ঢাকা মহানগরের শিশুদের মধ্যে ডিজিটাল স্ক্রিনের আসক্তি এতটাই বেড়েছে, গবেষক-বিশেষজ্ঞরা একে বলছেন ‘মহামারী’। এমন আসক্তির কারণে ভবিষ্যৎ নাগরিকদের শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্যের কী ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে, তা এই শব্দে ফুটে উঠেছে। আইসিডিডিআর,বি সম্প্রতি স্কুলের শিশুদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণার সূত্রে বলেছে ঢাকার শিশুদের বড় অংশ সেলুলার ফোন (মোবাইল) টিভি, ট্যাব বা কমপিউটারে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছে। স্কুল থেকে ফিরেই স্ক্রিনে, খাওয়ার পর স্ক্রিনে, পড়া তৈরির পর আবারও স্ক্রিনে মগ্ন থাকে। এটা চলে রাত ১২-১টা পর্যন্ত, যখন মা-বাবারা ঘুমিয়ে পড়েন, তখনো শিশুরা সজাগ স্ক্রিনে। এর পরিণতিতে শিশুর পর্যাপ্ত ঘুম হয় না। মেজাজ খিটখিটে থাকে। খাওয়ায় অরুচি দেখা দেয়। মাথাব্যথা ও চোখের সমস্যা হচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও পড়ছে বিরূপ প্রভাব। আর শারীরিক পরিশ্রম না হওয়ায় ওজন বেড়ে যায়। মানসিকভাবে তারা ডিজিটাল গেমসহ নানাভাবে আসক্তির অধীনে চলে যায়।
এই সমস্যার সমাধান কী? মনোবিজ্ঞানীদের পরামর্শ হচ্ছে, শিশুকে প্রতিদিন শারীরিক খেলাধুলায় রাখতে হবে। তাদের সঙ্গে শারীরিক ও মানসিকভাবে কথাবার্তা চালানো এবং বিনোদনের ব্যবস্থা করা দরকার। পড়াশোনার বাইরে এই কাজগুলো করতে হবে শিশুর মা-বাবাসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের। শিশুর বোধে এটা ছড়িয়ে দিতে হবে যে সে একা নয়, তার সঙ্গে আছে সবাই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে মহানগরের অধিকাংশ পরিবার কর্মজীবী হওয়ায় শিশুকে সঙ্গ দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। বাবা-মা’ই শিশুর হাতে মোবাইল, ট্যাব তুলে দেন বিনোদনের উপকরণ হিসেবে। শিশু খেতে না চাইলেই মোবাইলে গেম কিংবা টিভি খুলে গেম দেখিয়ে খাওয়ানো হচ্ছে। তারা ভুলে যান যে, এতে করে তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হচ্ছে; আসক্তিতে ডুবিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এভাবে নিজেরাই ওই মহামারীর বীজ বপন করছি আমরা। রাজধানীর শিশুরা যদি প্রতিদিন ৫ ঘণ্টা স্ক্রিনে সময় কাটায়, তাহলে তারা বাকি সময় কী নিয়ে থাকে? মা-বাবা, দাদা-দাদি ও ভাই-বোনের সঙ্গ পাওয়া এবং প্রতিবেশী শিশুসহ বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলার সুযোগ কোথায়? প্রায় সব আবাসিক এলাকায় বড় বড় অট্টালিকা থাকলেও খেলার মাঠ নেই, পার্ক নেই, বিনোদনের আয়োজন নেই। ২/১টি ব্যতিক্রম ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও খেলার সুযোগ নেই। খেলার মাঠগুলো একের পর এক দখল হচ্ছে। পুকুরগুলো ভরাট করা হচ্ছে। আইন অনুযায়ী এমন দখল অপরাধ হলেও তাদের থামাতে সরকার যথেষ্ট তৎপর নয়। কারণ, দখলদাররা প্রভাবশালী। ফলে মাঝে মাঝে উদ্ধারের আয়োজন হলেও শেষ পর্যন্ত দখলমুক্ত হয়ে ওঠে না।
নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমরা ভেবেছিলাম, অন্তত ভবিষ্যৎ নাগরিকদের শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত মাঠ ও পার্কের ব্যবস্থা করবে। অক্সিজেনের কারখানা হলো গাছপালা। এজন্য মহানগরে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ বৃক্ষ থাকা জরুরি। কিন্তু আছে মাত্র ৮ শতাংশ বৃক্ষ। তাহলে শিশুরা কোথায় খেলবে? অভিভাবকরা কোথায় বাচ্চাদের নিয়ে একটু ঘুরতে যাবেন? তাই শিশুদের খেলার সুযোগ ও একটু স্বস্তি দিতে, মাঠ ও পার্কসহ গাছের ছায়ার ঘাটতি মেটাতে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। ডিজিটাল যন্ত্র ব্যবহার শিক্ষাঙ্গনে অনলাইনে ক্লাসসহ কিছু ক্ষেত্রে সময়ের দাবি। কিন্তু ভবিষ্যৎ নাগরিকদের সুস্থ-সবল ও নীরোগ জীবন দিতে হলে এসব যন্ত্রের ব্যবহার সীমিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে পরিবারকে, অভিভাবকদের। শিশুদের সময় দিতে হবে মা-বাবা, ভাই-বোনসহ পরিবারের অন্যদের। একই সঙ্গে খেলার মাঠ, পার্ক ও দখল হওয়া স্থান নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। এ জন্য সরকার ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জোরালো উদ্যোগ আমরা চাই।
