পায়ে পায়ে চলছে বিশ্বকাপ। তিন দেশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো) দলের সংখ্যা ৪৮ থেকে নেমে এসেছে ৩২-এ। প্রথম রাউন্ডের ৭২টি খেলা শেষে ১৬টি দলের বিদায়ের পর শুরু হয়েছে নকআউট রাউন্ড। এখানে জানবাজি রেখে খেলবে ৩২টি দল। এখানে মাঠের লড়াইয়ের সঙ্গে ভাগ্যের সহায়তাও জরুরি। এ ছাড়া উপায় নেই। হেরে গেলেই উড়োজাহাজে ওঠে ধরতে হবে বাড়ির পথ। প্রথম রাউন্ডের খেলার সঙ্গে এই রাউন্ডের (নক আউট) পার্থক্য অনেক। এখানে ‘অপশন’ নেই। টিকে থাকলে হলে জিততেই হবে। খুব নিষ্ঠুর এই পর্বের খেলা। অথচ এ পর্বের প্রতিই আকর্ষণ বেশি। মানুষ সম্ভবত চূড়ান্ত কিছু দেখতে ভালোবাসে। নকআউটে মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তাপ অনেক বাড়বে। পাল্টাবে খেলার কৌশল। ফুটবল গত ৪ বছরে কত বেশি এগিয়েছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে নকআউট রাউন্ডে তা বুঝতে অসুবিধা হবে না।
ফুটবলকে এত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং চিত্তাকর্ষক করার পেছনে দলগুলোর কোচিং স্টাফদের অবদানও কম নয়। নিরলসভাবে কাজ করছেন তারা। একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার জন্য খেলোয়াড়দের তৈরি করেছেন। খেলোয়াড়দের কাছ থেকে মাঠে সেরাটা আদায় করে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তারাই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে কৌশল তৈরি করেন। এই মানুষগুলোর সবাই কিন্তু আবার যে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন, সে দেশের নাগরিক নন। ভিন্ন ভিন্ন নাগরিকত্ব নিয়েও দলে কাজ করছেন। তাদের বড় পরিচয় ‘ভেরি কম্পিটেন্ট প্রফেসনাল কোচ’। তাদের দক্ষতা এবং গোল রক্ষকদের অসাধারণ নৈপুণ্যেই নকআউট রাউন্ডে নিয়ে এসেছে দলগুলোকে।
আশার কথা, তিনটি স্বাগতিক দেশই এবার দ্বিতীয় রাউন্ডে কোয়ালিফাই করেছে। ফুটবল উৎসবের জন্য এটি ইতিবাচক। তবে এই তিনটি স্বাগতিক দেশ আগামীতে কতটুকু এগোতে পারবে, সেটি এখন দেখার বিষয়। চলমান বিশ্বকাপে প্রথম রাউন্ডে প্রথম চক্রের খেলাগুলোতে সব দলই যে তার নিজস্ব রূপ নিয়ে মাঠে নেমেছে, তা নয়। ক্লাবের ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ শেষ করে খেলোয়াড়রা যোগ দিয়েছেন জাতীয় দলে। তারা অবশ্যই ক্লান্ত ছিলেন। গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় খেলা থেকে খেলোয়াড়রা ধীরে ধীরে সবাই স্বরূপে এসেছেন। লক্ষণীয় প্রতিটি দলের খেলায় উন্নতি এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অনেকেই মনে করেছিলেন, ৪৮ দলের বিশ্বকাপ হয়তো ঝুলে পড়বে। সেই জমজমাট প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাবে না, এটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ছোট দল এবং বড় দলের মধ্যে পার্থক্য খুব একটা বোঝা যায়নি। অভিজ্ঞতা, টেকনিক এবং সর্বোপরি ফুটবল ঐতিহ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার আমেজ ধরে রেখেছিল।
