রক্তশূন্যতার কারণ

থ্যালাসেমিয়া নয় তো

আপডেট : ১০ মে ২০২৬, ০৭:৫৩ এএম

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল

ডা. নাসির উদ্দিন আহমদ

অ্যাডভাইজার স্পেশালিস্ট মেডিসিন (এন্ডোক্রাইনোলজি) সিএমএইচ, ঢাকা।

পৃথিবীতে প্রায় ৩৬ কোটি মানুষ থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। এর মধ্যে ১৩ লাখ মারাত্মক পর্যায়ের। ৮ মে বিশ্ব জুড়ে পালিত হলো থ্যালাসেমিয়া দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ছিলো ‘Hidden No More : Finding the Undiagnosed, Supporting the Unseen’। দিবসটি উপলক্ষে থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, আগাম শনাক্তকরণ ও রোগীদের প্রতি সহমর্মিতা গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতা ও রক্ত পরীক্ষাই পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে থ্যালাসেমিয়ার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে।

থ্যালাসেমিয়া কী

এটি রক্তের জন্মগত রোগ। এই রোগে হিমোগ্লোবিন থাকে ত্রুটিপূর্ণ। রক্তের লোহিত কণিকার আয়ুষ্কাল কমে যায়। ফলে আজীবন রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত থাকে রোগী। আয়রণ দিলে এই রক্তশূন্যতা ভালো হয় না বরং খারাপের দিকে যায়।

ধরন

আমাদের রক্তের মাঝে রয়েছে হিমোগ্লোবিন নামক লাল রঞ্জক পদার্থ। এটা শরীরের কোষে কোষে অক্সিজেন বহন করে। হিমোগ্লোবিন গঠনের জন্য প্রয়োজন দুই ধরনের প্রোটিন। আলফা এবং বিটা প্রোটিন। এই রোগে আলফা কিংবা বিটা প্রোটিন সংশ্লেষণে ত্রুটি ঘটে। প্রোটিনের ত্রুটির ওপর ভিত্তি করে থ্যালাসেমিয়াকে মূলত ভাগ করা হয় দুই ভাগে। আলফা এবং বিটা থ্যালাসেমিয়া। এগুলোরও বিভিন্ন রকমফের রয়েছে।

উপসর্গ

যারা এই রোগের বাহক তাদের খুব বেশি সমস্যা হয় না। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে বাহকরা ক্লান্তি অনুভব করেন। তাদের হিমোগ্লোবিন কম থাকে। কিন্তু থ্যালাসেমিয়া মেজর আক্রান্ত শিশুদের দুবছর বয়স থেকেই প্রকাশ পায়। রোগের লক্ষণ ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়াচোখ

মুখ ত্বক ঠোঁট দেখে মনে হয় রক্তশূন্য ভাবসার্বক্ষণিক ক্লান্তি ক্ষুধামান্দ্য স্বাভাবিক বৃদ্ধি না হওয়া পেট ফুলে ওঠা (প্লীহা এবং যকৃত বড় হয়ে যায়)ত্বক মুখ চোখে হলুদ আভাকপাল এবং চোয়ালের হার বৃদ্ধি পাওয়াঘন ঘন ইনফেকশন হাড় ক্ষয়।

চিকিৎসা

থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা নির্ভর করে এর ধরন এবং তীব্রতার ওপর। এসব রোগীদের মূলত দুই পর্যায়ে ভাগ করা যায়। কেউ কেউ আজীবন রক্তের ওপর নির্ভরশীল। এদের প্রতি দুই থেকে পাঁচ সপ্তাহ পরপর রক্ত প্রদান করতে হয়। আর এক গ্রুপের রক্তের প্রয়োজন পড়ে কালেভদ্রে। রক্ত প্রদান করা ছাড়াও ফলিক অ্যাসিড দিতে হয় রোগীকে। আয়রন জমে যাওয়ার প্রবণতা কমানোর ওষুধ ও লাগে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে এ রোগ সারিয়ে তোলা সম্ভব।

জটিলতা

বারবার রক্ত প্রদান করলে আয়রন জমতে থাকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে। বিশেষত লিভার, হৃৎপি-, অগ্ন্যাশয়, প্লীহাসহ বিভিন্ন অঙ্গে। ফলে এসব অঙ্গ তার কার্যকারিতা হারাতে পারে, বিকল হতে পারে। এলোমেলো হৃদস্পন্দন, কার্ডিওমায়োপ্যাথি, লিভার সিরোসিস, হাইপোথাইরয়েডিজম হতে পারে এ রোগে। আক্রান্তদের যৌবন দেরিতে আসে। প্রজননের ক্ষমতা কমে যায়। হাড় ভঙ্গুর হয়। বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

রোগ নির্ণয়

কারও রক্তশূন্যতা দেখা দিলে এর পেছনের কারণ নির্ণয় করা দরকার। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এর কারণ হলো আয়রন ঘাটতি। আয়রন চিকিৎসা দেওয়ার পরও রক্তশূন্যতার উন্নতি না হলে দেখতে হবে থ্যালাসেমিয়া আছে কিনা।

এটি নির্ণয়ের জন্য রক্তের হিমোগ্লোবিনের ইলেক্টোফোরেসিস নামক পরীক্ষা করা হয়।

প্রতিরোধ

এই রোগের কেউ হয় নিছক বাহক। কেউ আক্রান্ত হয় পুরোপুরি। দুজন বাহকের মাঝে বিয়ে হলে সন্তানদের প্রতি চারজনে একজন আক্রান্ত হতে পারে পুরোমাত্রায়, দুজন হতে পারে বাহক আর একজন হতে পারে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। সে জন্য এই রোগ প্রতিরোধে বিয়ের পূর্বে স্ক্রিনিং করা জরুরি।

ছবি : থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের ফেসবুক থেকে নেওয়া।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত