প্রশ্নবিদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের রণকৌশল

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৫৬ এএম

ইরানের আকাশে গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সামরিক বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর জন্য এক বিরল এবং বড় ধরনের আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ২০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথম যুদ্ধের ময়দানে কোনো মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হলো। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দাবি করছেন যে ইরানের সামরিক শক্তি ‘পুরোপুরি বিধ্বস্ত’ হয়ে গেছে, তখন এই ঘটনা তেহরানের পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতাকেই প্রমাণ করছে। ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী এখন পর্যন্ত ৭টি সামরিক বিমান হারিয়েছে। গত শুক্রবার ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করেছে। একই দিনে একটি এ-১০ বিমানকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যা পরে উপসাগরে বিধ্বস্ত হয়। হামলায় ভূপাতিত এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ পাইলটদের উদ্ধারে গিয়ে হামলার মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সামরিক হেলিকপ্টারও। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমানে থাকা দুজন ক্রু সদস্যের মধ্যে একজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ফোর্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিউস্টন কান্টওয়েল জানান, এর আগে সর্বশেষ ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় একটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট ২ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছিল। তিনি বলেন, গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্র মূলত এমন সব বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে যাদের শক্তিশালী বিমানবিধ্বংসী ব্যবস্থা ছিল না। ফলে এত দীর্ঘ সময় কোনো বিমান না হারানোটা ছিল অলৌকিক ঘটনার মতো। তিনি উল্লেখ করেন, আমরা এখানে প্রতিদিন যুদ্ধের ময়দানে উড়ছি এবং তারা প্রতিদিন আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ সপ্তাহে ইরান যুদ্ধে আমেরিকান বাহিনী ১৩ হাজারের বেশি মিশন পরিচালনা করেছে এবং ১২ হাজার ৩০০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ার ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। তবে রণক্ষেত্রের বাস্তব চিত্র বলছে, ইরান এখনো একটি শক্তিশালী ও সংকল্পবদ্ধ প্রতিপক্ষ। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি বরং এটি এখনো সক্রিয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্র্যাসিস-এর পরিচালক বেহনাম বেন তালেবলু বলেন, একটি নিষ্ক্রিয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মানেই ধ্বংস হওয়া ব্যবস্থা নয়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মার্কিন বিমানগুলো নিচু দিয়ে ওড়ার কারণে সেগুলো ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া সহজ হয়েছে। মার্ক ক্যানসিয়ান নামে একজন অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল জানান, বিমানটি ভূপাতিত করতে সম্ভবত কাঁধে রেখে ছোড়া কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন এবং এটিই প্রমাণ করে যে ইরান দুর্বল হলেও এখনো প্রাণঘাতী।

মার্ক ক্যানসিয়ান আরও বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন বিমানের ক্ষতির হার ছিল ৩ শতাংশ, যা এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রায় ৩৫০টি বিমানের সমান। সেই তুলনায় এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি অনেক কম হলেও এর একটি রাজনৈতিক দিক রয়েছে। তার মতে, আমেরিকার সাধারণ মানুষ ‘রক্তপাতহীন’ যুদ্ধে অভ্যস্ত। দেশের একটি বড় অংশ এই যুদ্ধ সমর্থন করে না, তাই তাদের কাছে যেকোনো একটি ছোট ক্ষতিও অগ্রহণযোগ্য। পাইলটদের প্রশিক্ষণে শেখানো হয় বিমান থেকে প্যারাসুট নিয়ে লাফিয়ে পড়ার পর কীভাবে নিজেদের অবস্থান উদ্ধারকারীদের জানানো যায়। তবে শত্রু পক্ষ সব সময় সেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার বা ভুল অবস্থান দেখানোর চেষ্টা করে। শুক্রবারের এই উদ্ধার অভিযানে মূলত হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছে, যা অন্য বিমানের তুলনায় ধীরগতির হওয়ায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অন্তত ১৬০টি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইরান। দেশটির সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী রেজা এলহামি এই দাবি করেছেন বলে ইরানি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। আলী রেজা এলহামি জানান, ইরানি ইউনিটগুলো সফলভাবে শত্রুপক্ষের বেশ কয়েকটি উন্নত যুদ্ধবিমান, ১৬০টিরও বেশি ড্রোন ও কয়েক ডজন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে। ভূপাতিত করা ড্রোনের মধ্যে এমকিউ-৯, হার্মিস ও লুকাস মডেলের ড্রোনও রয়েছে। এ সময় তিনি আরও জানান, ইরানি বাহিনী শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান ও ড্রোনের জন্য ওত পেতে আছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত