বাংলাদেশে প্রধানত আউশ, আমন ও বোরো এই তিন ধরনের ধান চাষ হয়। আউশ চৈত্র-বৈশাখ মাসে বুনে আষাঢ়-শ্রাবণে কাটা হয়। আমন জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ে রোপণ করে অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে কাটা হয় আর বোরো ধান কার্তিক-অগ্রহায়ণে রোপণ করে কাটা হয় চৈত্র-বৈশাখ মাসে। দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষক বোরো ধান আবাদ করেছিলেন। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে বিভিন্ন জেলায় হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় অধিকাংশ ধান নষ্ট হয়েছে। তলিয়েছে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান। দুর্ভাগ্য আষ্টেপৃষ্ঠে আটকে ফেলেছে কৃষকদের। তারা দুশ্চিন্তায় সময় পার করছেন। কেউ মহাজনের কাছ থেকে, আর্থিক ঋণ নিয়ে ক্ষেতে ধান লাগিয়েছিলেন। স্বপ্ন ছিল, এগুলো বিক্রি করে সব দেনা শোধ করবেন, বাঁচাবেন সংসার। কিন্তু সর্বনাশা পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি এবং বঁাঁধ ভেঙে হঠাৎ বন্যার কারণে হাওরজুড়ে কৃষক ভয়ংকর সংকট, দুর্ভাবনায় পড়েছেন। যদিও এরইমধ্যে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ৩ মাস সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য বলছে, ৭টি জেলার হাওরগুলোয় ৪৬ হাজার ৭৩০ হেক্টর জমির ধান পানিতে ডুবে গেছে। এ ধান কাটতে না পারলে, অন্তত ২ লাখ টন চালের উৎপাদন কম হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অধিকাংশ হাওর এখন নিমজ্জিত। ৭টি জেলার গড়ে ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ ধান এখনো পানির নিচে রয়েছে। এরই মধ্যে পাকা ধান পচে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। শুধু হাওরগুলোতেই এ বছর ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। সরকারের প্রতিবেদন বলছে, হাওরগুলোতে প্রতি হেক্টরে গড়ে ৪ দশমিক ৪৭ টন চাল উৎপাদন হওয়ার কথা। এ হিসাবে ৪৬ হাজার ৭৩০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতির মুখে পড়লে, কমপক্ষে ২ লাখ ৮ হাজার টন ধানের উৎপাদন কমে যেতে পারে। জানা যাচ্ছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে। সেখানে ১৪ হাজার ৩৭১ হেক্টর জমির ধান ডুবে গেছে, যা ওই অঞ্চলের হাওরগুলোতে মোট আবাদের ৮ দশমিক ৭০ শতাংশ। এরপরই রয়েছে নেত্রকোনা। সেখানে ১১ হাজার ৫২২ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা মোট আবাদের ২৮ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। আবার বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে কিশোরগঞ্জের হাওরে। সেখানে ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর জমির ধান তলিয়েছে।
কৃষি বিভাগ হাওরভুক্ত সাতটি জেলা থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ে কাজ করছে। তালিকা চূড়ান্ত হলে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। ডিএইএর মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম জানাচ্ছেন, ‘ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব শেষ হয়নি। ডুবে থাকা ধান অনেকে কাটার চেষ্টা করছেন। সে ক্ষেত্রে কৃষক কিছু ধান সংগ্রহ করতে পারবেন। এগুলো বিবেচনায় নিয়ে ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। পরে তা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।’ কিন্তু তারপর? কৃষি বাঁচলে, দেশ বাঁচবে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠি হলেন কৃষক। তারা স্বস্তিতে না থাকলে, উৎপাদন হ্রাস পাবে। এর ফলে দেখা দেবে, খাদ্য সংকট। তখন বাধ্য হয়ে চাল আমদানি করতে হবে। অন্যদিকে, অর্থনীতিতে যেমন চাপ পড়বে তেমনি বিভিন্ন পণ্যমূলের বাজার আরও অশান্ত হয়ে উঠবে। যে কারণে কালক্ষেপণ না করে, দ্রুত সমন্বিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকারকে। শুধু কৃষি মন্ত্রণালয় এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। এর সঙ্গে বাণিজ্য এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও বিকল্প চিন্তা করতে হবে। না হলে আসন্ন সংকট কাটিয়ে ওঠা দুষ্কর।