জাবিতে বৈশাখ বরণে প্রস্তুতি সম্পন্ন

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২০ পিএম

‘নববর্ষের ঐক্যতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপনে বর্ণাঢ্য কর্মসূচির হাতে নেয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন বিভাগেও দিনব্যাপী নানা আয়োজন করছে। বাংলার নতুন বছরকে বরণ করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসজুড়ে শুরু হয়েছে জোর প্রস্তুতি। চারুকলাসহ অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা দিনরাত কাজ করে তৈরি করছেন নানা লোকজ মোটিফ, রঙিন মুখোশ ও কাঠামো। বাঁশ, কাগজ ও রঙের সমন্বয়ে ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে বৈশাখের ঐতিহ্যবাহী উপস্থাপনাগুলো। প্রস্তুতির এই ব্যস্ততায় ইতোমধ্যেই উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে।

চৈত্রসংক্রান্তিতে ‘ব্যাঙের পানচিনি বিয়ে’ : চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ ও নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘ব্যাঙের পানচিনি বিয়ে’। গ্রামবাংলার লোকজ বিশ্বাস অনুযায়ী, খরার সময় ব্যাঙের বিয়ে দিলে বৃষ্টির আগমন ঘটে-এই ধারণাকে কেন্দ্র করেই প্রতিবছর আয়োজনটি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

চৈত্রসংক্রান্তি হলো বাংলা বছরের শেষ দিন, অর্থাৎ চৈত্র মাসের শেষ দিন। এই দিনটি পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করার প্রস্তুতির সময় হিসেবে পালিত হয়। ১৩ এপ্রিল বিকাল ৪টায় প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে চৈত্রসংক্রান্তির কর্মসূচির উদ্বোধন করা হবে। এরপর শুরু হবে ব্যাঙের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা, যা নতুন কলাভবন থেকে বিয়ের গান ও ঢাকের বাদনের মাধ্যমে বরযাত্রা বের হওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে পুরাতন কলাভবনে গিয়ে সম্পন্ন হবে। অনুষ্ঠানে কাঠ ও বাঁশের কাঠামোর ওপর কাগজ দিয়ে তৈরি বর ও কনে ব্যাঙের প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হয়। কনেপক্ষ প্রতীকীভাবে গেট আটকে দেয় এবং দেনমোহর নিয়ে রসিকতাপূর্ণ বাক্যবিনিময় হয়। দেনমোহর হিসেবে নির্ধারণ করা হয় ব্যাঙের প্রিয় খাবার ঝিঁঝিপোকা। পরে মুড়ি-বাতাসা দিয়ে আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা হয়।

ব্যাঙের বিয়ের পর পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠিত হবে ঢাকের বাদন ‘চৈত্রের ডাক’, বর্ষবিদায় সংগীত, পুতুলনাট্য, নৃত্য পরিবেশনা, যাত্রা, রামায়ণ গান ও মেঠো সুরের গানসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। এই আয়োজন শুধু লোকজ ঐতিহ্যের উপস্থাপন নয়, বরং পুরোনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণ করার একটি সাংস্কৃতিক রূপ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় নববর্ষে কর্মসূচি: বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড. এ বি এম আজিজুর রহমান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী,  মঙ্গলবার (১৪এপ্রিল) সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে উপাচার্য বাসভবনে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে দিনের কার্যক্রম শুরু হবে। এদিন সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে মৃৎ মঞ্চে প্রদীপ প্রজ্বালন ও সমবেত সংগীতের মাধ্যমে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করা হবে। পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। একই সময়ে চারুকলা বিভাগের তত্ত্বাবধানে বৈশাখী শোভাযাত্রা বের হবে, যা মৃৎ মঞ্চ থেকে শুরু হয়ে সেলিম আল-দীন মুক্তমঞ্চে গিয়ে শেষ হবে। শোভাযাত্রা শেষে টিএসসি এলাকায় বৈশাখী মেলা ও লোকজ আপ্যায়নের আয়োজন থাকবে। বিকাল ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সেলিম আল-দীন মুক্তমঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলবে। আবহাওয়া প্রতিকূল হলে অনুষ্ঠানটি জহির রায়হান মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগভিত্তিক আয়োজন : বাংলা বিভাগ মহুয়া মঞ্চে দিনব্যাপী কর্মসূচির আয়োজন করেছে। এতে বৈশাখী ফলাহার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা ও লোকজ ক্রীড়া অন্তর্ভুক্ত থাকবে। নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ ১৩ ও ১৪ এপ্রিল দুইদিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করছে। এতে সংগীত, নৃত্য, পুতুলনাট্য ও ঐতিহ্যবাহী নাট্য পরিবেশনা থাকবে। এছাড়াও,জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) ১৩ এপ্রিল ভেলাবাইচ ও কলাগাছে আরোহন প্রতিযোগিতা আয়োজন করবে। ১৪এপ্রিল থাকবে হালখাতা, মিষ্টিমুখ এবং সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

চারুকলা বিভাগের ৪৮ আবর্তের শিক্ষার্থী মো. ফেরদাউস এবারের পহেলা বৈশাখের আয়োজক কমিটির একজন সদস্য। তিনি জানান, নতুন বর্ষকে বরণ করে নিতে প্রস্তুতি প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। এবারও বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকো মোটিফ ঘোড়া, ষাড়, ব্যাঙ, বিভিন্ন রংবাহারী মুখোস থাকছে আমাদের আয়োজনে। আর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ব্যাঙের বিয়ের জন্যও আমাদের ব্যাঙও তৈরি হয়ে গেছে। ‎বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাহমিদা আক্তার বলেন, প্রতিবছরের ন্যায় এবারেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘চৈত্রের স্মৃতি, বৈশাখের গান ; মঞ্চে জাগুক বাংলার প্রান’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে উদযাপন করা হবে ২ দিনব্যাপী পহেলা বৈশাখ। বাঙালি জাতির যে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক যে চর্চা এবং সময়কালের সৃজনশীল উপস্থাপনা সবকিছুর সমন্বয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক ঐক্য ও আত্মপরিচয়ের যে  সুর, ছন্দ, এবারের আয়োজনের মধ্য দিয়ে তারই প্রতিফলন হবে। 

 

 

 

 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত