যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরের ওপর হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু করারও পরিকল্পনা করছে দেশ দুটি। গত রবিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি। গতকাল সোমবার রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, আজ মঙ্গলবার কাতারে বৈঠকে বসার পরিকল্পনা করছেন তেহরান-ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিরা। বিশ্ববাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা হবে এ বৈঠকে। ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে বলেন, ‘আমরা সব ধরনের সামরিক কার্যকলাপ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে হওয়া নতুন এ যুদ্ধবিরতি দুই সপ্তাহও পার হয়নি। এর মধ্যেই দুই পক্ষ পুনরায় একে-অপরের ওপর হামলা চালানোয় পরিস্থিতি বেশ নাজুক হয়ে পড়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও যুদ্ধ শুরু করার এবং সামরিক লক্ষ্য পূরণের হুমকি দিয়েছেন। মূলত যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) শর্তাবলি বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি সংক্রান্ত বিষয়গুলোর ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যাকে কেন্দ্র করেই এ নতুন সংঘাতের সূত্রপাত। গত বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালির ওমান উপকূলের কাছে সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এভার লাভলি’ ইরানি ড্রোন হামলার শিকার হয়। এ হামলার পরদিন যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানে হামলা শুরু করে। এর পরেই ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানায়, ওয়াশিংটনের বিমান হামলা জবাবে তারা ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে। গত শনিবার সেন্টকম জানায়, সেদিন পানমার পতাকাবাহী একটি ট্যাংকার ইরানের ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার পর তারা ফের ইরানের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে আঘাত হেনেছে।
ইরানি ভূখ-ে হামলার বিষয়ে বাহরাইনকে কঠোর ভাষায় সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরান। তেহরান জানিয়েছে, উসকানি দেওয়া হলে বাহরাইনে আরও শক্তিশালী হামলা চালানো হবে। ইরানের সর্বোচ্চ মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা আলী আকবর বেলায়েতি বলেছেন, বাহরাইন যেন নিজেদের সীমা মেনে চলে। নিজেদের ভাগ্য নিয়ে এমন খেলা বন্ধ করার জন্য তাদের গুরুত্বের সঙ্গে সতর্ক করা হচ্ছে। ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে ঠিক কোন কর্মকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে বেলায়েতি এ সতর্কবার্তা দিয়েছেন, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি। তেহরানের দাবি, তাদের ওপর হামলার ক্ষেত্রে বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করছে ওয়াশিংটন। উপসাগরীয় দেশগুলো অবশ্য ইরানের এ দাবি অস্বীকার করেছে। বাহরাইন ইরানের সর্বশেষ হামলার নিন্দা জানিয়েছে। দেশটি বলেছে, এ হামলার মধ্য দিয়ে দেশটির সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করা হয়েছে।
এদিকে ইরানের অবরুদ্ধ ৬ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের সম্পদ ফেরত আসছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। একই সঙ্গে শান্তিচুক্তির আওতায় দেশটির জ¦ালানি তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে বলেও নিশ্চিত করেছেন তিনি। এই অর্জনকে ইরানি জনগণের জন্য ‘বড় বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন পেজেশকিয়ান। গতকাল সোমবার কোম শহর সফরে গিয়ে গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ শুবেইরি জানজানির সঙ্গে সাক্ষাতের সময় পেজেশকিয়ান এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, কাতারে ইরানের মোট ১২ বিলিয়ন ডলারের তহবিল রয়েছে। এর মধ্যে ৬ বিলিয়ন ডলার এখন ফেরত আসছে এবং বাকি অর্থের বিষয়েও প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সুইজারল্যান্ড বৈঠক এবং সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) আওতায় এ অর্থ অবমুক্তি ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
যুদ্ধের সময় ইরানি জনগণের অটল মনোভাবের প্রশংসা করেন মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি উল্লেখ করেন শীর্ষ নেতা, মন্ত্রী, সামরিক কমান্ডার এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পাশাপাশি স্কুলশিক্ষার্থীদেরও হত্যা করা হয়েছে। তবে দেশ রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনী, সরকার ও জনগণ ঐক্যবদ্ধ ছিল। তিনি বলেন, ইরানকে অস্থিতিশীল করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের সব সামর্থ্য প্রয়োগ করেছিল। তারা ভেবেছিল অর্থনৈতিক চাপে ইরান ভেঙে পড়বে, কিন্তু জনগণের প্রতিরোধে তাদের সেই হিসাব ভুল প্রমাণিত হয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে ইরানের অবস্থান পুনরায় স্পষ্ট করেন পেজেশকিয়ান। তিনি জানান, ইরান কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। এটি শহীদ শীর্ষ নেতার আমল থেকেই চলে আসা নীতি এবং এখনো তা বহাল রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ইরানের সব কার্যক্রম কেবল দেশের প্রয়োজন এবং ঘোষিত নীতির কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। ইরানের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলকে এই সমঝোতায় রাজি হতে বাধ্য করেছে। তবে ইসরায়েল এবং কিছু বিরোধী গোষ্ঠী এখনো এটি বাস্তবায়নের বিরোধিতা করছে। পেজেশকিয়ান জানান, তার সরকার এরই মধ্যে দেশ পুনর্গঠন পরিকল্পনা শুরু করেছে।