বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে দুটি ম্যাচই ছিল ভিন্ন স্বাদের। একটি ম্যাচে স্পেন নিজেদের চেনা ফুটবলে ফিরে সহজ জয় তুলে নিয়েছে, অন্যটিতে পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়ার লড়াই ছিল শেষ বাঁশি পর্যন্ত উত্তেজনায় ভরা। একজন সাবেক ফুটবলার হিসেবে আমার কাছে এই দুই ম্যাচের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, বড় আসরে শুধু বল দখলে রাখলেই হয় না, গোলের সুযোগ কাজে লাগাতে জানতে হয়।
স্পেনকে নিয়ে অনেক সমালোচনা হচ্ছিল। দলটি ভালো ফুটবল খেলেও শেষ মুহূর্তে গোল করতে পারছিল না। কিন্তু অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে তারা সেই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠেছে। ম্যাচের শুরু থেকেই স্পেন বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, নিজেদের ছন্দে খেলেছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তৈরি হওয়া সুযোগগুলো নষ্ট করেনি। এ কারণেই তাদের জয়টি সহজ হয়েছে।
স্পেনের ফুটবলের মূল শক্তি সব সময়ই পাসিং, পজিশনাল প্লে ও ধৈর্য। তবে এসবের মূল্য তখনই থাকে, যখন শেষ পর্যন্ত গোল আসে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে সেটাই দেখা গেছে। তারা অযথা তাড়াহুড়া করেনি, আবার সুযোগ পেয়েও দ্বিধা করেনি। এই ভারসাম্যই স্পেনকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যদি তারা এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারে, তাহলে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে নিজেদের আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাবে।
অন্যদিকে অস্ট্রিয়া খারাপ খেলেনি। তারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী লড়াই করেছে। কিন্তু স্পেনের মতো পরিণত দলের বিপক্ষে ছোট ছোট ভুলের মূল্য অনেক বড় হয়ে যায়। রক্ষণে কয়েকটি মুহূর্তেও অসতর্কতাই তাদের ম্যাচ থেকে ছিটকে দিয়েছে। বড় দলের বিপক্ষে এমন ভুলের সুযোগ থাকে না।
পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্রের। এটি ছিল দুই সমমানের দলের লড়াই। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জায়গাও ছাড় দিতে চায়নি। মাঝমাঠে দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে, রক্ষণভাগও ছিল বেশ গোছানো। দুই দলই জয়ের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তে উত্তেজনা ছিল।
এদিকে শঙ্কা জাগলেও শেষ পর্যন্ত জয় পেয়েছে পর্তুগাল। তবে এই জয় যতটা আনন্দের, ততটাই সতর্ক হওয়ার বার্তাও বহন করে। কারণ ম্যাচটি তারা সহজে জেতেনি। অনেকেই এখন পর্তুগালকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে দেখছেন। তাদের দলে অভিজ্ঞতা আছে, তরুণদের গতিও আছে। কিন্তু আমার মনে হয়, এই দলটি একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে গিয়ে থেমে যেতে পারে।
এর প্রধান কারণ, পর্তুগাল এখনো এমন ধারাবাহিক আধিপত্য দেখাতে পারেনি, যা একজন চ্যাম্পিয়নের বৈশিষ্ট্য। কঠিন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তারা লড়াই করে জিতছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি ম্যাচে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না। সামনে আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এই সীমাবদ্ধতা বড় হয়ে দেখা দিতে পারে।
ক্রোয়েশিয়ার জন্য অবশ্য হতাশার কারণ একটাই, গোলের অভাব। তারা ম্যাচে জেতার জন্য খেলেছে, আক্রমণ গড়েছে, লড়াই করেছে। কিন্তু শেষ স্পর্শে ব্যর্থ হয়েছে। আধুনিক ফুটবলে সুযোগ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; সেটিকে গোলে রূপ দিতে না পারলে সব পরিশ্রমই বৃথা যায়। ক্রোয়েশিয়া সেই বাস্তবতার শিকার হয়েছে।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে প্রতিটি ম্যাচই নতুন পরীক্ষা। স্পেন দেখিয়েছে, সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে জয় সহজ হয়ে যায়। পর্তুগাল দেখিয়েছে, কঠিন ম্যাচ জেতার মানসিকতা তাদের আছে। আর ক্রোয়েশিয়া মনে করিয়ে দিয়েছে, ভালো ফুটবল খেলেও গোল না করলে শেষ পর্যন্ত বিদায় নিতে হয়। এখন দেখার বিষয়, এই শিক্ষা থেকে কে সবচেয়ে বেশি লাভ তুলে নিতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত কার হাতেই ওঠে বিশ্বকাপের ট্রফি।