শেষ বিদায়ের যাত্রায় আয়াতুল্লাহ খামেনি

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৩:২৩ এএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার চার মাসেরও বেশি সময় পর, দেশটিতে তার জন্য কয়েক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন ও শেষ বিদায়ের শোভাযাত্রা শুরু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার থেকে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সাবেক এই আয়াতুল্লাহর মরদেহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হচ্ছে।

আজ শনিবার স্থানীয় সময় ভোর ৬টায় তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে, যেখানে দর্শনার্থীরা রবিবার বিকেল পর্যন্ত শ্রদ্ধা জানাতে করতে পারবেন। আগামী বৃহস্পতিবার তার নিজ শহর মাশহাদে তাকে দাফন করা হবে।

এই আয়োজনে এক কোটি ২০ লাখ থেকে দুই কোটি মানুষের উপস্থিতি হতে পারে বলে ধারণা করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। ইরানে কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের জন্য এর আগে কখনো এত বড় পরিসরে প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডের চার মাসেরও বেশি সময় পর এই আনুষ্ঠানিকতা হচ্ছে, যেটিকে ইরানি কর্মকর্তারা ‘শতাব্দীর সেরা  অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া’ বলে অভিহিত করছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নিহত হন আলি খামেনি।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়েক ডজন দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পার্লামেন্টের স্পিকার এবং মন্ত্রীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। প্রায় ৮০০ জন বিদেশি সাংবাদিক এই অনুষ্ঠান কভার করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও তেহরানে গেছেন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় যোগ দিতে।

এই বিশাল আয়োজনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিশ্বকে ও ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের শত্রুদেও একটি বার্তা দেওয়াÑ এই শাসনব্যবস্থা কেবল একটি অস্তিত্ব সংকটের যুদ্ধেই টিকে থাকেনি, বরং তার নিহত নেতাকে নিজেদের শাসনব্যবস্থার প্রতীক হিসেবে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।

প্রস্তুতির অংশ হিসেবে রয়েছে : শোক জানাতে আসা মানুষের জন্য হাজারো সেবাকেন্দ্র (মাওকিব), ১০ লাখের বেশি দর্শনার্থীর থাকার ব্যবস্থা ও জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের জন্য তেহরানের কেন্দ্রস্থলজুড়ে নির্ধারিত পথ। পুরো কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) তেহরানভিত্তিক প্রধান প্রাদেশিক ইউনিট মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ কোর।

এএফপি জানিয়েছে, কর্তৃপক্ষ তেহরানের সরকারি ও বেসরকারি অফিসগুলো শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। যান চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে শহরের কেন্দ্রস্থলের বেশির ভাগ অংশে ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। তেহরানের আকাশসীমা শুক্রবার থেকে আংশিকভাবে এবং সোমবার থেকে পুরোপুরি বন্ধ থাকবে।

জানাজা, দাফনসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিতে তেহরানে আসা রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকা সবচেয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, উপস্থিত থাকা ব্যক্তিদের পাশাপাশি কারা আয়োজন থেকে দূরে থাকবেনÑ সেটিও একই গুরুত্ব বহন করতে পারে।

জানাজার জন্য ইরানি কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে প্রতীক হিসেবে মুষ্টিবদ্ধ হাত আর স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘আমাদের জেগে উঠতেই হবে’। আজ স্থানীয় সময় সকাল ৬টায় তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় ছয় দিনের এই আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। রোববার বিকেল পর্যন্ত সাধারণ মানুষ সেখানে গিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন।

মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ কোরের কমান্ডার হাসান হাসানজাদেহ জানান, খামেনির কফিন একটি উঁচু মঞ্চে রাখা হবে। দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে যাতে প্রত্যেকে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষ করে বের হতে পারেন।

মঙ্গলবার তেহরানের দক্ষিণে অবস্থিত কোম শহরে স্থানান্তরিত করা হবে আয়োজন। সেখানে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান জামকারান মসজিদে জানাজার নামাজে ইমামতি করবেন শিয়াদের জ্যেষ্ঠ আলেম।

বুধবার খামেনির মরদেহ ইরাকের নাজাফে নেওয়া হবে। অন্ত্যেষ্টিযাত্রার পর কারবালায় ইসলামের খলিফা আলির (যাকে শিয়া মুসলিমরা তাদের প্রথম ইমাম হিসেবে মানেন) সমাধিস্থলে আনুষ্ঠানিকতা পালন করে মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে।

ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরাকের বিভিন্ন গোষ্ঠীর অনুরোধেই এসব কর্মসূচি রাখা হয়েছে। যদিও শিয়াশাসিত মুসলিম বিশ্বে খামেনির প্রভাব এবং অঞ্চলজুড়ে ইরানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সম্পর্ক তুলে ধরতেই এসব আয়োজন করা হয়েছে বলে মত কয়েকজন বিশ্লেষকের।

অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি সমন্বয়ের জন্য বাগদাদ সফর করা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই আয়োজনের ‘প্রতীকী গুরুত্বের’ কথা উল্লেখ করেছেন।

বৃহস্পতিবার খামেনিকে তার জন্মশহর মাশহাদে দাফন করা হবে। শিয়া ইসলামের অষ্টম ইমামের সমাধিস্থল এবং ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান ইমাম রেজার সমাধিস্থলে তাকে সমাহিত করা হবে, যা প্রতি বছর লাখো মানুষ পরিদর্শন করে।

এরপর সারা দেশে আরও ৪০ দিন শোকানুষ্ঠান চলবে। দাফনের প্রথম বার্ষিকী পর্যন্ত বিভিন্ন স্মরণসভা ও কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে।

বাবার শেষ বিদায়ে থাকছেন মোজতবা খামেনি : আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় তার ছেলে দেশটির বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি উপস্থিত থাকছেন না। গতকাল বৃহস্পতিবার ভারতে নিযুক্ত তার প্রতিনিধি এমন তথ্য দিয়েছেন। ওই প্রতিনিধি বলেছেন, বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে হত্যা করা হবে বলে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে হুমকি দেওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত