আশ্বাসেই ঘুরপাক পুলিশের দাবি

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৮ এএম

আগামী ১০ মে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে শুরু হচ্ছে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬। গত বছর সংক্ষিপ্তভাবে অনুষ্ঠান হলেও এবার অনেকটা জাঁকজমকভাবে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। ইতিমধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা এ নিয়ে বৈঠক করছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অনুষ্ঠান উদ্বোধন করবেন। পরের দিন হবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পুলিশের দরবার। দরবারে অন্যান্য বছরের মতো প্রায় একই দাবি উত্থাপন করা হবে। তবে বেশিরভাগ দাবিই আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। আওয়ামী লীগ সরকারের মতোই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও পুলিশের দাবিগুলো পূরণের আশ্বাস দিলেও কার্যকর করেনি কোনো দাবি। এবারও নতুনভাবে দাবি উত্থাপন করবে পুলিশ। পুলিশের আশঙ্কা অন্যান্য বছরের মতোই এবারও একই আশ্বাস মিলবে!

পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ সপ্তাহের সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠান হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুলিশ সপ্তাহ উদ্বোধন করবেন। আশা করি, ভালোভাবেই অনুষ্ঠান শেষ হবে।’

পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অন্যান্য বছরের দাবিগুলোর পাশাপাশি ময়মনসিংহ মহানগর পুলিশ প্রতিষ্ঠা, পুলিশের জন্য আরও নতুন তিনটি ইউনিট, পুলিশ লাইন তৈরি, ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও উচ্চপর্যায়ে পদ সৃষ্টিসহ অন্তত ২০টির মতো দাবি উত্থাপন করা হবে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের শীর্ষ মহলের কাছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দরবারে নানা সমস্যা নিয়ে কথা বলবে পুলিশ। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকা ও পুলিশ সদস্যদের হত্যাকা-ের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুলিশ সদর দপ্তরকে আলাদা করারও দাবি তোলা হবে। এ ছাড়া সাইবার সিকিউরিটি ও সামাজিক মাধ্যমকে ঘিরে অপরাধ ঠেকানোসহ শাস্তি নিশ্চিতে পুলিশের পক্ষ থেকে একটি স্বতন্ত্র ইউনিট গঠনের দাবি আসছে। পাশাপাশি পুলিশকে অধীনস্থ অধিদপ্তর আখ্যা না দিয়ে স্বতন্ত্র পুলিশ বিভাগ গঠন, পুলিশের জন্য স্বতন্ত্র ইউনিভার্সিটি অব ক্রাইম অ্যান্ড সিকিউরিটি গঠন এবং ডিএমপি কমিশনার ও র‌্যাব মহাপরিচালকসহ ১০টি গ্রেড-১ পদ সৃজনের দাবি তোলা হবে।

ওই কর্মকর্তারা বলেন, সাইবার অপরাধ রোধ ও তদন্তে পুলিশের শুধু ডিএমপিতে আলাদা ইউনিট থাকলেও জেলার কোথাও নেই। এ ব্যাপারে সেসব জায়গায় ডিবি পুলিশের একটি অংশ কাজ করে থাকে। একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে সাইবার ইউনিট গঠন করার বিষয়ে বৈঠকে উত্থাপন করা হবে। এর সঙ্গে যোগ করা হবে সাইবার ইউনিটে জেলায় নেতৃত্ব দেবেন একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। তার অধীনে দুজন এএসপি, চারজন ইন্সপেক্টর, আট এসআই ও ১৬ এএসআই থাকবে অপারেশনাল টিম হিসেবে। বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আনসার ব্যাটালিয়নের মূল দপ্তরকে বলা হয় সদর দপ্তর। কিন্তু পুলিশের সদর দপ্তরকে বলা হয় পুলিশ অধিদপ্তর। পুলিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বতন্ত্র বিভাগ গঠন করা হলে আইজিপি মন্ত্রণালয়ে বসেই সিনিয়র সচিবের ভূমিকা পালন করতে পারবেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানও অর্থ মন্ত্রণালয়ে বসে সিনিয়র সচিবের ভূমিকা পালন করেন। আইজিপির পদটি সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিবও একই পদমর্যাদার। পুলিশের ছুটি, বদলির মতো কাজগুলো এখন জননিরাপত্তা বিভাগের মাধ্যমেই করা হয়। পুলিশের দাবি হবে এসব কাজ আইজিপির অধীনেই থাকুক। পুলিশকে অধীনস্থ দপ্তর হিসেবে ভাবাটা কলোনিয়াল চিন্তা। ৩ লাখের বেশি সদস্যের এই বাহিনীকে পৃথক বিভাগ বা স্বতন্ত্র অধিদপ্তরও করতে বলা হবে। বিশ্বের অন্য দেশগুলোতে নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশের জন্য স্বতন্ত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাংলাদেশেও ফরেনসিক কিংবা সাইবার সিকিউরিটি, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমন, বিট পুলিশিং, জেন্ডার ইকুয়েলিটি পুলিশিংয়ের জন্য পুলিশ ইউনিভার্সিটি বা ইউনিভার্সিটি অব ক্রিমিনাল বা ক্রাইম অ্যান্ড সিকিউরিটি নামে আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের দাবিও উত্থাপন করা হবে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, আগামী ১০ মে চার দিনব্যাপী পুলিশ সপ্তাহ শুরু হবে। সেদিন রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে উদ্বোধন শেষে সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ কাজের জন্য ১১৫ জন পুলিশ সদস্যকে বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) ও রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক (পিপিএম) দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার সর্বোচ্চ ৪০০ জনকে বিপিএম, পিপিএম পদক দিয়েছিল। ২০২৩ সালে ১১৭ জন, ২০২২ সালে ২৩০ জনকেও এ পদক দেওয়া হয়। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। আগামী ১৩ মে পুলিশ সপ্তাহ শেষ হবে। বিগত বছরগুলোয় সাধারণত জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারিতে পুলিশ সপ্তাহ হতো। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ায় এবার অনুষ্ঠানটি পেছানো হয়। ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোনা জেলা নিয়ে ময়মনসিংহ বিভাগ গঠন করা হয়। ২০১৮ সালে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন গঠিত হয়। ১৮ লাখ ৯৮ হাজার ৬৬৩ জনসংখ্যার ময়মনসিংহ মহানগরকে জেলা পুলিশ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে পুলিশ সদর দপ্তর। বর্তমানে ময়মনসিংহে দায়িত্ব পালন করছে জেলা পুলিশ। বিভাগীয় শহরটি মহানগর পুলিশের অধীনে নিতে চাচ্ছে পুলিশ। এ ছাড়া পুলিশ সদর দপ্তর নতুন তিনটি ইউনিট গঠন করতে প্রস্তাব তৈরি করেছে। তার মধ্যে পরিবেশ পুলিশ ইউনিট গঠনের প্রস্তাব আসছে। ওই প্রস্তাবে বলা হবে,  নদী-খাল-বন দখল, বালু-পাথর উত্তোলন, ইটভাটার মাধ্যমে বায়ুদূষণ, পাহাড় কাটাসহ বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধে কাজ করছে পুলিশ। তবে বিশেষ একটি ইউনিট থাকলে এ বিষয়ে আরও নজরদারি করতে পারবে। এ ছাড়া আইজিপির পদটিকে ফোর স্টার করার দাবি তোলা হবে। বর্তমানে পুলিশের চারটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র (পিটিসি) রয়েছে। পিটিসির সংখ্যা বাড়িয়ে হবিগঞ্জ ও বরিশালে আরও দুটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র করার প্রস্তাব করা হবে। এ ছাড়া থানা, ফাঁড়ি, তদন্তকেন্দ্র, সাবজোন ভাড়া বাড়ি থেকে বের হয়ে নিজস্ব স্থাপনা, ভবন তৈরি ও বগুড়ায় শিল্প পুলিশের একটি জোন করার প্রস্তাব দেওয়া হবে।

পুলিশ সূত্র জানায়, সরকারি অন্যান্য দপ্তরে ৮ ঘণ্টা ডিউটি করতে হয়। কিন্তু পুলিশের ডিউটির নির্ধারিত কোনো সময় নেই। অনেক ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টাও কাজ করতে হয়। পুলিশ সদস্যদের ৮ ঘণ্টার অতিরিক্ত সময়ের জন্য ওভারটাইম ভাতা দেওয়ার দাবি তোলা হবে এবারও। ওভারটাইম দেওয়া দূরের কথা, অতিরিক্ত ছুটি পর্যন্ত দেওয়া হয় না। অথচ সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত ছুটি ও ভাতা পেয়ে থাকে। সরকারের উপসচিবসহ তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা, সশস্ত্র বাহিনীর মেজর বা সমমানসহ তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা বিনাসুদে গাড়ির ঋণ সুবিধা পেয়ে থাকেন। পুলিশ সুপারসহ তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। পুলিশ সুপার পদমর্যাদাসহ তদূর্ধ্ব পদের কর্মকর্তাদের গাড়ির জন্য বিনাসুদে ঋণ দেওয়ার দাবি উত্থাপন করা হবে। উপকূলীয় থানা ও দ্বীপ এলাকায় কর্মরত পুলিশ সদস্যদের জন্য দ্বীপাঞ্চল ভাতার দাবি করা হবে। এর আগেও একই দাবি করা হয়েছিল। পার্বত্য এলাকায় পুলিশ সদস্যরা দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করায় তাদের প্রণোদনার অংশ হিসেবে মূল বেতনের ৩০ শতাংশ অনধিক ৩ হাজার টাকাহারে পাহাড়ি ভাতা পান। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা সিলিং বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সিলিং তুলে দিলে পার্বত্যাঞ্চলে কর্মরতদের কাজের আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে। ট্রাফিক পুলিশে কর্মরত সদস্যরা সরাসরি সড়কে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। শব্দ ও বায়ুদূষণ এবং সড়ক দুর্ঘটনার মতো ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে হয় তাদের। ট্রাফিকে দায়িত্বরত সদস্যরা উচ্চরক্তচাপ ও শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভোগে থাকেন। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে অনেক ট্রাফিক সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন, কেউ বরণ করেছেন পঙ্গুত্ব। এ কারণে ট্রাফিক ভাতা বাড়ানোর দাবি তোলা হবে পুলিশ সপ্তাহে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতি বছর পুলিশ সপ্তাহে দাবি তোলা হলেও আসলে কিছুই কার্যকর হয় না। আশ্বাসের মধ্যেই থাকে আমাদের দাবিগুলো। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিগত কয়েকটি পুলিশ সপ্তাহে পরিদর্শকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে দাবি উঠেছে। ইন্সপেক্টর থেকে আইজিপি পর্যন্ত সবাইকে ঝুঁকিভাতার আওতায় নিয়ে আসতে দাবি করা হয়েছিল অতীতে। এবারও এ দাবি করা হবে। তবে আমরা হতাশ। পুলিশকে নিয়ে কোনো সরকাই চিন্তা করে না। রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে শুধু আমাদের ব্যবহার করে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত