অপরাধ প্রবণতা বাড়ার কারণ

আপডেট : ০৫ মে ২০২৬, ০৩:৩৩ এএম

ইসলাম মানুষকে সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে বসিয়েছে। মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং প্রতিটি মানুষের মধ্যে স্বভাবজাত একটি সৎ প্রকৃতি দিয়ে পাঠিয়েছেন, যাকে ইসলামের পরিভাষায় বলা হয় ‘ফিতরাত’। কিন্তু এই ফিতরাতকে যখন নানা কারণে বিকৃত করা হয়, তখনই মানুষ অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে কতগুলো মৌলিক কারণ রয়েছে, যা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে সমাজের সংকটের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অপরাধ প্রবণতা বাড়ার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো মহান আল্লাহর প্রতি গাফিলতি ও আখেরাতের ভয় না থাকা। যে মানুষ বিশ্বাস করে যে তার প্রতিটি কাজ আল্লাহ দেখছেন এবং কেয়ামতের দিন প্রতিটি কর্মের হিসাব দিতে হবে, সে সহজে অপরাধে লিপ্ত হতে পারে না। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, তিনি (আল্লাহ) তোমাদের সঙ্গেই আছেন। আর তোমরা যা করো, আল্লাহ তার সবকিছুই দেখেন।’ (সুরা হাদিদ ৪) এই অনুভূতি যখন মানুষের জীবনে না থাকে, তখন বাহ্যিক আইন ও সমাজের ভয় তাকে বেঁধে রাখতে পারে না। আজকের সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং পার্থিব জীবনকেই সবকিছু মনে করার প্রবণতা অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

দ্বিতীয় কারণ হলো পারিবারিক শিক্ষার অভাব। ইসলামে পরিবারকে সমাজের ভিত্তি বলা হয়েছে। মা-বাবার দায়িত্ব শুধু সন্তানকে ভরণপোষণ দেওয়া নয়, বরং তাকে নৈতিকভাবে গড়ে তোলা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রতিটি শিশু ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে, তারপর তার মা-বাবা তাকে তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতির আলোকে গড়ে তোলে। যে পরিবারে ইসলামি আদর্শের চর্চা নেই, সততার শিক্ষা নেই, ভালো-মন্দের পার্থক্য শেখানো হয় না, সেই পরিবার থেকে অপরাধী তৈরি হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি থাকে। ভঙ্গুর পরিবার, সন্তানের প্রতি অবহেলা এবং নৈতিক শিক্ষার শূন্যতা সরাসরি অপরাধ প্রবণতাকে উসকে দেয়।

তৃতীয় কারণ হলো সামাজিক বৈষম্য ও অর্থনৈতিক অবিচার। ইসলাম অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। জাকাত, সদকা, ওয়াকফ এবং মিরাসের বিধানের মাধ্যমে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যে সমাজে ধনী আরও ধনী হয় এবং গরিব আরও নিঃস্ব হয়, সেখানে বঞ্চনা ও হতাশা থেকে অপরাধের জন্ম হয়। তবে ইসলাম একই সঙ্গে স্পষ্ট করে দিয়েছে, দারিদ্র্য অপরাধের অনুমতি দেয় না, বরং বৈধ উপায়ে জীবিকা অন্বেষণ প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করাই প্রকৃত শক্তি।

চতুর্থ কারণ হলো অশ্লীলতা ও খারাপ সঙ্গ। মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের ওপর চলে। খারাপ সঙ্গ মানুষকে ধীরে ধীরে পাপের দিকে নিয়ে যায়। আজকের ডিজিটাল যুগে অশ্লীল কন্টেন্ট, মাদকের সহজলভ্যতা এবং বিভ্রান্তিকর মতাদর্শের ছড়াছড়ি তরুণ প্রজন্মকে নৈতিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যে মন সৎ চিন্তা ও জিকির থেকে বিচ্ছিন্ন, সে মন অপরাধের উপযুক্ত ভূমি হয়ে ওঠে।

পঞ্চম কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। যেখানে অপরাধীরা বিচারের ঊর্ধ্বে থাকে, ক্ষমতা ও অর্থের জোরে পার পেয়ে যায়, সেখানে অপরাধ ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। ইসলামের দণ্ডবিধি কঠোর হওয়ার উদ্দেশ্যই হলো অপরাধ দূর করা।

সামগ্রিকভাবে ইসলাম মনে করে, অপরাধ কেবল বাইরের সমস্যা নয়, এটি আত্মার রোগ। তাই সমাধানও কেবল আইন দিয়ে নয়, বরং আল্লাহভীতি, পারিবারিক বন্ধন, ন্যায়বিচার এবং সৎ জীবনযাপনের সমন্বয়ে একটি সুস্থ সমাজ গড়ার মধ্যেই অপরাধ প্রবণতা রোধের প্রকৃত সমাধান নিহিত।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত