মানুষের জীবনে সবচেয়ে গভীর, নির্মল ও নিঃস্বার্থ সম্পর্কের নাম মা। মা হলেন সেই শীতল আশ্রয়, যেখানে পৌঁছালে সব ক্লান্তি নিমেষেই দূর হয়ে যায়। একজন সন্তানের জন্মের আগ মুহূর্ত থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি ধাপে মা নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেন। গর্ভধারণের কষ্ট, সন্তান জন্মদানের অসহনীয় যন্ত্রণা, নির্ঘুম রাত আর সীমাহীন মমতা মিলিয়েই একজন মা হয়ে ওঠেন সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
ইসলাম মায়ের এই ত্যাগ ও ভালোবাসার মর্যাদাকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে। একজন মা সন্তানের জন্য যা করেন, তার প্রতিদান কোনোভাবেই পূর্ণ করা সম্ভব নয়। তাই মায়ের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও সেবা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি একজন মুসলমানের ইমানি কর্তব্যও। যে সন্তান মায়ের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে, তার জন্য আল্লাহর রহমত ও জান্নাতের পথ সহজ হয়ে যায়।
হাদিসে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি নবী করিম (সা.)-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে জানতে চান, হে আল্লাহর রাসুল! মানুষের মধ্যে আমার কাছে সর্বোত্তম সেবা লাভের অধিকার কার? নবী করিম (সা.) বলেন, তোমার মায়ের। লোকটি আবার জানতে চান, তারপর কার? তিনি বলেন, তোমার মায়ের। লোকটি আবার জানতে চান, তারপর কার? তিনি বলেন, তোমার মায়ের। লোকটি আবারও জানতে চান, তারপর কার? তিনি বলেন, তোমার পিতার। (সহিহ বুখারি)
মহান আল্লাহ মায়ের মর্যাদা এতটাই বৃদ্ধি করে দিয়েছেন যে, পুরো পৃথিবী বিক্রি করে দিলেও মায়ের এক ফোঁটা দুধের দাম শোধ হবে না। মা তার সুন্দর জীবনকে বরবাদ করে দেন সন্তানের জন্য। দীর্ঘ দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণের পর শুধু সন্তানকে দুনিয়ার আলো দেখাতে যন্ত্রণাকে দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করেন। সন্তান জন্মদানের পর শুরু হয় আরও এক কঠিন সংগ্রামের যাত্রা, দুই বছর বুকের দুধ পান করানো থেকে ধীরে ধীরে একটা মানব শিশুকে পরিণত বয়স অবধি পৌঁছে দেওয়া সহজ কথা নয়।
মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘তোমার রব নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন অথবা উভয়ে তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের বিরক্তিসূচক উহ শব্দও বলো না এবং তাদের ভর্ৎসনা করো না। তাদের সঙ্গে কথা বলো সম্মানসূচক ও নম্রভাবে।’ (সুরা বনি ইসরাইল ২৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া অবশ্যই কবুল হয়। এতে কোনো সন্দেহ নেই। এক. মা-বাবার দোয়া তার সন্তানের জন্য। দুই. মুসাফিরের দোয়া। তিন. মজলুমের দোয়া জালেমের বিরুদ্ধে।’ (সুনানে আবু দাউদ)
প্রতিটি সন্তানের উচিত, মায়ের সেবাযত্ন করা, যেভাবে মা আমাদের ছোট বেলায় নির্ঘুম রাত কাটিয়ে আমাদের যতœ নিয়েছেন। রাসুল (সা.) সাহাবিদের মায়ের সেবা করার প্রতি নির্দেশ দিতেন। যেমন মুয়াবিয়া ইবনে জাহিমা সালামি (রহ.) বলেন, আমার পিতা জাহিমা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমতে এসে জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসুল! আমি যুদ্ধে গমন করতে ইচ্ছা করেছি। এখন আপনার নিকট মতামত জিজ্ঞাসা করতে এসেছি। তিনি বললেন, তোমার মা আছে কি? সে বলল, হ্যাঁ। রাসুল (সা.) বললেন, তার খেদমতে লেগে থাকো। কেননা জান্নাত তার পদদ্বয়ের নিচে। (সুনানে নাসায়ি)
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ ইডেন মহিলা কলেজ
