বিশ্বকাপ ফুটবলে ব্রাজিলের জয় উদযাপন কেন্দ্র করে রাজধানীর আদাবর এলাকায় বিএনপি নেতা আবুল বাশারকে (৪৫) কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে বাবা ও দুই ছেলেসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-২। গতকাল শুক্রবার ময়মনসিংহ ও জামালপুরে পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে গত বৃহস্পতিবার আদাবর থানা পুলিশ শোয়েব হোসেন সোয়াইব ও মো. কবির নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে। গতকাল তাদের আদালতে হাজির করা হয়। পরে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার তিন দিনের মাথায় গতকাল নিহতের স্ত্রী স্মৃতি আক্তার বাদী হয়ে আটজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ১০-১৫ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন।
ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ থানার সাহেবনগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে আবুল বাশার হত্যায় জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলো ২৭ বছর বয়সী রিপন, তার ভাই ২৫ বছর বয়সী নিরব ও তাদের বাবা ৬০ বছর বয়সী মজনু মিয়া। মিজানুর রহমান নামে ৪০ বছর বয়সী আরেকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় হত্যাকা-ে ব্যবহৃত একটি সুইচ গিয়ার চাকু উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার রিপন সরাসরি বাদশাকে ছুরিকাঘাত করে। তাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর তারা পালিয়ে ময়মনসিংহে গ্রামের বাড়িতে চলে যায়। ঘটনার সময় গ্রেপ্তারকৃত বাবা-ছেলে তিনজনই ঘটনাস্থলে ছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজে তাদের দেখা গেছে।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে র্যাব-২ দুজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে। তারা হলেন প্রধান অভিযুক্ত সমুন (২৪) ও হুকুমদাতা শাহীন (৫৯)।
এতে জানানো হয়, সুমনকে জামালপুর জেলার সদর থানাধীন থেকে এবং শহীদকে ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে সুমনের বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়ী ও মোহাম্মদপুর থানায় দুটি মামলা রয়েছে।
দুই আসামি কারাগারে : এ ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার আদাবর থানা পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার শোয়েব হোসেন সোয়াইব ও কবিরকে গতকাল আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. হাফিজুর রহমান। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিলরুবা আফরোজ তিথির আদালত দুজনকে কারাগারে প্রেরণের আদেশ দেন।
আবেদনে বলা হয়, আসামিরা এ হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত আছে বলে প্রাথমিক তদন্তে সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। আসামিদের সম্পর্কে আরও গভীর ও নিবিড়ভাবে তদন্ত অব্যাহত আছে। গভীর তদন্তকালে যদি এ আসামিরা হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত আছে মর্মে যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে ওই হত্যা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হবে। তদন্ত সমাপ্ত, নাম-ঠিকানা যাচাই ও বাদীর এজাহার না পাওয়া পর্যন্ত আসামিদের জেলহাজতে আটক রাখা একান্ত প্রয়োজন।
এদিকে আসামিদের পক্ষের আইনজীবী মো. মাহবুব আলম তাদের জামিন চেয়ে প্রার্থনা করেন।
খেলা দেখার স্থানে নজরদারি করবে পুলিশ : ডিবি কর্তৃক গ্রেপ্তার চারজনের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে ডিবিপ্রধান মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বড় বড় স্ক্রিনে খেলা দেখা হয়। এটা আমরা নজরদারি করছি। ডিএমপির সব থানাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোথায় কোথায় এ রকম স্ক্রিন আছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারাও লোক রাখবে, আমরাও লোক রাখবো। যেন কোনো অনাকাঙিক্ষত ঘটনা না ঘটে। নগরবাসীর প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, আনন্দটা যেন আনন্দের পর্যায়ে থাকে। কোনো বিষাদে পরিণত না হয়। আর আমরা পরস্পরের প্রতি সহনশীল হব। আমরা যেটা বলি যে, অপজিট পক্ষকে আমরা মেনে নেব।
আদাবার থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার সন্দেহভাজন চারজনকে আমরা আটক করেছি। যাচাই-বাছাই শেষে দুজনের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। গতকাল তাদের আদালতে হাজির করা হয়েছে। নিহতের স্ত্রী স্মৃতি আক্তার আটজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ১০-১৫ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। থানা পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থা কর্তৃক আটক সবাইকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আজ শনিবার আদালতে হাজির করা হবে।
গত ২৯ জুন নবোদয় হাউজিং এলাকায় বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখা ও বিজয় উদযাপন কেন্দ্র করে নবোদয় হাউজিং ইউনিট বিএনপির সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক বাদশা মিয়ার গ্রুপের সঙ্গে একই এলাকার রিপন ও পারভেজ গ্রুপের মারামারি হয়। পরের দিন সন্ধ্যায় দুপক্ষই বিষয়টি নিয়ে মীমাংসার জন্য সালিশে বসে। সেখানে কোনো সমাধান না হওয়ায় সাদ্দাম ও বাদশা রাত ৮টার দিকে চলে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে তাদের ওপর প্রতিপক্ষ গ্রুপ ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা করে। এতে আহত দুজনের মধ্যে বাশার ঘণ্টা দুয়েক পর মারা যান। আর গুরুতর আহত সাদ্দাম এখনো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।