পশুর হাটের রাজনীতি ও অর্থনীতি

আপডেট : ০৫ মে ২০২৬, ০২:৪১ এএম

কোরবানির পশুর হাটগুলো কেবল ব্যবসা নয়, বরং স্থানীয় রাজনীতি ও অর্থনৈতিক শক্তির প্রদর্শনী হিসেবে কাজ করে। সময় বদলাক, সরকার বদলাক কোরবানির পশুর হাটের দিকে লাল চাহনি বদলায় না। হোক মৌসুমি, তবে লাভ বিশাল। দিন কয়েকেই অনেক কাঁচা টাকা আয়ের মোক্ষম সিজন। ছোট-বড় আন্ডারওয়ার্ল্ড এবার আগে থেকেই চোখ দিয়েছে এখানে। খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন নামে এই ঢাকায় মারাও পড়েছে তাদেরই একজন। তার জম নেমেছে, বসিলা পশুর হাট নিয়ে বিরোধের জেরে। পরিবারের পক্ষে, তার বড় ভাই রিপনের নিউমার্কেট থানায় করা মামলায় তা উল্লেখও আছে। অভিযোগে বসিলা পশুর হাটের ইজারা নিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, বাদল ওরফে কিলার বাদল ওরফে কাইলা বাদল, শাহজাহান ও রনি ওরফে ডাগারি রনির সঙ্গে বিরোধের উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্রঘোষিত টপ টেরর টিটন, দীর্ঘদিন জেলে থাকার পর ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট জামিনে মুক্ত হন। দীর্ঘসময় কারাভোগের পর তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে, অতীতে পরিবারের সম্মানহানি ও আর্থিক ক্ষতির জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন। একইসঙ্গে সৎপথে জীবন গড়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। কিন্তু না, তাদের ভালো হয়ে যাওয়া বা সৎপথের পথরেখা তাদের মতোই। কয়েকদিন আগে টিটন তার ভাইকে জানিয়েছিলেন, তিনি হাটের ইজারা সংক্রান্ত কাগজপত্র (শিডিউল) কিনেছেন এবং ব্যবসা করতে চান।

২৬ এপ্রিল টিটন তার ভাইকে জানান, বছিলা পশুর হাটের ইজারা নিয়ে পিচ্চি হেলাল, বাদল, শাহজাহান ও রনির সঙ্গে তার বিরোধ চলছে। পরদিন ২৭ এপ্রিল জানান, বিরোধ মিটিয়ে একসঙ্গে কাজ করার জন্য তাকে একটি মিটিংয়ে ডাকা হয়েছে। এরপরই মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে সাঙ্গ হয় তার ভবলীলা। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পশুর হাটের ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, এমনকি প্রাণহানি নতুন নয়। গত বছর কয়েক ধরে দেশে গবাদি পশুর বাম্পার উৎপাদনে, এ ব্যবসায় ক্রমেই ভিন্নতা আসছে। এক সময় যারা ভারতীয় গরু আমদানি, গরুর গাড়ি আটকানোর কারবার করত তারাও ইজারা বা সাব-ইজারায় জড়াচ্ছে। চামড়া, বর্জ্য ইত্যাদি কালেকশনেও আয়ের রাস্তা পেয়েছে। এবারও কোরবানির বাজার দেশীয় পশুতে ভরে যাওয়ার বার্তা মিলেছে। চাহিদার চেয়েও বেশি গরু রয়েছে খামারে। গৃহস্থ পর্যায়ে তো আছেই। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিন উর রশিদের দেওয়া তথ্য বলছে, ‘এ বছর কোরবানির জন্য ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশুর সরবরাহ পাওয়া যাবে। চাহিদা রয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশুর।’ আলাদা হিসাবও দিয়েছেন মন্ত্রী। মানে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু ও মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল ও ভেড়া এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকায়, চলতি বছর দেশে ২২ লাখ ২৭ হাজারের বেশি গবাদিপশু উদ্বৃত্ত থাকতে পারে।

দেশের তালিকাভুক্ত ৩ হাজার ৬০০টি হাটে বিক্রি হবে এসব পশু। শেষ দিকে তালিকার বাইরে নানা জায়গায় বসে যাবে আরও অনেক হাট। রাজধানী ঢাকায় থাকবে ২৭টি হাট। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১১টি হাট বসবে। সীমান্তবর্তী পশুর হাট বন্ধের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সীমান্তঘেঁষা কিছু হাটের মাধ্যমে বিদেশি পশু প্রবেশ করার সুযোগ না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কোরবানির পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি বন্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে থাকবে, ইজারায় ঠেকবাজি চলবে না ইত্যাদি হুঙ্কার দেওয়া হলেও এবারের বাস্তবতা ভিন্ন। প্রায় দুই দশক ধরে রাজধানীর পশুর হাট ইজারায় একটি সিন্ডিকেটের প্রভাব থাকায় খোলা প্রতিযোগিতা ছাড়াই, তুলনামূলক কম মূল্যে হাট ইজারা দেওয়া হতো। রাজধানীতে এবার কোরবানির অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারায় সরকারি মূল্য কমানো হলেও, দরপত্রে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। সেই প্রতিযোগিতার বড় অংশজুড়ে রয়েছে বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের অংশগ্রহণ। যাত্রাবাড়ীর কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বড় হাটের সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১ কোটি টাকা কম। কিন্তু দরপত্রে অংশ নেওয়া চারটির মধ্যে তিনটিতেই,  ৪ কোটি টাকার বেশি দর এসেছে। সর্বোচ্চ দর ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। দরপত্র সংগ্রহকে কেন্দ্র করে কয়েক জায়গায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শ্যামপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা পরিস্থিতির উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় আগে থেকেই প্রভাব বিস্তার করতে সক্রিয় রয়েছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো, যারা হাটের নিয়ন্ত্রণ নিতে মাঠ দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। হাট-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন পরিস্থিতি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাদের আশঙ্কা, চাঁদাবাজি বাড়বে, নিরাপত্তাহীনতায় ক্রেতা কমে যেতে পারে এবং প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে সহিংসতা অনিবার্য হয়ে উঠবে। ডিএসসিসির প্রায় সব হাটেই এ অবস্থা। নিয়ন্ত্রণেও এবার বড় পরিবর্তন। টানা সাড়ে ১৫ বছরের মতো রাজধানীর পশুর হাটগুলো ছিল, আওয়ামী লীগ ঘরানার নেতাদের দখলে। প্রতিযোগিতা ছাড়া তুলনামূলক কম মূল্যে হাটগুলো ইজারা দেওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হতো দুই সিটি করপোরেশন। আবার সিন্ডিকেটের কারণে, অনেক হাটে খাস আদায়ও করা হতো। প্রতিযোগিতা দূরে থাক, তখন বিএনপি বা জামায়াতের কোনো নেতা দরপত্র কেনার সাহসও দেখাননি। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিএনপির নেতাকর্মীরা হাটের ইজারা নিয়েছেন। তবে সে সময় কিছু কিছু হাটে জামায়াত, এনসিপি ও গণঅধিকার পরিষদের নেতাদেরও শরিকানা ছিল। এবার প্রতিযোগিতার ফলে সিটি করপোরেশন কিছুটা লাভবান হচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যেও অনেকগুলো হাটের নাম পরিবর্তন করে সরকারি মূল্য তুলনামূলক কম ধরা হয়েছে। এটিও একটি সিন্ডিকেট চক্রের মাধ্যমে হয়েছে বলে অভিযোগ। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গত বছর বিএনপি নেতারা প্রভাব বিস্তার করেন। এবার জামায়াতও হাত বাড়িয়েছে। প্রতিযোগিতায় তারা শরিক হয়েছে। এই প্রতিযোগিতা কখনো সংঘর্ষে গড়িয়েছে।

যাত্রাবাড়ী এলাকায় দরপত্র সংগ্রহকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে, পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করতে হয়। একদিকে প্রতিযোগিতা, আরেক দিকে সংঘাতের নমুনা।  বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের সক্রিয় অংশগ্রহণে হাট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা বাড়ার সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমন হাট ইজারা প্রক্রিয়াকে ঘিরে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে বড় রকমের গোলমালও বাধতে পারে। এখন পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণের হাটগুলোতে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে জামায়াত-এনসিপি মিলে বেশ শক্ত-সামর্থ্যবান। উত্তরে বিএনপির একচেটিয়া আধিপত্য। দাপট-প্রভাব যে-ই দেখাক এবার যে প্রতিযোগিতাটি এসেছে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে, সরকারের অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার একটি ধারা তৈরি হবে। সেই লক্ষণ রয়েছে। ডিএসসিসির ১২টি অস্থায়ী হাটের দরপত্র বাক্স খোলা হয়। ইজারাদার ও তাদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে দরপত্রগুলো যাচাই-বাছাই করে সর্বোচ্চ দরদাতা নির্ধারণ করা হয়। যেসব হাটে সর্বোচ্চ দরদাতা পাওয়া যায়নি, সেগুলো দ্বিতীয় ধাপে টেন্ডারে যাবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। তাদের মতে, এ বছর বিএনপি নেতাদের পাশাপাশি জামায়াত নেতারাও হাটের ইজারা পাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামার কারণে ভালো দর পাওয়া গেছে। এর বিপরীতে মাঝে অন্য কিছু ঘটতে থাকলে তা হবে বেদনার। গত বৃহস্পতিবার ইজারার দর উন্মুক্ত করা ডিএসসিসির হাটের মধ্যে দুটি হাটে সিন্ডিকেটের কারণে কোনো দরই জমা পড়েনি, আরেকটি হাটে সরকারি মূল্যের চেয়েও দর কম পড়েছে। তা ছাড়া কৌশলে হাটের নাম পরিবর্তন করে সিটি করপোরেশন থেকেই দর কমিয়ে ধরা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে ডিএনসিসির দুটি হাটে একটি করে দরপত্র জমা হয়েছে আর চারটিতে কোনো দরপত্রই পড়েনি। সব মিলিয়ে ঢাকার ৯টি হাট সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে। এ থেকে উত্তরণ দরকার। বিশেষ করে, হাটের নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজি নিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের তৎপরতা সহিংসতার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অবৈধ হাট বসানো ও ভারতীয় পশু চোরাচালান বন্ধে, বর্ডার জোনসহ সব জায়গায় কঠোর অবস্থান অবশ্যই স্বস্তির। তবে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে, তা পুরোপুরি বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একটা সময় পর্যন্ত ভারত থেকে প্রচুর গরু আমদানির কারণে খামারিরা লোকসানে পড়েছেন। আশা করা যায়, সেই ধারা আর ফিরবে না। সতর্কতার অংশ হিসেবে বর্ডার সাইডের বাজারগুলো ডাক না দেওয়া অবশ্যই একটি কাজের কাজ হয়েছে। কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতির বিষয়টি ভাবনায়  নিতেই হয়। এটি খামারি, গ্রামীণ ছোট উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর জন্য একটি মেগা-অর্থনৈতিক তৎপরতা হয়ে উঠেছে। কোরবানিকেন্দ্রিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার প্রায় ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের। টাকার অঙ্কে যা ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি। বিশ্বজুড়ে মুসলিমপ্রধান ও উল্লেখযোগ্য মুসলিম জনসংখ্যার দেশগুলোতে প্রতি বছর ধর্মীয় এ উৎসবটি পশুপালন ও সংশ্লিষ্ট খাত দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় প্রভাব রাখে। যথারীতি আসন্ন কোরবানিকে সামনে রেখে দেশে বিভিন্ন বাণিজ্যিক খামার, গৃহস্থালিতে বিপুল পরিমাণ পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। দেশে ঈদুল আজহাকে ঘিরে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সক্রিয় হয়, তা কয়েক দিনের মধ্যেই হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেনে রূপ নেয়। পশুপালন, পরিবহন, হাট ব্যবস্থাপনা, চামড়া প্রক্রিয়াকরণসহ পুরো ভ্যালু চেইনজুড়ে এ অর্থ প্রবাহিত হয়। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া শক্তিশালী ‘সার্কুলার ইকোনমি’র প্রবাহ যোগ হয় গোটা দেশের অর্থনীতিতে। বাংলাদেশে কোরবানির পশুর বাজার বড় করার যথেষ্ট কারণ ও উপাদান রয়েছে।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত