এমবাপ্পের আসল পরীক্ষা আজ

আপডেট : ৩০ জুন ২০২৬, ০২:৫৭ এএম

ক্যালেন্ডারের পেছনের পাতা উল্টে চলে যাওয়া যাক ১৯৫৮ সালের ২৯ জুনে। স্টকহোমের রাসুন্ডা স্টেডিয়ামে ফুটবলবিশ্ব তখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল এক ক্লাসিক ফাইনালের জুঁস ফন্তেইন-রেমন্ড কোপাদের ফ্রান্স এবং স্বাগতিক সুইডেনের। কিন্তু ১৭ বছর বয়সী এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ সেদিন ভিন্ন এক চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলেন। সেমিফাইনালে পেলের সেই জাদুতে ব্রাজিলের কাছে ৫-২ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয় ফ্রান্স। স্তব্ধ হয়ে যায় দুই ইউরোপীয় পরাশক্তির প্রথম বিশ্বকাপ দ্বৈরথের স্বপ্ন। বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে দীর্ঘতম এক অধরা ম্যাচ।

১৯৩০ সালের প্রথম আসর থেকে আজ পর্যন্ত ফ্রান্স খেলেছে ৭৬টি ম্যাচ, আর স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ সুইডেন খেলেছে ৫৪টি ম্যাচ। অথচ দীর্ঘ এই সময়ে দুজনেই বিশ্বফুটবলে রাজত্ব করলেও বিশ্বকাপে কখনো একে অপরের মুখোমুখি হতে পারেনি। অবশেষে প্রায় এক শতাব্দীর সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটছে মঙ্গলবার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে, বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর মঞ্চে।

এই দীর্ঘ বিরতির কারণেই দুই দলের মাঠের দ্বৈরথ আজ ভিন্ন এক মাত্রা পাচ্ছে। অতীতে এই দুই দল সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২৩ বার মুখোমুখি হলেও বড় টুর্নামেন্টের মঞ্চে তাদের দেখা হয়েছে কেবল ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে (ইউরো)। যার মধ্যে ২০১২ সালের ইউরোতে জøাতান ইব্রাহিমোভিচের সেই বিখ্যাত অ্যাক্রোবেটিক ভলিতে সুইডেনের ২-০ ব্যবধানের জয়টি এখনো ফুটবলপ্রেমীদের মনে দাগ কেটে আছে। সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে গোল করা সেবাস্তিয়ান লারসন এখন সুইডেনের কোচিং স্টাফের অংশ, যিনি বিশ্বাস করেন ফ্রান্স যত বড় দলই হোক না কেন, তাদের কোণঠাসা করার সামর্থ্য স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশটির রয়েছে। দিদিয়ের দেশমের বিদায়ী টুর্নামেন্টে ফ্রান্স এখন এক অপ্রতিরোধ্য রণতরী। গ্রুপ পর্বে সেনেগাল, ইরাক ও নরওয়েকে স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে নকআউটে এসেছে তারা। কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা উসামান দেম্বেলের মতো বিশ্বসেরা ফরোয়ার্ডরা প্রত্যেকেই ৪টি করে গোল করে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছেন। বিশেষ করে নরওয়ের বিপক্ষে দেম্বেলের প্রথমার্ধের চোখ ধাঁধানো হ্যাটট্রিক প্রমাণ করে, ফরাসিদের আক্রমণের গভীরতা কতটা ভয়ংকর। মাইকেল অলিস আর দেজিরে দুয়ের মতো তরুণদের নিয়ে গড়া ফ্রান্সের এই আক্রমণভাগকে রুখতে যেকোনো দলকেই অতিমানবীয় কিছু করতে হবে।

অন্যদিকে, গ্রাহাম পটারের অধীনে সুইডেনের নকআউটের পথটা ছিল কিছুটা নড়বড়ে। তিউনিসিয়াকে ৫-১ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করলেও নেদারল্যান্ডসের কাছে একই ব্যবধানে হেরে চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তাদের। প্রধান ডিফেন্ডার ইসাক হিয়েন ইনজুরিতে পড়ায় ভিক্টর লিন্ডেলফকে রক্ষণ সামলাতে পেছনে নেমে আসতে হচ্ছে, যা পটারের রক্ষণভাগের দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে এই কঠিন পরিস্থিতিতেও সুইডেনের মূল আশা তাদের দুই তারকা স্ট্রাইকার ভিক্টর গিয়োকেরেস এবং আলেকজান্ডার ইসাক।

ফ্রান্সের এই বিধ্বংসী শক্তির সামনে নিজেদের অবস্থান নিয়ে আর্সেনালের সুইডিশ স্ট্রাইকার ভিক্টর গিয়োকেরেস সরাসরি হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের রক্ষণাত্মক সংগঠনকে প্রায় নিখুঁত হতে হবে এবং যে সুযোগগুলো আমরা পাব, তা কাজে লাগাতে হবে। কাগজে-কলমে আমরা হয়তো আন্ডারডগ, কিন্তু আমাদের নিজেদের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস আছে। এই টুর্নামেন্টে আমরা অনেক ম্যাচেই দেখেছি যে, ছোট দলগুলোও সেরা দলদের হারিয়ে দিতে পারে।’

কিংবদন্তি ইব্রাহিমোভিচ অবশ্য ফরাসিদের নিয়ে কিছুটা সমীহ প্রকাশ করেই বলেছিলেন, ‘ফ্রান্স অন্য লেভেলের ফুটবল খেলে। প্রতিপক্ষ তখনই সুযোগ পায় যখন ফরাসিরা নিজেরা ধীরগতিতে খেলে ম্যাচ হালকা করে দেয়।’

খাতা কলমের হিসেবে গ্রুপ পর্বে ১০ গোল করে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ভয়ংকর আক্রমণভাগ ফ্রান্সই। এমবাপ্পে-দেম্বেলের পাশাপাশি এবার বাম প্রান্তে ব্রাডলি বারকোলা এবং লুকাস দিনিয়েকে নামিয়ে রক্ষণ আরও নিিদ্র করার ছক কষছেন দেশম। তবে ফ্রান্সের এই অতি-আক্রমণাত্মক ছক নিয়ে সাবেক ইংলিশ কিংবদন্তি গ্যারি লিনেকার একটি চমৎকার এঙ্গেল টেনেছেন। ফরাসি সংবাদমাধ্যম লেকিপকে তিনি বলেন, ‘চারজন খাঁটি ফরোয়ার্ড নিয়ে খেলায় ফ্রান্স কাউন্টার অ্যাটাকে কিছুটা অরক্ষিত থাকবে, যা ইসাক বা এল্যাঙ্গারা কাজে লাগাতে পারে। তবে দিন শেষে সুইডেন যত গোলই করুক, ফ্রান্সের গোল করার ক্ষমতা এতটাই যে, তারা সবসময় একটা গোল বেশিই দেবে।’

তাই নিউ জার্সির এই ম্যাচে ইতিহাসের সেই অধরা লড়াইয়ে ফেভারিট হিসেবে ফ্রান্সই মাঠে নামবে। তবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের ইতিহাস বলে, কাগজ-কলমের ছক সবসময় মাঠে মেলে না; আর আজ যদি সেই অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে যায়, তবে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত