একসময় সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবহারকারীরা কেবল কনটেন্টে লাইক দিতেন, ফলো করতেন বা অপছন্দের পোস্ট লুকিয়ে রাখতেন। কিন্তু কোন কনটেন্ট তাদের সামনে আসবে, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিত প্ল্যাটফর্মগুলোর নিজস্ব সুপারিশকারী অ্যালগরিদম। এখন সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির সহায়তায় ব্যবহারকারীদের হাতে অ্যালগরিদম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তুলে দিচ্ছে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো।
থ্রেডস, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এমন নতুন টুল চালু করেছে, যার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা নিজেদের আগ্রহ অনুযায়ী অ্যালগরিদমকে প্রশিক্ষণ দিতে পারেন এবং ফিডে কী ধরনের কনটেন্ট দেখতে চান তা সরাসরি নির্ধারণ করতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সুপারিশভিত্তিক প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিড আর একমুখী টেলিভিশন চ্যানেলের মতো থাকছে না; এটি ধীরে ধীরে স্ট্রিমিং সেবার মতো হয়ে উঠছে, যেখানে ব্যবহারকারীরা নিজেরাই কনটেন্টের ধরণ ও অগ্রাধিকার ঠিক করতে পারবেন। সূত্র টেকক্রাঞ্চ।
থ্রেডস: প্রকাশ্য পোস্ট ছাড়াই পছন্দ জানানো যাবে
২০২৬ সালের ১৬ জুন থ্রেডস ‘ইউর অ্যালগো’ নামে নতুন একটি ফিচার চালু করে। এটি প্ল্যাটফর্মটির আগের ‘ডিয়ার অ্যালগো’ টুলের উন্নত সংস্করণ।
‘ডিয়ার অ্যালগো’ ফিচারে ব্যবহারকারীদের নিজেদের পছন্দ জানাতে প্রকাশ্যে পোস্ট করতে হতো। যেমন—“Dear Algo, show me more posts about podcasts” লিখে অ্যালগরিদমকে সংকেত দেওয়া যেত যে তারা পডকাস্ট-সংক্রান্ত কনটেন্ট বেশি দেখতে চান।
নতুন ‘ইউর অ্যালগো’ ফিচারে সেই কাজটি এখন ব্যক্তিগতভাবে করা যাবে। ব্যবহারকারীরা সরাসরি জানাতে পারবেন তারা কোন ধরনের কনটেন্ট বেশি বা কম দেখতে চান এবং সেই নির্দেশনা কতদিন কার্যকর থাকবে-এক দিন, তিন দিন অথবা সাত দিন।
উদাহরণস্বরূপ, কেউ চাইলে বেসবল-সংক্রান্ত কনটেন্ট বেশি এবং চাপ সৃষ্টিকারী সংবাদ কম দেখার অনুরোধ করতে পারবেন।
ইনস্টাগ্রাম: নিজের অ্যালগরিদম দেখুন, নিয়ন্ত্রণও করুন
চলতি বছরের জুনের শুরুতে ইনস্টাগ্রাম ‘ইউর অ্যালগরিদম’ নামে একটি নতুন টুল চালু করে, যা ব্যবহারকারীদের তাদের ফিডকে প্রভাবিত করা বিষয়গুলো দেখতে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে।
ফিচারটি প্রথমে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শুধু রিলস ফিডের জন্য চালু হয়েছিল। এখন এটি ফিড, এক্সপ্লোর এবং রিলস-সব জায়গাতেই ব্যবহার করা যাচ্ছে।
সেটিংস মেনু থেকে টুলটি চালু করলে ব্যবহারকারীরা দেখতে পারবেন, ইনস্টাগ্রাম তাদের কোন কোন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী বলে মনে করে। এরপর তারা জানাতে পারবেন কোন বিষয়ে আরও বেশি কনটেন্ট দেখতে চান এবং কোন বিষয়গুলো কম দেখতে চান। সেই অনুযায়ী অ্যালগরিদম নিজেকে সমন্বয় করবে।
ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরির মতে, অতীতে সোশ্যাল মিডিয়ার র্যাঙ্কিং মডেলগুলো ব্যবহারকারীদের কাছে অনেকটাই অস্বচ্ছ ছিল। কিন্তু বড় ভাষাভিত্তিক মডেল ব্যবহারের ফলে এখন সুপারিশকারী ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও বোধগম্য করা সম্ভব হচ্ছে। এতে ব্যবহারকারীরা জানতে পারবেন কেন কোনো কনটেন্ট তাদের সামনে আসছে এবং সরাসরি নিজেদের পছন্দও জানাতে পারবেন।
টিকটক: বিষয়ভিত্তিক কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের সুযোগ
টিকটকের ‘ম্যানেজ টপিকস’ ফিচার ব্যবহারকারীদের ‘ফর ইউ’ ফিডে প্রদর্শিত কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়। ২০২৪ সালে চালু হওয়া এই ফিচারের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা খেলাধুলা, ভ্রমণ, কৌতুক, সমসাময়িক ঘটনা, নাচ কিংবা খাবারের মতো বিভিন্ন বিষয়ের কনটেন্ট কতটা দেখতে চান তা নির্ধারণ করতে পারেন।
সেটিংসে থাকা স্লাইডার ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ের কনটেন্টের পরিমাণ বাড়ানো বা কমানো যায়। কোনো ক্যাটাগরিতে কী ধরনের ভিডিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তা জানার জন্য তথ্য বাটনও রাখা হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে টিকটক জানিয়েছে, ‘ক্রিয়েটিভ আর্টস’ বিভাগে চিত্রাঙ্কন, অঙ্কন, গ্রাফিক ডিজাইন এবং শিল্পবিষয়ক টিউটোরিয়াল অন্তর্ভুক্ত থাকে।
২০২৫ সালে টিকটক এই ফিচারকে আরও উন্নত করে ‘স্মার্ট কীওয়ার্ড ফিল্টার’ যুক্ত করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক এই প্রযুক্তি নির্দিষ্ট শব্দের পাশাপাশি তার সমার্থক বা সম্পর্কিত শব্দও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিল্টার করতে পারে। যেমন, কেউ যদি ‘রিমডেলিং’ শব্দটি ব্লক করেন, তাহলে ‘রেনোভেশন’ বা ‘রেনোভেশনস’-সংক্রান্ত কনটেন্টও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সীমিত হয়ে যাবে।
ব্যবহারকারীর ক্ষমতায়নের নতুন অধ্যায়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই পরিবর্তনকে অনেকেই ব্যবহারকারীর ক্ষমতায়নের নতুন ধাপ হিসেবে দেখছেন। দীর্ঘদিন ধরে অ্যালগরিদমের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল থাকা ব্যবহারকারীরা এখন নিজেদের আগ্রহ ও প্রয়োজন অনুযায়ী ফিড সাজানোর সুযোগ পাচ্ছেন।
অন্যদিকে, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্যও এটি লাভজনক। কারণ ব্যবহারকারীরা যখন তাদের পছন্দের কনটেন্ট বেশি দেখবেন, তখন প্ল্যাটফর্মে তাদের সম্পৃক্ততা ও সময় ব্যয় উভয়ই বাড়বে।
সব মিলিয়ে, সোশ্যাল মিডিয়ার ভবিষ্যৎ এমন এক দিকে এগোচ্ছে যেখানে অ্যালগরিদম শুধু ব্যবহারকারীদের পর্যবেক্ষণ করবে না; ব্যবহারকারীরাও অ্যালগরিদমকে নির্দেশনা দিতে পারবেন। ডিজিটাল জগতের এই নতুন বাস্তবতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের অভিজ্ঞতাকে আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য করে তুলতে পারে।