতে পারছেন না। সদর উপজেলার চরচন্দ্রা এলাকার কৃষক মোহাম্মদ বজলু শেখ জানান, ৯-১০ দিন আগে একবার জমিতে অল্প কিছু সেচ দেন। তপ্ত রোদে সেই পানি পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে। এখন পানির অভাবে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। ধানের চারা ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। ক্ষেতের পাশেই ডিজেলচালিত পাম্প থাকলেও অচল। কোথাও ডিজেল মিলছে না। এভাবে আর কয়েক দিন সেচ দিতে না পারলে বোরো আবাদে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দেবে। এমন পরিস্থিতিতেও মশা নিধনের নামে ফগিং পদ্ধতির পেছনে তেলের খরচ থেমে নেই।

ফগিংয়ের জ্বালানিতে টান : মশা নিধনের ফগিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের কাছে ডিজেল চেয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। গত ১১ মার্চ ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী বিপিসি চেয়ারম্যানের কাছে জরুরিভিত্তিতে মশা মারার কীটনাশক ‘ডেল্টামেথ্রিন’ তৈরির জন্য ২ লাখ লিটার ডিজেল বরাদ্দের আবেদন করেন। ওই চিঠিতে তিনি লিখেছেন, বর্তমানে মশার উপদ্রব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সময়মতো কীটনাশক পাওয়া না গেলে মশা নিধন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, যা জনদুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডিএসসিসি মশা নিধনে ‘ডেল্টামেথ্রিন ০.০১% ডব্লিউ/ডব্লিউ’ নামক কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। চলতি মৌসুমে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৬ লাখ ২১ হাজার ৫২০ লিটার ‘ডেল্টামেথ্রিন’ সরবরাহের জন্য ‘ফরোয়ার্ড ইন্টারন্যাশনাল (বিডি) লিমিটেড’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে জরুরিভিত্তিতে ২ লাখ লিটার কীটনাশক সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বলেছে, প্রাথমিক চাহিদা অনুযায়ী কীটনাশক প্রস্তুত করতে তাদের সমপরিমাণ অর্থাৎ ২ লাখ লিটার ডিজেল দরকার। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরকার জ্বালানি তেলের অবাধ বিক্রয় সীমিত করায় তারা বাজার থেকে প্রয়োজনীয় ডিজেল সংগ্রহ করতে পারছেন না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে মশা নিধনে ‘ম্যালাথিয়ন’ ও ‘ডেল্টামেথ্রিন’ নামের যে কীটনাশক ব্যবহৃত হয়, তা ভারত ও চীন থেকে আমদানি করা। এ কীটনাশক দেশে প্রক্রিয়াজাত করার পর ব্যবহারযোগ্য করা হয়। এ কাজে প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয় ডিজেল। ম্যালাথিয়ন কীটনাশক হিসেবে ব্যবহারের জন্য এতে ৯০ দশমিক ৮৬ শতাংশ ডিজেল মেশানো হয়।

কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে মশানিধন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দৈনিক প্রায় ১ হাজার ১০০ লিটার ‘ম্যালাথিয়ন ৫%’ প্রয়োজন হয়। মজুদ রয়েছে ২৭ হাজার লিটার। এ পরিমাণ কীটনাশক দিয়ে আগামী ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত কার্যক্রম চালানো সম্ভব। এর আগেই আরও ৩ লাখ ৬০ হাজার লিটার ‘ম্যালাথিয়ন’ সরবরাহের জন্য ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দিয়েছে ডিএনসিসি।

সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এমআর এন্টারপ্রাইজ গত মঙ্গলবার ডিএনসিসি প্রশাসক বরাবর এক চিঠি লিখে ডিজেল সংগ্রহের জন্য সহযোগিতা চেয়েছেন। চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি লিখেছে, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগবাহী মশা নিয়ন্ত্রণে ৩ লাখ ৬০ হাজার লিটার ‘ম্যালাথিয়ন ৫ শতাংশ আরএফইউ’ সরবরাহের জন্য তাদের ১৬ লাখ ২৯ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এই কীটনাশক তৈরিতে ৯০ দশমিক ৮৬ শতাংশ ডিজেল সহযোগী উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ডিএনসিসির কাক্সিক্ষত পরিমাণ কীটনাশক প্রস্তুতে ৩ লাখ ২৭ হাজার ৯৬ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। কিন্তু জ্বালানি নিয়ে সংকটময় এ সময়ে জনস্বার্থে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করার অনুরোধ জানান ঠিকাদার। তার এই অনুরোধে বিপিসির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ডিজেল সংগ্রহ করে দিয়েছে ডিএনসিসি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত