দেশের আনাচে-কানাচে হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে হরেক রকমের মাদক। ঘরে বসেই সামাজিক মাধ্যম অনলাইনে সংগ্রহ করছে নতুন নতুন সিনথেটিক মাদক। খুচরা বিক্রেতারা ধরা পড়লেও কারবারিরা বরাবরই থেকে যাচ্ছে আড়ালে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চেষ্টা করেও আনতে পারছে না নিয়ন্ত্রণে। ফলে মেধাহীন হয়ে যাচ্ছে দেশের তরুণ প্রজন্ম। চিন্তিত প্রশাসন। এ নিয়ে দেশ রূপান্তরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খোলামেলা কথা বলেছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) মহাপরিচালক হাসান মারুফ। সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত নিম্নরূপ
প্রশ্ন : দেশে বর্তমানে প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি ক্রিস্টাল মেথ (আইস) বা কুশের মতো নতুন ও মারাত্মক সিনথেটিক মাদকের অনুপ্রবেশ ঘটছে। এসব মাদকের বিস্তার রোধে আপনাদের কৌশল কী?
উত্তর : প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি ক্রিস্টাল মেথ (আইস), কুশসহ অন্যান্য নতুন প্রজন্মের সিনথেটিক মাদকের বিস্তার আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এসব মাদক প্রতিরোধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করেছে, সীমান্ত ও প্রবেশ পথে বিশেষ নজরদারি বৃদ্ধি করেছে এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে নতুন মাদকের প্রবণতা শনাক্ত ও মোকাবিলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন : মাদক চোরাচালানের প্রধান রুটগুলো, বিশেষ করে মিয়ানমার ও ভারত সীমান্ত বন্ধ করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বা কোস্ট গার্ডের মতো অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে আপনাদের সমন্বয় কেমন?
উত্তর : মাদক চোরাচালান একটি আন্তঃসীমান্ত অপরাধ। তাই সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজিবি, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, র্যাবসহ অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে আমাদের নিয়মিত তথ্য বিনিময় ও যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়। বিশেষ করে মিয়ানমার ও ভারত সীমান্তকেন্দ্রিক ঝুঁকিপূর্ণ রুটগুলোতে সমন্বিত নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে আন্তঃসংস্থা সমন্বয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রশ্ন : মাদক সিন্ডিকেটগুলো প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল পাল্টাচ্ছে। তাদের ধরতে ডিএনসির গোয়েন্দা নজরদারি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা বাড়ানো হয়েছে?
উত্তর : মাদক সিন্ডিকেটের কৌশল পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিএনসিও প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ডেটা বিশ্লেষণ, ডিজিটাল নজরদারি এবং বিশেষ গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কর্মকর্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
প্রশ্ন : মাঠপর্যায়ের মাদক বিক্রেতারা ধরা পড়লেও ‘মাদক সম্রাট’ বা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। তাদের আইনের আওতায় আনতে প্রতিবন্ধকতা কী?
উত্তর : মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের বিচারের আওতায় আনা আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। তবে অনেক ক্ষেত্রে তারা সরাসরি অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে যুক্ত না থেকে বিভিন্ন স্তরের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে গ্রহণযোগ্য ও টেকসই প্রমাণ সংগ্রহ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তা সত্ত্বেও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ এবং আন্তঃসংস্থা সহযোগিতার মাধ্যমে মাদক সিন্ডিকেটের মূল নেতৃত্বকে আইনের আওতায় আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
প্রশ্ন : প্রায়ই অভিযোগ ওঠে, খোদ ডিএনসির কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে মাদক কারবারিদের যোগসাজশ রয়েছে।
উত্তর : ডিএনসি দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’নীতি অনুসরণ করে। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হয় এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। অভ্যন্তরীণ নজরদারি, জবাবদিহিতা এবং পেশাগত শুদ্ধাচার নিশ্চিত করতে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
প্রশ্ন : দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যার তুলনায় সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসনকেন্দ্রগুলোর শয্যা সংখ্যা এবং চিকিৎসা সুবিধা অত্যন্ত সীমিত। এ সক্ষমতা বাড়াতে পরিকল্পনা কী?
উত্তর : মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কার্যক্রমকে শক্তিশালী করা আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। সরকারি নিরাময়কেন্দ্রগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ এবং আধুনিক চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং সুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে নিরাময়ের পাশাপাশি পুনর্বাসন ও সমাজে পুনরায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রশ্ন : ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা অনেক বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রে রোগীদের ওপর নির্যাতন এবং চিকিৎসার নামে বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এসব কেন্দ্রের লাইসেন্স প্রদান এবং তদারকির ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন?
উত্তর : বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রগুলো আইন ও নীতিমালার আওতায় পরিচালনা নিশ্চিত করতে লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন এবং নিয়মিত পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রোগী নির্যাতন, অব্যবস্থাপনা বা অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সেবার মান উন্নয়ন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তদারকি কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
প্রশ্ন : স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া তরুণদের মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে অধিদপ্তর কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে?
উত্তর : মাদক প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সচেতনতামূলক সভা, সেমিনার, কর্মশালা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তরুণ সমাজকে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে অবহিত করা এবং ইতিবাচক জীবনধারায় উদ্বুদ্ধ করাই আমাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।
প্রশ্ন : বর্তমানে সামাজিক মাধ্যম এবং ডার্ক ওয়েবে মাদক কেনাবেচা ও হোম ডেলিভারি হচ্ছে। এটি মোকাবিলায় আপনাদের প্রস্তুতি কেমন?
উত্তর : সামাজিক মাধ্যম অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে মাদক বিপণনের প্রবণতা বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের বিষয়। এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সাইবার সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী ও প্রযুক্তি সংস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নজরদারি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তের মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন : বিদ্যমান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনটি মাদক নির্মূলে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে? এতে কোনো সংশোধনী বা কঠোর শাস্তির ধারা যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা দেখছেন কি?
উত্তর : বিদ্যমান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ (সংশোধিত ২০২০) মাদক নিয়ন্ত্রণে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ভিত্তি প্রদান করেছে। তবে অপরাধের ধরন ও কৌশল পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইন ও বিধিবিধানের কার্যকারিতা নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে আইন আরও কার্যকর করার বিষয়ে সরকার বিবেচনা করছে।
প্রশ্ন : মাদক ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। কারবারিদের এই আর্থিক নেটওয়ার্ক বা মানি লন্ডারিং বন্ধে সিআইডি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে কীভাবে কাজ করছেন?
উত্তর : মাদক ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থের অবৈধ লেনদেন ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সিআইডি, বাংলাদেশ ব্যাংকের বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইঋওট) এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন শনাক্তকরণ, সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং অপরাধলব্ধ সম্পদ জব্দের বিষয়ে আন্তঃসংস্থা সহযোগিতা জোরদার করা হচ্ছে।
প্রশ্ন : ডিএনসি মহাপরিচালক হিসেবে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশকে মাদকমুক্ত করতে আপনার মূল অগ্রাধিকার বা ‘ভিশন’ কী?
উত্তর : আমাদের ভিশন হলো একটি নিরাপদ, সুস্থ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। এ লক্ষ্যে সরবরাহ ও চাহিদা হ্রাস এবং ক্ষতি নিরসন এই তিনটি ক্ষেত্রকে সমান গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হবে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর আইন প্রয়োগ, কার্যকর চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে মাদকের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত ও টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলাই আমাদের অগ্রাধিকার।