গ্রুপ পর্যায়ে যেহেতু তিনটি করে খেলা ছিল, এতে করে একটিতে ধাক্কা খেলেও সেটি সামাল দিয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল পরবর্তী খেলাতে আর সেটিই হয়েছে। জার্মানির মতো দল এবার গ্রুপের খেলায় হেরেও শেষ পর্যন্ত নকআউটে এসেছে। ২০১৮ এবং ২০২২ সালে তো ওরা গ্রুপেই বিদায় নিয়েছিল। স্পেন ড্র করে নকআউটে এসেছে। প্রথম খেলায় ড্র করেও পর্তুগাল নকআউটে। প্রথমবারের মতো খেলতে নেমে নক আউটে স্থান করে নিয়েছে কেপ ভার্দে। তারা ফুটবল বিশ্বকে অবাক করেছে। কেপভার্দে নকআউট রাউন্ডে আসবে এটি তো ভাবা হয়নি। ভাগ্যের সহায়তা এবং নিষ্ঠা তাদেরকে ঝলমলে আলোর জগতে নিয়ে এসেছে। অনেক বছর পর নরওয়ে এসেছে দ্বিতীয় রাউন্ডে। ২০১০ সালে স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা এবারই প্রথম দ্বিতীয় রাউন্ডে। অন্যদিকে ২০২২ সালের স্বাগতিক কাতারের বিদায় ঘণ্টা বেজেছে গ্রুপ পর্বেই। আবার এশিয়ার দুই প্রতিনিধি, যৌথভাবে ২০০২ সালে বিশ্বকাপের আয়োজক জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া মধ্যে জাপান প্রথম রাউন্ড উতরে দ্বিতীয় রাউন্ডে এলেও দক্ষিণ কোরিয়াকে দুঃখজনকভাবে বাড়ির পথ ধরতে হয়েছে। গতবার (২০২২) মরক্কো সেমিফাইনালে উঠেছিল। এবারও তারা প্রথম রাউন্ডে দারুণভাবে ঝলসে উঠেছে। স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র প্রথম রাউন্ডে ভালো ফুটবল খেলেই দ্বিতীয় রাউন্ডে এসেছে। এখন তাদের দিতে হবে আসল পরীক্ষা।
নকআউটে অনেক সময় অনেক দল উতরে যায় প্রতিপক্ষ তেমন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী না হওয়ায়। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের ইতিহাসে স্বাগতিক দেশ হিসেবে ট্রফি জিতেছে উরুগুয়ে, ইতালি, ইংল্যান্ড, পশ্চিম জার্মানি, আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশিবার ট্রফি জিতেছে ব্রাজিল পাঁচবার। তাদের লক্ষ্য ষষ্ঠবারের মতো ট্রফি জয়। এটি উচ্চ বিলাসী চিন্তা কিনা বলা যাচ্ছে না। উত্তর মিলবে সামনের দিনগুলোয়। ব্রাজিল ১৯৫০ সালে এবং ২০১৪ সালে ছিল বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশ। ১৯৫০ সালে শিরোপা জিতেছে উরুগুয়ে আর ২০১৪ সালে জার্মানি। ব্রাজিল সব বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে তবে ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্যায়ে ‘হার্ডনস’ অতিক্রম করতে না পেরে অসময়ে বাড়ি চলে যায়।
বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে তিন তিনবার ফাইনাল খেলেও ফিফা ট্রফি ছুঁয়ে দেখার অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি নেদারল্যান্ডস। কমলা রঙের জার্সিধারীরা চলমান বিশ্বকাপে নকআউট রাউন্ডে লড়বে। সময় বলে দেবে এবার তারা কতটুকু এগোতে পারবে। ১৯৭৪ ও ১৯৭৮ সালে পর পর দুইবার ফাইনালে খেলেও শেষ পর্যন্ত বিজেতা দলের আখ্যা নিয়ে তাদের বিদায় ভক্তদের কাঁদিয়েছে। অথচ এই দুই বিশ্বকাপ নেদারল্যান্ডস দলে জোহান ক্রুয়েফ, জোহান নিমকেনের মতো ফুটবল গ্রেটরা ছিলেন।
ফুটবলে ভাগ্যের সহায়তা সবচেয়ে বড় বিষয়। চিন্তা করুন ইতালি চারবার বিশ্বকাপ জয় করেছে অথচ এবার সেই দল কোয়ালিফাই করতে পারেনি। হাঙ্গেরী এক সময় বিশ্ব ফুটবলে ঝড় তুলেছে। তাদের পুসকাস হিদেকুটি, ককেসিস নামগুলো এখনো ফুটবলের গভীর আলোচনায় ওঠে আসে। এই হাঙ্গেরি দুইবার বিশ্বকাপ খেলেও ট্রফি জিততে পারেনি। হাঙ্গেরি পারেনি চলমান কোয়ালিফাই করতে। পর্তুগাল নাম উচ্চারিত হলে এখন যে নামটি উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো অথচ একটি বিরাট সময় ধরে ফুটবল অনুরাগীরা পর্তুগালকে চিনতেন ইউসেবিও এর পর্তুগাল হিসেবে। পর্তুগালের রিকার্ডেনও এক সময় বিশ্ব ফুটবলে দারুণভাবে আলোচিত হয়েছেন। ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপে প্রথমবার খেলতে এসে পর্তুগাল তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিল। এ রকম রেকর্ড আর মাত্র একই দেশের আছে। চলমান বিশ্বকাপে রোনালদো দেশের হয়ে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলছেন। অনেক অনেক রেকর্ড সৃষ্টিকারী রোনালদো তার শেষবারের চেষ্টায় কতটুকু নিয়ে যেতে পারেন, এটি দেখার জন্য এখন অপেক্ষা।
আর্জেন্টিনার ফুটবল এবং মেসিকে ঘিরে যে ধরনের উন্মাদনা, বিশেষত আমাদের এখানে, এটি লক্ষ্য করে বাংলাদেশে দেশটির রাষ্ট্রদূত এবং আর্জেন্টিনা থেকে আগত ফুটবল ফ্যানের প্রতিনিধিরা আবেগে আপ্লুত, অবাক এবং বিস্মিত হয়েছেন। অবাক হয়েছেন মেসির প্রতি ভালোবাসা, গ্রহণযোগ্যতা এবং আর্জেন্টাইন ফুটবলের জন্য বাংলাদেশের মানুষের গভীর টান লক্ষ্য করে। খোদ আর্জেন্টিনায় যেটি ফুটবল দলকে ঘিরে দেখা যায় না, সেটি তারা লক্ষ্য করেছেন হাজার হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশে। বিভিন্ন বয়সের বিরাট জনগোষ্ঠী আর্জেন্টিনার সমর্থন এটি তো যে কোনো আর্জেন্টাইনের জন্য আনন্দের।
পুরো বিশ্ব অপেক্ষা করে মাঠে ল্যাতিন ফুটবলের সৌন্দর্য উপভোগের। ভক্তদের বড় অংশের প্রত্যাশা, বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ম্যাচ হোক। স্বপ্নের সে ম্যাচের মাধ্যমে পর্দা নামুক বিশ্বকাপের। এমনটি হয়নি কখনো, তারপরও আশা তো করা যেতেই পারে। দুনিয়াজুড়ে ফুটবল প্রেমিকরা ভীষণ উৎসাহ এবং উত্তেজনার মধ্যে ডুবে থেকে খেলা উপভোগ করছেন এই ক্ষেত্রে কারও কোনো ধরনের ক্লান্তি বা অবসাদ নেই। সবাই স্বপ্ননোদিত হয়ে ফুটবলের ঢেউয়ে দোল খাচ্ছেন। আমাদের দেশ থেকে ১৫ হাজার এবং ১২ হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে ফুটবল গড়াচ্ছে অথচ নিজ দেশে আমরা সেই খেলা উপভোগ করছি একই সময়, একই আবেগ আর উত্তেজনা নিয়ে। এসব কিছুই আধুনিক প্রযুক্তির অবদান।
চার বছর পর পর বিশ্বকাপ আসে ফুটবলের আনন্দের স্রোতে আমরা গা ভাসিয়ে দিই। এক ঘেঁয়েমিতে ভরপুর ছন্দহীন জীবনে বৈচিত্র্যের স্বাদ কোথায়? ফুটবল ছাড়া আর কোনো দলীয় খেলা তো পারছে না ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজ জীবনকে মাতিয়ে তুলতে। ফুটবল বাঙালির জীবনে ‘ভেরি স্পেশালের’ মধ্যে একটি। খেলাটির টানটান উত্তেজনা আর সৌন্দর্য ভীষণভাবে টানে। বাঙালিদের কাছে ফুটবল নিয়ে কোনো বাছ-বিচার নেই। অন্য দেশের ফুটবলকে নিজের ফুটবল বানিয়ে সেই ফুটবলের উচ্ছ্বাস, আনন্দ আর আবেগের বহিঃপ্রকাশ বাঙালি ছাড়া আর কোনো জাতি কি দেখাতে পেরেছে?